নিজস্ব প্রতিবেদক
আজকের দিনটি বাংলাদেশের জন্য শুধু আরেকটি ভোটের দিন নয়। এটি রাষ্ট্রের পথ নির্ধারণের দিন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচন এবং একইসঙ্গে গণভোট। তাই আজকের ব্যালটে কেবল প্রতিনিধি নয়, ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকনির্দেশও লিখিত হবে।
সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত দেশজুড়ে ২৯৯টি সংসদীয় আসনে একযোগে ভোটগ্রহণ হচ্ছে। একটি আসনে প্রার্থী মৃত্যুর কারণে ভোট স্থগিত থাকলেও সার্বিকভাবে এটি দেশের গণতান্ত্রিক জীবনে বড় এক অধ্যায়। এই নির্বাচন এমন এক সময় আসছে, যখন দীর্ঘদিনের বিতর্কিত ভোট, সংকুচিত রাজনৈতিক পরিসর এবং আস্থার ঘাটতি পেরিয়ে মানুষ আবার নিজের অধিকারকে দৃশ্যমান করতে চাইছে।
নির্বাচন মানে শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়। নির্বাচন মানে আস্থা। রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের আস্থার সম্পর্ক যত দৃঢ়, গণতন্ত্র তত শক্তিশালী। ভোটাধিকার প্রয়োগের মধ্য দিয়েই নাগরিক জানান দেন, তিনি নীরব দর্শক নন। তিনি দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের অংশীদার। আজ সেই আস্থাকে আচরণে রূপ দেওয়ার দিন।

এই বাস্তবতার পাশে আছে নিরাপত্তা-উদ্বেগও। বড় পরিসরে বাহিনী মোতায়েন হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সেনাবাহিনীর সহায়তাও আছে। অনেক কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দূরবর্তী কেন্দ্র, প্রার্থী ও সমর্থকদের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং অতীত সহিংসতার স্মৃতি। সব মিলিয়ে সতর্কতার জায়গা তৈরি হয়েছে। প্রথমবারের মতো বডি-ওর্ন ক্যামেরা, নজরদারির প্রযুক্তি, মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান উপস্থিতি। সবকিছুই একটি বার্তা দেয়। ভোটার যেন ভয়হীনভাবে কেন্দ্রে যান। ভোট দিয়ে নির্বিঘ্নে ফিরে আসেন। ভয়ের পরিবেশে ভোটাধিকার অর্থ হারায়। তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তেমনি শান্ত পরিবেশ বজায় রাখা সমাজেরও দায়িত্ব।
তবে যে সত্যটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো- নিরাপত্তা ব্যবস্থাই নির্বাচনকে সুন্দর করে না। নির্বাচনকে সত্যিকার অর্থে সুন্দর করে নাগরিকের আচরণ। ভোটের দিনে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো সংযম। গুজব ছড়ানো, উত্তেজনা তৈরি, ভয় দেখানো, প্রতিপক্ষকে অমানবিক করা। এসবই গণতন্ত্রের শত্রু। আজ ভিন্ন মতের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোই প্রকৃত রাজনৈতিক পরিণতি। কারণ ভোট শেষ হওয়ার পরও আমরা একই সমাজে থাকি। তাই জয়-পরাজয়ের ভাষা যেন বিভাজনের আগুন না ছড়ায়। ছড়াক দায়িত্বশীলতার আলো।
এবারের নির্বাচনের সঙ্গে যে গণভোট হচ্ছে, সেটিও খুব তাৎপর্যপূর্ণ। রাজনৈতিক সংস্কার, ক্ষমতার ভারসাম্য, নির্বাহী ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ, মেয়াদসীমা। এসব প্রশ্ন কাগজে নয়, জনরায়ে যাচাই হচ্ছে। অর্থাৎ আজকের সিদ্ধান্ত শুধু আগামী দিনের সরকার নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো নিয়েও জনগণের অবস্থান প্রকাশ করবে। তাই আজকের ব্যালট এক অর্থে রাষ্ট্রপুনর্গঠনেরও ব্যালট।
আজকের ভোটে তরুণদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক মানুষ দীর্ঘদিন ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি। নতুন ভোটারদের বড় একটি অংশ প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। যারা ২০২৪ সালের আন্দোলনে সামনে ছিলেন, তাদের কাছে আজকের ভোট কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি ভবিষ্যতের মালিকানা নেওয়ার সুযোগ। তরুণরা যত বেশি সক্রিয় হবে, নীতিনির্ধারণ তত বেশি জনজীবনের বাস্তব প্রয়োজনের দিকে ঝুঁকবে। তারুণ্যের ভোট মানে শুধু বয়সের সংখ্যা নয়। এটি নতুন ভাবনা, নতুন দাবি, নতুন স্বপ্নকে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে যুক্ত করা।
ভোট উপলক্ষে ছুটির ব্যবস্থা, শহর থেকে গ্রামের পথে মানুষের ঢল, টিকিট সংকট, সড়কে যানজট। সবই দেখায়, মানুষের ভেতরে এক ধরনের আগ্রহ আছে। এই আগ্রহ যেন শান্ত ও শৃঙ্খলিত অংশগ্রহণে রূপ নেয়। কারণ কেন্দ্র পর্যন্ত যাওয়াই যথেষ্ট নয়। কেন্দ্রে গিয়ে নিয়ম মেনে ভোট দেওয়া, অন্যের অধিকারকে সম্মান করা, উত্তেজনার প্ররোচনায় না যাওয়া। এগুলোই গণতন্ত্রকে পরিণত করে।
দেশে ভোটকেন্দ্র, প্রার্থী, পর্যবেক্ষক, দেশি-বিদেশি সাংবাদিক সব মিলিয়ে আয়োজন বিশাল। কিন্তু এই বিশালতার মাঝেও মূল সত্যটি সহজ। ভোটার কেন্দ্রে যাবেন কি না, এবং কীভাবে যাবেন। ভোটার যদি কেন্দ্রে যান শান্তভাবে, নিয়ম মেনে, অন্যের অধিকারকে সম্মান করে, তবে সেই ভোট কেবল একটি ফলাফল নয়। এটি একটি জাতীয় চরিত্রও নির্মাণ করে।
আজকের দিনে প্রত্যাশা স্পষ্ট। শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ। স্বচ্ছতা। আস্থা। প্রক্রিয়াকে সম্মান। আর ভোট শেষে সহাবস্থানের সুন্দর বার্তা। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই যে, মানুষ মত দেয়, সিদ্ধান্ত হয়, কিন্তু দেশ এগিয়ে চলে একসাথে।
আজ ভোট। আজই নাগরিকের নীরব শক্তি কথা বলুক। আজই দেখা যাক, বাংলাদেশ দায়িত্বশীল অংশগ্রহণের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে আরও পরিণত করতে পারে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬