বিশেষ প্রতিনিধি
নির্বাচনের ফলাফলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনও বাকি। তবু বিএনপি বলছে, রোববারের মধ্যেই সরকার গঠন হবে। খবরটি দেশ-বিদেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন বার্তা সংস্থা ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এটিকে ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বাঁক হিসেবে দেখছে।
আল জাজিরা তাদের প্রতিবেদনে সরাসরি জানিয়েছে, বিএনপি “রোববার সরকার গঠন করবে”- এমন প্রত্যাশার কথা দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে অনানুষ্ঠানিক ফল হিসেবে বিএনপির ২০৯ আসন এবং জামায়াতের ৬৮ আসন উল্লেখ করা হয়।
এপি লিখেছে, বিএনপি এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অতিক্রম করেছে। যদিও চূড়ান্ত ফল প্রকাশের অপেক্ষা রয়েছে। তারা নির্বাচন কমিশনের দেওয়া ৫৯.৪৪% ভোটার উপস্থিতির কথাও জানিয়েছে।
রয়টার্স-উদ্ধৃত প্রতিবেদনও একই সুরে এসেছে। সিঙ্গাপুরের দ্য স্ট্রেইটস টাইমস রাইটার্সের ছবি ও তথ্য ব্যবহার করে জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশনের হিসাবে বিএনপি ও মিত্ররা কমপক্ষে ২১২টি আসন পেয়েছে এবং জামায়াতপন্থি জোট পেয়েছে ৭৭টি। এতে বিএনপির সরকার গঠন কার্যত নিশ্চিত বলেই ধরা হচ্ছে।
এদিকে দ্য গার্ডিয়ান বলেছে, নির্বাচন কমিশনের ফল অনুযায়ী বিএনপি জোটের জয় “সুইপিং” এবং দলটি প্রায় দুই দশক পর আবার ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরছে। প্রতিবেদনে একই সঙ্গে উল্লেখ করা হয়, নির্বাচন-পরবর্তী দায়িত্ব এখন নতুন সরকারের কাঁধে।
কী বোঝা যাচ্ছে “রোববার সরকার গঠন” কথাটির পেছনে
বিএনপি শিবিরের ভাষ্য, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত ধরে নিয়েই দ্রুত সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তবে ফলাফলে সংখ্যার ভিন্নতা আছে। কোথাও ২০৯, কোথাও ২১২—এটি মূলত অনানুষ্ঠানিক ফল বনাম কমিশনের আপডেটেড গণনা–এই পার্থক্যের কারণে।
চূড়ান্ত ঘোষণা ও গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত, সরকার গঠনের সময়সূচি রাজনৈতিক ঘোষণা হিসেবেই থাকবে। এপিও বলেছে, নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত ঘোষণা এখনও বাকি।
আল জাজিরা বিস্তারিত বিশ্লেষণে লিখেছে-
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় মোড়। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিজেদের “থাম্পিং” জয়ী বলে দাবি করেছে।
শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) নির্বাচন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া অনানুষ্ঠানিক ফল অনুযায়ী বিএনপি পেয়েছে ২০৯টি আসন।
সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ১৫১টি আসন। সে হিসাবে বিএনপি সহজেই সরকার গঠনের অবস্থানে।
দলটি জানিয়েছে, রোববারের মধ্যেই সরকার গঠন করবে।
বিএনপির পর দ্বিতীয় অবস্থানে আছে জামায়াতে ইসলামি।
দলটি পেয়েছে ৬৮টি আসন।
এটি তাদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ আসন বলে উল্লেখ করা হচ্ছে।
তবে জামায়াত বলেছে, তারা ভোট গণনার প্রক্রিয়া নিয়ে “গুরুতর প্রশ্ন” তুলছে।
ফলাফলের স্বচ্ছতা নিয়ে তারা সন্তুষ্ট নয়।
তরুণ নেতৃত্বনির্ভর ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জিতেছে মাত্র ৬টি আসন।
নির্বাচন কমিশন এখনও চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করেনি।
ঘোষণা আসতে পারে শুক্রবার রাতেই অথবা শনিবার।
ভোটার উপস্থিতিও এবার উল্লেখযোগ্য।
নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী ভোট পড়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ।
এর আগে ২০২৪ সালের নির্বাচনে ভোট পড়েছিল প্রায় ৪২ শতাংশ।
এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে ৫০টির বেশি দল।
প্রার্থী ছিল অন্তত ২,০০০ জন। জাতীয় সংসদে মোট আসন ৩৫০। এর মধ্যে ৫০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত।
এই নির্বাচনের পটভূমিও ব্যতিক্রমী। ২০২৪ সালে সহিংস দমন-পীড়নের অভিযোগের মধ্যে শেখ হাসিনা ভারত চলে গেলে দেশ চালায় অন্তর্বর্তী সরকার। সে সরকারে নেতৃত্ব দেন নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস।
এই প্রেক্ষাপটে এবারের নির্বাচনকে অনেকেই বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক ভোট হিসেবে দেখছেন।
বিএনপি নেতা তারেক রহমান সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র।
তিনি দীর্ঘ প্রবাসজীবনের পর ডিসেম্বরে দেশে ফেরেন।
তিনি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ফল নিয়ে মন্তব্য না করলেও ঢাকায় তাকে সমর্থকদের উদ্দেশে গাড়ি থেকে হাত নাড়তে দেখা গেছে।
বিএনপি নেতাকর্মীদের উদ্দেশে দলটি দিয়েছে সতর্ক বার্তা। বড় ধরনের আনন্দ মিছিল বা শোভাযাত্রা না করতে বলা হয়েছে। বরং বিশেষ দোয়া ও প্রার্থনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়াও শুরু হয়েছে। ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি পক্ষ থেকে অভিনন্দন বার্তা এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
ইইউ পর্যবেক্ষক দলও ভোট পর্যবেক্ষণ করেছে।
রোববার তাদের প্রাথমিক প্রতিবেদন আসার কথা।
নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে হয়েছে সংবিধান সংস্কার নিয়ে গণভোট।
কমিশনের দেওয়া প্রাথমিক তথ্যে “হ্যাঁ” ভোট পড়েছে প্রায় ৪৮ মিলিয়ন, “না” ভোট প্রায় ২৩ মিলিয়ন।
প্রস্তাবিত সংস্কারের মধ্যে আছে প্রধানমন্ত্রীর দুই মেয়াদের সীমা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার, নারীদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, নির্বাচনের সময় নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা, এবং ৩০০ আসনের সংসদের পাশাপাশি দ্বিতীয় কক্ষ গঠনের ভাবনা।
তবে এসবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা হয়নি।
এখন দেশের সামনে বড় প্রশ্ন।
এই ফলাফল কীভাবে সরকার পরিচালনার পথে যাবে।
অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম, দুর্নীতি দমন ও আঞ্চলিক কূটনীতি—সবই নতুন সরকারের প্রথম পরীক্ষার জায়গা।
আর নির্বাচন-পরবর্তী শান্তি ও রাজনৈতিক সহনশীলতাও হবে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬