বিবিসি অবলম্বনে লিলি ইসলাম
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধস জয়ের পর দিল্লির প্রতিক্রিয়া ছিল সতর্ক কিন্তু ইতিবাচক। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলায় বার্তা দিয়ে তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান। তিনি গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিবেশী হিসেবে একসঙ্গে কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। ভাষা ছিল ভবিষ্যতমুখী। তবে তাতে সতর্কতার ছাপ স্পষ্ট।
শেখ হাসিনার পতন এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দুই দেশের সম্পর্ক দৃশ্যত শীতল। হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। তাকে প্রত্যর্পণ না করা ঢাকার রাজনীতিতে বড় ইস্যু। অনেক বাংলাদেশির মধ্যে ধারণা, দিল্লি দীর্ঘদিন একপাক্ষিকভাবে হাসিনাকে সমর্থন করেছে। সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, পানিবণ্টন, বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা এবং রাজনৈতিক বক্তব্য—এসব নিয়ে পুরোনো ক্ষোভও আছে। ভিসা সীমিত। বাস-ট্রেন বন্ধ। ফ্লাইট কমেছে।
দিল্লির সামনে মূল প্রশ্ন, যোগাযোগ করবে কি না তা নয়; কীভাবে করবে। ভারতের প্রধান উদ্বেগ দুটি। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বিদ্রোহ দমন নিয়ে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে কি না। এবং উগ্রবাদ বা জঙ্গিবাদের ঝুঁকি বাড়বে কি না। অতীতে ২০০১-২০০৬ সময়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় সম্পর্ক অবিশ্বাসে আচ্ছন্ন ছিল। চট্টগ্রামে ২০০৪ সালের অস্ত্র জব্দের ঘটনা দিল্লির সন্দেহ বাড়ায়। সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ ছিল।
তবে বর্তমান প্রেক্ষাপট ভিন্ন। তারেক রহমান প্রকাশ্যে বলেছেন, “না দিল্লি, না পিণ্ডি—বাংলাদেশ সবার আগে।” অর্থাৎ তিনি স্বাধীন কূটনৈতিক অবস্থান চান। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ হয়েছে। সরাসরি ফ্লাইট চালু। বাণিজ্য বেড়েছে। সামরিক যোগাযোগও বাড়ছে। দিল্লি এটিকে নজরে রাখছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের বহুমুখী সম্পর্ক স্বাভাবিক। প্রশ্ন হলো ভারসাম্য কতটা রক্ষা হয়।
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান একটি স্পর্শকাতর বিষয়। ঢাকার বিরোধীরা বিএনপির ওপর চাপ দেবে তাকে ফেরত আনার দাবিতে। কিন্তু ভারতের আইনি ও কৌশলগত বিবেচনা আছে। এই ইস্যু দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্কের উপর ছায়া ফেলতে পারে।
তবু বাস্তবতা বলছে, সম্পূর্ণ দূরত্ব দুই দেশের কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। চার হাজার কিলোমিটারের বেশি সীমান্ত। গভীর অর্থনৈতিক সংযোগ। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। নিরাপত্তা সহযোগিতা এখনো সক্রিয়। যৌথ মহড়া, নৌ টহল, প্রতিরক্ষা ঋণ—এসব চলমান।
সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য উভয় পক্ষের সংযম জরুরি। ঢাকাকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতবিরোধী আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দিল্লিকেও বক্তব্য ও আচরণে বড় ভাইসুলভ ভঙ্গি পরিহার করতে হবে। পারস্পরিক সম্মানই হবে ভিত্তি।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, বড় প্রতিবেশী হিসেবে উদ্যোগ নেওয়া ভারতের দায়িত্ব। আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে ইতিবাচক বার্তা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ। পানি, বাণিজ্য, ভিসা ও সংযোগে অগ্রগতি আস্থা বাড়াতে পারে।
অতীত জটিল। কিন্তু ভূগোল ও স্বার্থ দুই দেশকে কাছাকাছি রাখে। এখন দেখার বিষয়, সতর্কতার বদলে আত্মবিশ্বাসী কূটনীতি বেছে নেয় কে আগে। সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে। তবে তা নির্ভর করবে বাস্তববাদ, পারস্পরিক সম্মান এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার উপর।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬