
নির্বাচনে ব্যয় বাড়ছে। এটা নতুন নয়। কিন্তু ব্যয় যত বাড়ে, স্বচ্ছতার দায়ও তত বাড়ে। দৈনিক নয়া দিগন্ত গতকাল বৃহস্পতিবার তাদের প্রধান শিরোনামে এই খবর প্রকাশ করেছে।
খবর আরো বলা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট মিলিয়ে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩,১৫০ কোটি টাকা। প্রতি আসনে গড় ব্যয় সাড়ে ১০ কোটি টাকা। আগের নির্বাচনে ব্যয় ছিল ২,২৭৬ কোটি টাকা। তখন আসনপ্রতি ব্যয় ছিল সাড়ে সাত কোটির বেশি। সংখ্যাগুলো বড়। তাই মানুষের প্রশ্নও স্বাভাবিক।
ইসি বলছে গণভোট যুক্ত হওয়ায় অতিরিক্ত বরাদ্দ প্রয়োজন হয়েছে। এটাকে যুক্তি হিসেবে ধরা যায়। মূল্যস্ফীতির চাপও আছে। সময়ের ব্যবধানও আছে। তবু প্রশ্ন থাকে। এই বাড়তি খরচের ভেতরে কতটা দক্ষতা আছে। কতটা অপচয় আছে। কতটা অপ্রয়োজনীয় খাত আছে। এসব উত্তর ছাড়া আস্থা তৈরি হয় না।
ভাতা কেন্দ্রিক ব্যয় নিয়ে আলোচনা বেশি হবে। হওয়াই স্বাভাবিক। দৈনিক খোরাকি ভাতায় ধরা হয়েছে ৭৩০ কোটি ৪২ লাখ টাকা। সম্মানীতে প্রায় ৫১৫ কোটি টাকা। আপ্যায়নে ২৯০ কোটি টাকা। এমন খাতে অপচয়ের ঝুঁকি থাকে। তাই নিয়মটা স্পষ্ট হতে হবে। কে পাবেন। কেন পাবেন। কতদিন পাবেন। কোন কাজের জন্য পাবেন। একই দায়িত্বে ভিন্ন হারে ভাতা থাকলে প্রশ্ন উঠবে। এক ধরনের ভাতা নীতিমালা দরকার। বাস্তবতার সাথে মিল রেখে দরকার কড়াকড়ি নজরদারি।
মনিহারি খাতও বড়। বলা হচ্ছে ৫৮১ কোটি ৬১ লাখ টাকা। পরিবহন, জ্বালানি, মুদ্রণ, সরঞ্জাম ভাড়া এসবও বড় অঙ্ক। এই জায়গায় টেন্ডার ও সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা সবচেয়ে জরুরি। খোলা দরপত্র দরকার। তুলনামূলক দর বিশ্লেষণ দরকার। কাজ শেষে বিল পরিশোধের আগে মান যাচাই দরকার। সব তথ্য এক জায়গায় প্রকাশ করা গেলে আস্থা বাড়ে। গুজব কমে। ভালো কাজের কৃতিত্বও স্পষ্ট হয়।
গণভোট প্রচারের ব্যয় নিয়ে বাড়তি সংবেদনশীলতা আছে। কারণ গণভোটে মানুষের মতামতই মূল। এখানে সরকারি টাকার ব্যবহার নিরপেক্ষ থাকতে হবে। তথ্য দেওয়া হবে। প্রভাবিত করা হবে না। হ্যাঁ এবং না দুটোই বৈধ মত। প্রচারের ভাষাও সেই সত্য মানতে হবে। যদি কাউকে লেবেলিং করা হয়, তাহলে গণভোটের উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন ব্যয়ের নৈতিকতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
নিরাপত্তা ব্যয়কেও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য ১,৪০০ কোটি টাকার কথা এসেছে। নির্বাচন মানেই বাড়তি দায়িত্ব। মাঠ বাস্তবতা কঠিন। ঝুঁকিও থাকে। তবু প্রশ্ন আছে। ভাতা কেন লাগছে। কতটা লাগছে। কতটা যৌক্তিক। এখানে ভারসাম্য চাই। ন্যূনতমীকরণ চাই। কিন্তু ভোটারের নিরাপত্তা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। একই সাথে আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। ভোটকেন্দ্রে ভোটার যেন ভয় না পান। নারী ভোটার যেন নিরাপদ বোধ করেন। পর্যবেক্ষক ও সংবাদমাধ্যম যেন কাজ করতে পারেন। তবেই নিরাপত্তা ব্যয়ের অর্থ দাঁড়ায়।
ব্যালট ও পোস্টাল ব্যালটের খরচও নজরে থাকবে। ২৬ কোটি ব্যালট ছাপাতে ৪০ কোটি টাকার কথা বলা হয়েছে। প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালটে একেকটি ব্যালটের খরচ বলা হচ্ছে ৭০০ টাকা। অভ্যন্তরীণ পোস্টাল ব্যালটে ২৩ টাকা। এখানে প্রক্রিয়াগত দক্ষতার জায়গা আছে। ট্র্যাকিং দরকার। সময়মতো পাঠানো দরকার। সময়মতো ফেরত আনার ব্যবস্থা দরকার। অভিযোগ ব্যবস্থাপনা দরকার। অপচয় কমানোর ব্যবস্থাও দরকার।
এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো খরচের তথ্য জনসমক্ষে রাখা। শুধু বরাদ্দ নয়। বাস্তব ব্যয়ের অগ্রগতি জানানো। খাতভিত্তিক আপডেট দেওয়া। বড় ক্রয়ের টেন্ডার তথ্য প্রকাশ করা। নির্বাচন শেষে স্বাধীন অডিট করা। অডিট রিপোর্ট প্রকাশ করা। ভাতা নীতিমালা একীভূত করা। ব্যতিক্রম হলে লিখিত ব্যাখ্যা রাখা। এসব করা কঠিন নয়। ইচ্ছা থাকলেই হয়।
গণতন্ত্রের খরচ আছে। কিন্তু সেই খরচের সঙ্গে জবাবদিহি থাকা চাই। নাগরিকের টাকার প্রতিটি পয়সা নাগরিকের কাছেই জবাবদিহি। ব্যয় বাড়লেই দোষ প্রমাণ হয় না। আবার ব্যয় বাড়লেই সব ঠিক হয় না। দক্ষতা দেখাতে পারলে এই ব্যয়ও গ্রহণযোগ্য হবে। স্বচ্ছতা দেখাতে পারলে আস্থাও তৈরি হবে। আর আস্থা তৈরি হলেই নির্বাচন শক্ত হবে। রাষ্ট্রও শক্ত হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬