রেহানা ফেরদৌসী
একজন মানুষের কাছে যে নারী একদিন আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্র ছিলেন, সময়ের ব্যবধানে সেই মানুষটির চোখেই তিনি হয়তো সাধারণ হয়ে ওঠেন। যে উপস্থিতি একসময় মুগ্ধ করত, পরিচিতির পর সেটিই আর আগের মতো আকর্ষণ জাগায় না। কিন্তু এই পরিবর্তনে কি মানুষটির সৌন্দর্য ও স্বাতন্ত্র্য সত্যিই হারিয়ে যায়, নাকি বদলে যায় তাঁকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি? অন্যের চোখে নিজের মূল্য কমে যাওয়া আর নিজের প্রকৃত মূল্য হারিয়ে ফেলা এক বিষয় নয়।

চাঁদের দিকে তাকালে পৃথিবীর মানুষ দেখে রুপালি আলো, জ্যোৎস্নার মায়া আর এক রহস্যময় সৌন্দর্য। অথচ চাঁদের পৃষ্ঠ ধূসর, গর্তে ভরা ও অসমতল। কাছ থেকে দেখা চাঁদের ভূপ্রকৃতি আর দূর থেকে দেখা তার মোহনীয় রূপের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তবু চাঁদের প্রতি মানুষের মুগ্ধতা কিংবা তাকে দেখার আকাঙ্ক্ষা ফুরিয়ে যায়নি। চাঁদের বাস্তব ভূপ্রকৃতি তার জ্যোৎস্নার মায়াকে মুছে দেয়নি; বরং মনে করিয়ে দেয়, কোনো কিছুর দৃশ্যমান রূপ আর তাকে ঘিরে মানুষের অনুভব এক নয়।
মানুষের সম্পর্কেও এই মনস্তত্ত্বের প্রতিফলন দেখা যায়। দূরত্বে আমরা অনেক সময় কল্পনা দিয়ে একজন মানুষকে সাজিয়ে নিই। কাছে এলে তাঁর সীমাবদ্ধতা ও অপূর্ণতা প্রকাশ পায়; আবার অতিরিক্ত পরিচিতিতে তাঁর বিশেষত্বও চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। প্রাপ্তির পর কারও আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়, তবে তা সব সম্পর্কের অনিবার্য পরিণতি নয়। সুস্থ সম্পর্কে পরিচিতি অবহেলার কারণ না হয়ে বরং আস্থা ও গভীরতার ভিত্তি হতে পারে।
সমস্যা শুরু হয় যখন একজনের পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গিকে অন্যজন নিজের পরিচয়ের চূড়ান্ত সত্য বলে মেনে নেন। বিশেষ করে সম্পর্কের অবমূল্যায়নের মুখে অনেক নারী নিজের সৌন্দর্য, যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েন। প্রিয়জনের অবহেলা কখনো আত্মবিশ্বাসী মানুষকেও নিজের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করে। বারবার নেতিবাচক মূল্যায়নের মুখোমুখি হলে অন্যের মতামতকে নিজের সম্পর্কে সত্য বলে গ্রহণ করার ঝুঁকি তৈরি হয়।
অথচ একজন মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দ অন্য একজনের সামগ্রিক মূল্য নির্ধারণের নির্ভুল মাপকাঠি নয়। কারও কাছে আপনি আকর্ষণীয়, কারও কাছে সাধারণ—এটি মানুষের উপলব্ধির স্বাভাবিক বৈচিত্র্য। কাউকে পছন্দ না করার স্বাধীনতা যেমন রয়েছে, তেমনি তাঁর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার দায়িত্বও রয়েছে। সম্পর্কের পরিবর্তন কিংবা অনুভূতির অবসান কাউকে হেয় করার যৌক্তিকতা তৈরি করে না।
এখানেই আত্মমর্যাদার গুরুত্ব। আত্মমর্যাদা মানে নিজেকে ত্রুটিহীন ভাবা কিংবা সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করা নয়। বরং নিজের গুণ ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন থাকা, প্রয়োজনীয় পরিবর্তন গ্রহণ করা এবং অন্যের অবজ্ঞাকে নিজের পরিচয়ের সংজ্ঞা হতে না দেওয়াই আত্মমর্যাদার পরিচয়। একজন নারীর পরিচয়ও কেবল কারও ভালোবাসা, প্রশংসা কিংবা আকাঙ্ক্ষার ওপর নির্ভরশীল নয়। তাঁর চিন্তা, কর্ম, সৃজনশীলতা, সহমর্মিতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা মিলিয়েই গড়ে ওঠে তাঁর স্বাতন্ত্র্য।
তবে আত্মমর্যাদা রক্ষার দায় কেবল ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দিলেও চলবে না। পরিবার ও সমাজে এমন সম্পর্কের চর্চা জরুরি, যেখানে নারীকে প্রতিনিয়ত নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয় না; যেখানে মত প্রকাশের অধিকার, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মানসিক নিরাপত্তা গুরুত্ব পায়। অবমূল্যায়ন নীরবে সহ্য করে যাওয়াই শক্তির পরিচয় নয়; প্রয়োজনে নিজের সীমারেখা নির্ধারণ করাও আত্মসম্মানের অংশ।
চাঁদের গায়ে গর্ত আছে—এ বাস্তবতা। কিন্তু সেই বাস্তবতা তার প্রতি মানুষের মুগ্ধতাকে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করে না। তেমনি মানুষের অপূর্ণতা তাঁর সমস্ত সৌন্দর্যকে অস্বীকার করার যুক্তি হতে পারে না। নিজেকে অনন্য ভাবার জন্য অন্য কাউকে ছোট করারও প্রয়োজন নেই। নিজের সত্তাকে সম্মান করা মানে সবার চোখে সুন্দর হওয়ার দাবি নয়; বরং নিজের মূল্যকে অন্যের পছন্দ-অপছন্দের হাতে সমর্পণ না করা।
প্রশ্নটি তাই, আপনি কতজনের চোখে সুন্দর, তা নয়; বরং অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেলেও নিজের সত্তার প্রতি কতটা ন্যায়বিচার করতে পারেন।
চাঁদের আলো সবার মনে একই অনুভূতি জাগায় না, তবু তার জ্যোৎস্না মানুষের কল্পনা ও অনুভবে স্বতন্ত্র সৌন্দর্য নিয়ে ধরা দেয়। মানুষের ক্ষেত্রেও অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর সম্পূর্ণ পরিচয় নয়।
অন্যের চোখে অসুন্দর হয়ে যাওয়া মানেই নিজের সত্তায় মূল্যহীন হয়ে যাওয়া নয়।

লেখক পরিচিতি: রেহানা ফেরদৌসী
রেহানা ফেরদৌসী একজন কলামিস্ট ও ভয়েস আর্টিস্ট। তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা ও সাময়িকীতে নিয়মিত কলাম লিখেন, যেখানে সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবন নিয়ে সহজভাবে কথা বলেন।তিনি ইডেন মহিলা কলেজ থেকে অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন।তিনি বিশ্লেষণধর্মী লেখা,সমসাময়িক সমাজ, সংকট ও নানামুখী সমস্যাবলিকে গভীর পর্যবেক্ষণ ও যুক্তিনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরেন। তাঁর লেখায় বাস্তবতা, সচেতনতা ও চিন্তার গভীরতার সুষম প্রতিফলন লক্ষ করা যায়।
ভয়েস আর্টিস্ট হিসেবে আবৃত্তি ও তথ্যচিত্রে তাঁর কণ্ঠস্বর শ্রোতাদের কাছে পরিচিত ও সমাদৃত।
তিনি কেন্দ্রীয় পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক)-এর কার্যনির্বাহী কমিটির সমাজকল্যাণ বিভাগের সহসভানেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং নারীর কল্যাণে কাজ করছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। নিউজ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬