
বিশেষ প্রতিবেদক
দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী আবুল খায়ের গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা পরিবারে মালিকানা ও ব্যবসা পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য নতুন মোড় নিয়েছে। প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক লেনদেনের এই শিল্পগোষ্ঠীর চার ভাই কার্যত আলাদা ব্যবসায়িক পথে হাঁটছেন। প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত আবুল খায়েরের বড় ছেলে ও গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল কাশেম নিজস্ব উদ্যোগে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ করছেন। অন্যদিকে তাঁর তিন ভাই পরিচালনা করছেন গ্রুপের প্রতিষ্ঠিত প্রধান শিল্প ও ভোগ্যপণ্যের ব্যবসাগুলো।
তবে এত বড় শিল্পগোষ্ঠীর আনুষ্ঠানিক বিভাজন এখনো সম্পন্ন হয়নি। মালিকানার অংশ, সম্পদের মূল্যায়ন, পরিচালনাগত কর্তৃত্ব এবং কয়েক দশকে ব্যবসা সম্প্রসারণে কার কতটুকু অবদান, এসব প্রশ্নে সমঝোতা আটকে রয়েছে।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকার, শিল্প খাতের ব্যক্তি এবং পারিবারিক ব্যবসার সঙ্গে পরিচিত সূত্রের বরাতে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
চেয়ারম্যান একদিকে, মূল ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ অন্য তিন ভাইয়ের
আবুল খায়ের গ্রুপের চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন আবুল কাশেম। কিন্তু ব্যাংকারদের তথ্য অনুযায়ী, গ্রুপের দৈনন্দিন গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে তাঁর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা সীমিত। উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু সাঈদ চৌধুরী ও তাঁর অন্য দুই ভাই মূল প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
শাহ সিমেন্ট, একেএস স্টিল, মার্কস ফুলক্রিম মিল্ক পাউডার, সিলন চা এবং স্টারশিপ কনডেন্সড মিল্কের মতো পরিচিত ব্র্যান্ডগুলো এই শিল্পগোষ্ঠীর অধীনে রয়েছে।
শিল্পগোষ্ঠীটির সম্পদের মালিকানা ও পরিচালনাগত কর্তৃত্বের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, সেটিই এখন পারিবারিক সমঝোতার প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, চার ভাইয়ের মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ করে মালিকানার বিষয়ে নীতিগত সমঝোতা থাকলেও কোন প্রতিষ্ঠান কার অংশে যাবে, তার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।
প্রায় চার হাজার কোটি টাকার নতুন অধিগ্রহণ
পারিবারিক ব্যবসার ভাগ নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা চলার মধ্যেই আবুল কাশেম নিজের উদ্যোগে খাদ্য ও নিত্যপণ্যের ব্যবসা সম্প্রসারণ করছেন।
স্মাইল ফুড প্রোডাক্টসের মাধ্যমে তিনি নতুন ব্যবসায়িক কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছেন। শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি আবদুল মোনেম সুগার রিফাইনারি, যা ইগলু সুগার নামে পরিচিত, অধিগ্রহণে অন্তত ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। অন্যদিকে গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালসের ভোজ্যতেল ব্যবসা অধিগ্রহণে ব্যয় হয়েছে দুই হাজার কোটি টাকার বেশি।
দুটি অধিগ্রহণের সম্মিলিত মূল্য প্রায় চার হাজার কোটি টাকা বলে শিল্প খাতের সূত্রগুলো ধারণা করছে। এর সঙ্গে ঢাকার তেজগাঁও শিল্প এলাকায় কয়েক একর জমিও সংশ্লিষ্ট রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংকারদের ভাষ্য অনুযায়ী, আবুল কাশেমের কিছু অধিগ্রহণ পারিবারিক ব্যবসায় তাঁর প্রাপ্য অংশের বিপরীতে হিসাব করা হচ্ছে। তবে আনুষ্ঠানিক সম্পদ বিভাজন না হওয়ায় এ ধরনের হিসাবের চূড়ান্ত অবস্থান পরিষ্কার নয়।
এ ছাড়া খাদ্য, পানীয় ও বিস্কুট খাতের আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণে তাঁর আগ্রহ রয়েছে। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় সিটি গ্রুপের হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলের কিছু প্রকল্প কেনার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এসব আলোচনা চূড়ান্ত লেনদেনে পরিণত হয়েছে, এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
যে ব্যবসার শুরু বিড়ি কারখানা থেকে
আবুল খায়ের গ্রুপের ইতিহাস শুরু চট্টগ্রামে ছোট পরিসরের ব্যবসা দিয়ে। প্রতিষ্ঠাতা আবুল খায়েরের মৃত্যুর পর বড় ছেলে আবুল কাশেম পরিবারের ব্যবসার দায়িত্ব নেন। তখন ব্যবসার মধ্যে ছিল চারটি বিড়ি কারখানা, একটি ইটভাটা, একটি সিনেমা হল, চট্টগ্রামের জেল রোডের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং কিছু জমি।
পরিবারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য অনুযায়ী, আবুল কাশেম ছোট ভাইদের ব্যবসায় যুক্ত করেন এবং ধীরে ধীরে তাঁদের হাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব তুলে দেন।
১৯৯৩ সালে ঢেউটিন উৎপাদনের মাধ্যমে শিল্পগোষ্ঠীটির বড় ধরনের সম্প্রসারণ শুরু হয়। এরপর ২০০২ সালে সিমেন্ট শিল্পে প্রবেশ করে প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তী সময়ে ইস্পাত, দুগ্ধজাত পণ্য, চা এবং অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের বাজারেও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে আবুল খায়ের গ্রুপ।
কিন্তু ২০০৩ সালে এক ভাইয়ের আকস্মিক মৃত্যুর পর আবুল কাশেম ব্যবসার সক্রিয় কার্যক্রম থেকে অনেকটাই সরে দাঁড়ান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। ওই সময় অন্য ভাইয়েরা শিল্পগোষ্ঠীর ব্যবস্থাপনার বড় অংশের দায়িত্ব নেন। তাঁদের নেতৃত্বে ব্যবসার আরও সম্প্রসারণ ঘটে।
২০২২ সালের দিকে আবুল কাশেম আবার সক্রিয়ভাবে ব্যবসায় যুক্ত হলে পারিবারিক কর্তৃত্ব ও পরবর্তী প্রজন্মের ভূমিকা নিয়ে মতপার্থক্য প্রকট হয়।
বিরোধের কেন্দ্রে অবদান ও উত্তরাধিকার
সংশ্লিষ্ট ব্যাংকারদের ভাষ্য অনুযায়ী, আবুল কাশেম মনে করেন, প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুর পর পরিবার ও ব্যবসাকে একত্রে ধরে রাখা, ছোট ভাইদের প্রতিষ্ঠিত করা এবং শিল্পগোষ্ঠীর ভিত্তি গড়ে তোলায় তাঁর ভূমিকার যথাযথ স্বীকৃতি থাকা উচিত।
অন্যদিকে পরিবারের অপর পক্ষের যুক্তি, আবুল কাশেম সক্রিয় ব্যবস্থাপনা থেকে দূরে থাকার সময় শিল্পগোষ্ঠীটি অনেক বড় হয়েছে। নতুন শিল্পে বিনিয়োগ, ব্যবসায়িক ঝুঁকি গ্রহণ এবং ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে বর্তমান অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার কৃতিত্ব তাঁদেরও রয়েছে।
পরবর্তী প্রজন্মকে ব্যবসার নেতৃত্বে যুক্ত করার প্রশ্নও মতপার্থক্যের একটি কারণ। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, আবুল কাশেম মনে করেছিলেন, তাঁর ছেলেকে ব্যবসায় যথাযথ ভূমিকা দেওয়া হয়নি।
তবে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে এসব বক্তব্যের প্রত্যক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি। ফলে এগুলো সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য হিসেবেই বিবেচ্য।
ব্যাংকারদের মধ্যস্থতাও ব্যর্থ
পারিবারিক বিরোধ মেটাতে ২০২৫ সালে কয়েকজন ব্যাংকার মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেন। তাঁদের প্রস্তাব ছিল, শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের পৃথক মূল্যায়ন করে মালিকানার অনুপাতে সম্পদ বণ্টন করা।
প্রস্তাব অনুযায়ী, চার ভাই তাঁদের প্রাপ্য অংশের সমপরিমাণ মূল্যমানের প্রতিষ্ঠান বা সম্পদ পেতে পারতেন। কিন্তু সম্পদের মূল্য নির্ধারণ এবং কোন প্রতিষ্ঠান কার অংশে যাবে, তা নিয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়নি।
একপর্যায়ে মধ্যস্থতাকারীরা আলোচনা থেকে সরে দাঁড়ান। পরিবারটি আইনজীবীদের সঙ্গেও আলোচনা করেছে। তবে এ বিরোধে কোনো মামলা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকার নিশ্চিত করেননি।
ব্যাংকগুলোকে চেয়ারম্যানের চিঠি
বিরোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্যাংকিং কার্যক্রমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কর্তৃত্ব।
একজন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকারের বরাতে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, কয়েক মাস আগে আবুল কাশেম গ্রুপের সঙ্গে লেনদেনকারী ব্যাংকগুলোকে চিঠি দিয়ে তাঁর অংশগ্রহণ ছাড়া পরিচালনা পর্ষদের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করার অনুরোধ জানান।
তবে ব্যাংকারদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রচলিত ব্যবস্থায় দুজন পরিচালকের স্বাক্ষরযুক্ত সিদ্ধান্তকে যথেষ্ট বিবেচনা করে ব্যাংকগুলো লেনদেন চালিয়ে গেছে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পারিবারিক মতবিরোধ সত্ত্বেও গ্রুপের মূল প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংকঋণ পরিশোধে বড় ধরনের সমস্যা দেখা যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকাররা জানিয়েছেন। অর্থাৎ মালিকানা বিরোধের কারণে শিল্পগোষ্ঠীটির ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে কিংবা ব্যাংকঋণ খেলাপি হয়েছে, এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
পৃথক ব্যবসার ভবিষ্যৎ কী
আবুল কাশেমের নতুন বিনিয়োগ এবং অন্য তিন ভাইয়ের হাতে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসাগুলোর পরিচালনা কার্যত দুটি স্বতন্ত্র ব্যবসায়িক ধারার জন্ম দিচ্ছে। কিন্তু আনুষ্ঠানিক সম্পদ বণ্টন ছাড়া এই অবস্থান কত দিন চলবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
শিল্প খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এত বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ব্যাংকঋণ, পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত, প্রতিষ্ঠানের সম্পদমূল্য এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সমঝোতা না হলে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
আবুল খায়ের গ্রুপের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করলেও প্রতিষ্ঠানটির কেউ প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হননি। ফলে চার ভাইয়ের মধ্যে শেষ পর্যন্ত সমঝোতা হবে, নাকি আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবসা ভাগ হয়ে যাবে, সে প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। নিউজ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬