আলী কদর পলাশ
মানুষ এখন বড় বড় কথা শুনে ক্লান্ত। মানুষ চায় চোখে দেখা কাজ। চায় নিয়ম। চায় একটু স্বস্তি। এই বাস্তবতার ভেতরেই দেশের রাজনীতিতে “১৮০ দিনের চ্যালেঞ্জ” কথাটি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ ছয় মাস মানে প্রতিশ্রুতির প্রথম হিসাব। ছয় মাস মানে মানুষকে বুঝিয়ে দেওয়ার সময়। রাষ্ট্র কি সত্যিই গুছিয়ে চলবে, নাকি সব আগের মতোই থাকবে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে তারেক রহমানকে ঘিরে যে আলোচনা চলছে, সেখানে বড় অঙ্গীকারের সঙ্গে একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ভাষা বারবার ফিরে আসে। “শব্দ কম, কাজ বেশি।” এই ভাবনাটা মানুষের মন ছুঁয়ে যায়। কারণ আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অনেক সময় বদলটা শুরু হয় কোনো বিশাল ঘোষণায় নয়। শুরু হয় ছোট ছোট আচরণে। রাষ্ট্রের চালচলনে। ক্ষমতার ভঙ্গিতে।
ছোট সিদ্ধান্তে বড় বার্তা
যে দেশটিতে ভিআইপি চলাচল মানেই রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকা, যে দেশটিতে প্রটোকল মানেই জনদুর্ভোগ, সেখানে সংযমের ইঙ্গিতও মানুষ আলাদা করে লক্ষ করে। সচিবালয়কেন্দ্রিক কাজের বার্তা, অফিসে নিয়মিত উপস্থিতি, রাস্তায় ট্রাফিক সিগনাল মানা, গাড়িবহর ছোট রাখার চেষ্টা, মিতব্যয়ী চলার সংকেত। এগুলো সবই “নীতির ভাষা”। এতে রাতারাতি বাজারের আগুন নেভে না। কিন্তু মানুষের মনে একটা ধারণা জন্মায়। ক্ষমতা মানে সুবিধা নয়, ক্ষমতা মানে দায়িত্ব।
এই জায়গাটাই আশার প্রথম পদচিহ্ন। কারণ মানুষ যেটা সবচেয়ে বেশি চায়, সেটা হলো “নিয়ম সবার জন্য” এই অনুভূতি। বড় বড় সংস্কার কখনো কখনো কাগজে আটকে যায়। কিন্তু নিয়ম মানার ছবি মানুষকে সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাস করায়, হয়তো কিছু বদলাতে শুরু করেছে।
১৮০ দিনের চ্যালেঞ্জ কোথায়
তবু বাস্তব সত্য একটাই। প্রতীকী আচরণ যতই আলো ছড়াক, সরকারের সাফল্য মাপা হবে ফলাফলে। আর ছয় মাসের ভিতরে ফলাফল দেখানোর জায়গা খুব পরিষ্কার। মানুষ তিনটি বিষয়ে দ্রুত স্বস্তি খোঁজে। বাজারে দাম। রাস্তায় নিরাপত্তা। ঘরে বিদ্যুৎ-জ্বালানির নিশ্চয়তা।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। কারণ এখানে শুধু ভাষণ বা অভিযান যথেষ্ট নয়। আমদানি, সরবরাহ, মজুত, পরিবহন, বাজার নজরদারি—সবকিছু একসঙ্গে কাজ না করলে দামের লাগাম টানে না। মানুষ তাই দেখবে, বাজারে গেলে তার ব্যাগটা একটু ভারী হচ্ছে কি না। নাকি একই টাকায় আগের মতোই কম জিনিস কিনতে হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ। মানুষের নিরাপত্তা মানে শুধু অপরাধ কমানো নয়। মানে থানায় গেলে সেবা পাওয়া। মানে রাস্তায় চলতে ভয় না থাকা। মানে দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি, সহিংসতার ছায়া কমা। এখানে সরকারকে দ্রুত দৃশ্যমান বার্তা দিতে হয়। কারণ নিরাপত্তা মানুষের প্রতিদিনের অনুভূতি।
আর বিদ্যুৎ-জ্বালানি হলো জনজীবনের তৃতীয় মাপকাঠি। গরমের আগে, রমজানের আগে এই সময়টায় বিদ্যুৎ-গ্যাস স্বাভাবিক না থাকলে মানুষের ভোগান্তি বাড়ে। মানুষ তখন আর কোনো ব্যাখ্যা শুনতে চায় না। মানুষ শুধু চায়, জীবনটা একটু সহজ হোক।
আশার জায়গাটা কেন উজ্জ্বল
আশা তৈরি হয় তখনই, যখন মানুষ দেখে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হচ্ছে না। কাজের গতি বাড়ছে। অফিস আদালতে সময়ের মূল্য বাড়ছে। শনিবার অফিস করার মতো বার্তা। কেবল একটা ঘোষণাই নয়, এটা প্রশাসনকে সময়ের ভেতরে বাঁধার চেষ্টা। মানুষ এসব দেখে মনে মনে বলে, হয়তো এবার ফাইল আটকে থাকবে না। হয়তো এবার সিদ্ধান্ত ঝুলবে না। হয়তো এবার সেবা পেতে অপেক্ষা কমবে।
আরেকটা আশার জায়গা হলো “সুবিধা নয়” নীতির ইঙ্গিত। রাষ্ট্র পরিচালনায় যখন ব্যক্তিগত সুবিধা কমানোর কথা শোনা যায়, তখন সাধারণ মানুষের মনে ন্যায্যতার বোধ জাগে। কারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে দেখে এসেছে, ক্ষমতার সঙ্গে সুবিধা বাড়ে, জনভোগান্তি বাড়ে। এই ছবিটা বদলাতে পারলেই সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা ঘটে।
ছয় মাসে মানুষ কী দেখতে চাইবে
১৮০ দিনের পথটা আসলে মানুষের কাছে খুব সরল এক প্রশ্ন। বাজারে গেলে দাম একটু নামল কি না। রাতে ঘুমাতে গেলে নিরাপত্তা একটু বাড়ল কি না। বিদ্যুৎ-গ্যাসের ঝামেলা একটু কমল কি না। অফিস-আদালতে কাজের গতি বাড়ল কি না। রাষ্ট্র কি নিয়মের পথে হাঁটছে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই ছয় মাসের রিপোর্ট কার্ড।
মানুষ চায় না অলৌকিক কিছু। মানুষ চায় নিয়ম। মানুষ চায় ন্যায্যতা। মানুষ চায় দুর্ভোগ কমুক। এই চাওয়াটা খুব সাধারণ। কিন্তু এই সাধারণ চাওয়াটাই সবচেয়ে শক্তিশালী।
শেষ কথা
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের “১৮০ দিনের অগ্রাধিকার” তাই কোনো কাগুজে শ্লোগান নয়। এটা সময়ের কাছে দাঁড়িয়ে পরীক্ষার নাম। যদি এই সময়ে বাজারে স্বস্তি আসে, রাস্তায় নিরাপত্তা বাড়ে, বিদ্যুৎ-জ্বালানিতে ভোগান্তি কমে, প্রশাসনে গতির ছাপ পড়ে—তাহলে মানুষ বলবে, এটা চমক নয়। এটা শুরু।
আর সেই শুরুটাই- আশার প্রথম পদচিহ্ন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬