মণিরামপুর প্রতিনিধি
সমাজের চোখে তাঁরা সাধারণ মানুষ। কেউ কৃষক, কেউ শ্রমিক, কেউবা হারিয়ে যেতে বসা কোনো ঐতিহ্যবাহী পেশার কারিগর। তাঁদের ঘামে গড়ে ওঠে সভ্যতা, তাঁদের শ্রমে সচল থাকে জীবনযাত্রার চাকা। অথচ সময়ের পরিক্রমায় এই মানুষগুলোর জীবনসংগ্রাম, ত্যাগ ও অবদান অনেক সময়ই থেকে যায় লোকচক্ষুর আড়ালে।
সেই উপেক্ষিত মানুষগুলোকেই রং-তুলি আর ক্যানভাসে তুলে ধরে তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন যশোরের মণিরামপুরের তরুণ চিত্রশিল্পী মুরারি মুরলী মোহন।
মণিরামপুর উপজেলার ৫ নম্বর হরিদাসকাঠি ইউনিয়নের পাঁচবাড়িয়া গ্রামের এই তরুণ শিল্পীর জীবনের প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনী শুরু হয়েছে যশোরে। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরিতে পাঁচ দিনব্যাপী এ প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়। ‘রিয়েল আর্টিস্ট অব সোসাইটি’ (Real Artist Of Society) শিরোনামের এ প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে শিল্পীর ৪০টি শিল্পকর্ম। প্রতিটি চিত্রকর্ম যেন শ্রমজীবী মানুষের ঘাম, সংগ্রাম, বেঁচে থাকার লড়াই এবং সমাজের প্রতি তাঁদের নীরব অবদানের একেকটি জীবন্ত দলিল।
শিল্পীর ক্যানভাসে উঠে এসেছে কৃষক, শ্রমিকসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবন ও কর্ম। পাশাপাশি স্থান পেয়েছে হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী পেশার মানুষের জীবনচিত্র।
এসব শিল্পকর্মের মধ্য দিয়ে তিনি শুধু মানুষের অবয়ব আঁকেননি; বরং তাঁদের জীবনের বাস্তবতা, পরিশ্রমের মর্যাদা এবং সমাজে তাঁদের অপরিহার্য ভূমিকার কথাও তুলে ধরেছেন। তাঁর রং-তুলির প্রতিটি আঁচড়ে যেন উচ্চারিত হয়েছে এক গভীর উপলব্ধি—সমাজের যাঁদের আমরা প্রায়ই সাধারণ মানুষ বলে পাশ কাটিয়ে যাই, তাঁরাই আসলে আমাদের জীবন ও সভ্যতার অন্যতম প্রধান কারিগর।
প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন ভাস্কর শিল্পী মাহবুব জামাল শামীম ও চিত্রশিল্পী সোহাগ পারভেজ। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন হারুন অর রশীদ, মাহমুদ হাসান বুলু, কৃষি গৌতম, সানোয়ার আলম খান দুলু, বাসুদেব বিশ্বাস ও ইহসান আননূর।
প্রদর্শনীর ভাবনা ও শিল্পকর্মের পেছনের অনুভূতি তুলে ধরে চিত্রশিল্পী মুরারি মুরলী মোহন বলেন, গ্রামে জন্ম ও বেড়ে ওঠার সুবাদে শৈশব থেকেই শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষের জীবন খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। তাঁদের প্রতিদিনের পরিশ্রম, জীবিকার সংগ্রাম এবং জীবনের নানা বাস্তবতা তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করেছে।
তিনি জানান, জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে তিনি জেনেছেন, পরিশ্রমের ফল একসময় পাওয়া যায়। কিন্তু বাস্তব জীবনে খেটে খাওয়া এসব মানুষকে তাঁদের শ্রমের যথাযথ প্রাপ্য পেতে খুব কমই দেখেছেন।
মানুষের ঘাম ও শ্রমে যখন সমাজ এগিয়ে যায়, তখন সেই মানুষগুলোর জীবন কতটা অবহেলিত থেকে যায়—এ উপলব্ধিই তাঁকে ভাবিয়েছে, নাড়া দিয়েছে এবং ক্যানভাসে তাঁদের জীবন তুলে ধরতে অনুপ্রাণিত করেছে।
মুরারি বলেন, কৃষক, শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ কাজ বন্ধ করে দিলে খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে স্বাভাবিক জীবনযাত্রার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রই থমকে যাবে। অথচ সমাজে তাঁদের অবদানের গুরুত্ব অনেকেই উপলব্ধি করতে পারেন না। যাঁদের পরিশ্রমে মানুষের জীবন সহজ হয়, যাঁদের শ্রমে সভ্যতা এগিয়ে চলে, তাঁদের জীবন ও অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন।
শিল্পীর কণ্ঠে উঠে এসেছে হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী পেশা নিয়েও গভীর উদ্বেগ। সময়ের পরিবর্তন ও সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে দেশের অনেক ঐতিহ্যবাহী পেশার মানুষ হারিয়ে গেছেন, আবার কেউ কেউ হারিয়ে যাওয়ার পথে।
তাঁদের হাতে তৈরি শিল্পকর্ম, জীবনঘনিষ্ঠ দক্ষতা ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহন করা ঐতিহ্যও ধীরে ধীরে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাচ্ছে। মুরারির মতে, এই মানুষগুলোর জীবন ও কর্মকে সংরক্ষণ করা মানে কেবল একটি পেশার ইতিহাস ধরে রাখা নয়; বরং দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও শেকড়কে স্মরণ করা।
তিনি আরও বলেন, হারিয়ে যেতে বসা এসব পেশাজীবী ও কর্মজীবী মানুষকে রং-তুলি ও ক্যানভাসের মাধ্যমে একসঙ্গে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তিনি। তাঁর চোখে, এই শ্রমজীবী মানুষরাই প্রকৃত শিল্পী। কারণ, তাঁরা নিজেদের দক্ষতা, শ্রম ও সৃজনশীলতা দিয়ে প্রতিনিয়ত জীবনকে গড়ে তোলেন। তাঁদের শ্রমেই বেঁচে থাকে সমাজ, এগিয়ে যায় দেশ। তাঁরা বেঁচে থাকলে বেঁচে থাকবে দেশ, বেঁচে থাকবে পৃথিবী।
মণিরামপুরের পাঁচবাড়িয়া গ্রামের এক তরুণের এই প্রথম একক প্রদর্শনী তাই নিছক কিছু চিত্রকর্মের আয়োজন নয়; এটি সমাজের অবহেলিত অথচ অপরিহার্য মানুষগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এক আন্তরিক প্রয়াস।
যে মানুষগুলো প্রতিদিন নিজেদের শ্রম দিয়ে অন্যের জীবনকে সচল রাখেন, তাঁদের জীবনসংগ্রামকে শিল্পের ভাষায় তুলে ধরে মুরারি যেন দর্শনার্থীদের সামনে নতুন করে একটি প্রশ্ন রেখেছেন—যাঁদের শ্রম ছাড়া আমাদের জীবন অচল, তাঁদের আমরা কতটুকু মূল্যায়ন করি?
যশোরে আয়োজিত এ প্রদর্শনীতে দর্শনার্থীরা শিল্পীর দৃষ্টিতে শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রাম, কর্ম ও অবদানের পাশাপাশি সমাজের নানা বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
আর মণিরামপুরের প্রত্যন্ত গ্রামের এই তরুণ শিল্পীর ক্যানভাসে ফুটে ওঠা মানুষগুলোর গল্প মনে করিয়ে দিচ্ছে, শিল্পের সৌন্দর্য শুধু রং ও রেখার নিপুণতায় নয়; কখনো কখনো তার সবচেয়ে বড় শক্তি লুকিয়ে থাকে মানুষের প্রতি মমত্ববোধ, শ্রদ্ধা এবং তাঁদের না-বলা কথাগুলো সবার সামনে তুলে ধরার সাহসে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। নিউজ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬