আলী কদর পলাশ
সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান ২৭ জানুয়ারি মঙ্গলবার যা বলেছেন, তা নতুন নয়। কিন্তু তিনি যে ভাষায় বলেছেন, তা বিস্ফোরক। তিনি নিজেই আমলাতন্ত্রের ভেতরকার মানুষ ছিলেন। সচিব ছিলেন। এখন উপদেষ্টা। তাই তাঁর বক্তব্য শুধু অভিযোগ নয়। ভিতরের সাক্ষ্য। ভিতরের আর্তনাদ।
তিনি বলেছেন, আমলাতন্ত্র জগদ্দল পাথরের মতো। জনগণের বুকে চেপে বসেছে। কিছুই করা যায় না। মানবিক দায়িত্ববোধ নেই। এগুলো কথার ফুলঝুরি নয়। এগুলো রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি।
কিন্তু প্রশ্ন একটাই। যদি কিছুই করা না যায়, তাহলে রাষ্ট্র চলে কীভাবে। মন্ত্রণালয় থাকে কেন। সচিবালয় থাকে কেন। নীতিমালা থাকে কেন। আইন থাকে কেন। উপদেষ্টা থাকে কেন।
এখানেই আসল সমস্যা। বক্তব্যটি যতটা সত্য, ততটাই বিপজ্জনক। কারণ এটি মানুষকে বলে দেয়, সিস্টেম অজেয়। প্রতিরোধ অর্থহীন। চেষ্টা বৃথা। এই ধরনের বার্তা নাগরিককে হতাশ করে। আর হতাশ নাগরিক একদিন ক্ষোভে অন্ধ হয়ে যায়।
উপদেষ্টা নিজেই বলেছেন, মানুষ এত ক্ষুব্ধ যে কেউ নাকি বলেছে, মাইলস্টোন বিমান দুর্ঘটনা স্কুল কলেজে না পয়ে সচিবালয়ের ওপর হওয়া উচিত ছিল। এই বাক্যটি ভয়ংকর। এটি নিষ্ঠুর। এটি অপরাধকে উসকে দেয়। যে কোনো দুর্ঘটনায় কারও মৃত্যু কামনা করা মানবিক নয়। রাষ্ট্র পরিচালনার সমালোচনা করা যাবে। করা উচিত। কিন্তু হত্যাকামনা সমর্থন করা যায় না। এই জায়গায় দায়িত্বশীল অবস্থান জরুরি ছিল। উপদেষ্টারও। অনুষ্ঠানেরও। রাষ্ট্রেরও।
তারপরও উপদেষ্টার বক্তব্য আমলাতন্ত্রের আসল রোগটা খুলে দিয়েছে। চিঠি চালাচালি। কাগজ ঘোরানো। সভা সমিতি লাঞ্চ স্ন্যাকস। ফাইল নড়বে না। সিদ্ধান্ত হবে না। দায় নেবে না। মানুষের সমস্যা তাদের সমস্যা নয়। এই বর্ণনা বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের অভিজ্ঞতা।
আরেকটি গুরুতর অভিযোগ তিনি তুলেছেন। নীতিমালা তিনি বোর্ডে লিখে বুঝিয়ে দিয়েছেন। তবু হচ্ছে না। কারণ আমলারা পরিবর্তন চান না। তারা সুবিধা চান। পে স্কেল চান। দুর্নীতির সুযোগ চান। সাধারণ মানুষ গোল্লায় যাক। এই বাক্যগুলো কড়া। এই বাক্যগুলো রাজনৈতিক বারুদের মতো। কারণ এটি সরাসরি প্রশাসনকে দুর্নীতিপরায়ণ বলে চিহ্নিত করছে।
এখানে দুইটি সত্য একসাথে দাঁড়ায়।
এক। আমলাতন্ত্রের ভেতরে সত্যিই দায়হীনতা আছে। দীর্ঘসূত্রতা আছে। ক্ষমতার অহংকার আছে। জনসেবাকে কেউ কেউ ব্যক্তিগত খেয়ালের অধীন করে ফেলে। জনগণ অপমানিত হয়। ক্ষুব্ধ হয়।
দুই। শুধু আমলাতন্ত্রকে দায়ী করলে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায় লুকিয়ে যায়। আমলাতন্ত্র জগদ্দল পাথর হলে তাকে কে পাথর বানাল। কারা তাকে জবাবদিহির বাইরে রাখল। কারা পদায়নকে পুরস্কার বানাল। কারা দুর্নীতিবাজকে রক্ষা করল। কারা কাজ না করাকে নিরাপদ বানাল। এই প্রশ্নগুলো না করলে সত্য অর্ধেক থাকে। আর অর্ধেক সত্য সবচেয়ে বড় মিথ্যা।
উপদেষ্টা বলেছেন, সরকারের মেয়াদ আছে আর ১৫ দিন। আমরা চলে যাব। কিন্তু সমস্যা যাবে না। এই কথাটিও বিপজ্জনক। কারণ এতে শাসন মানসিকতা ফুটে ওঠে। যেন সরকার যাওয়া আসার জিনিস। কিন্তু জনগণের জীবন, নিরাপত্তা, সেবা, এগুলো স্থায়ী। প্রশাসনিক সংস্কারও স্থায়ী। ১৫ দিন বলেই যদি সবাই হাত তুলে দেয়, তাহলে রাষ্ট্র পরিচালনা কিসের।
তার বক্তব্যে পরিবেশ দূষণ, শব্দ দূষণ, নগর দূষণ, এসবের পেছনে আমলাতন্ত্রকে কারণ বলা হয়েছে। আংশিক সত্য। কিন্তু বাস্তবতা আরও কড়া। দূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন আছে। ক্ষমতা আছে। বাজেট আছে। কিন্তু প্রয়োগ নেই। মনিটরিং নেই। স্বার্থের সংঘাত আছে। বড় দূষণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হয় না। ছোট লোককে ধরা হয়। বড় লোক ছাড় পেয়ে যায়। এই দ্বৈত নীতি তৈরি করে অবিশ্বাস। এই অবিশ্বাসই জনরোষকে উসকে দেয়।
চালকের শাস্তির আইন আছে। কিন্তু প্রশিক্ষণ না দিলে শাস্তি কোথায় পাবেন। উপদেষ্টার এই যুক্তি সঠিক। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব এখানেই শেষ নয়। প্রশিক্ষণ দিতে হবে। লাইসেন্সিং স্বচ্ছ করতে হবে। ফিটনেস সার্টিফিকেট দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। সড়ক নকশা নিরাপদ করতে হবে। সিগনাল ব্যবস্থা ঠিক করতে হবে। মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে। এগুলো প্রশাসন ছাড়া সম্ভব নয়। আবার রাজনৈতিক চাপ ছাড়া প্রশাসন নড়বে না। দুটিই একে অন্যের দোষ দেখিয়ে পালাতে পারে না।
এখন প্রশ্ন, এমন বক্তব্যের পর করণীয় কী।
প্রথম। উপদেষ্টার বক্তব্য যদি সত্য হয়, তাহলে তিনি নাম বলুন। কোন দপ্তর নীতিমালা আটকে রেখেছে। কোন স্তরে সিদ্ধান্ত থেমেছে। কারা বাধা দিচ্ছে। তথ্য ছাড়া অভিযোগ কাগজের আগুন। শিরোনাম হয়। সংস্কার হয় না।
দ্বিতীয়। সচিবালয়সহ সব দপ্তরে ফাইল ট্র্যাকিং প্রকাশ্য করতে হবে। কোন ফাইল কোথায়। কতদিন পড়ে আছে। কে ধরে রেখেছে। নির্দিষ্ট সময়সীমা না মানলে জবাবদিহি হবে। এই ব্যবস্থা ছাড়া চিঠি চালাচালির রাজত্ব যাবে না।
তৃতীয়। সেবা নিতে এসে নাগরিক অপমানিত হলে অভিযোগ জানানোর স্বাধীন পথ চাই। দপ্তরের ভেতরের অভিযোগ বাক্স নয়। স্বাধীন নাগরিক গ্রিভেন্স কমিশন। দ্রুত তদন্ত। দ্রুত শাস্তি। না হলে আচরণ বদলাবে না।
চতুর্থ। পদায়ন পদ্ধতি বদলাতে হবে। কাজের ভিত্তিতে পদায়ন। ব্যর্থতার জন্য অবনতি। দুর্নীতিতে শূন্য সহনশীলতা। ফাইল আটকিয়ে ক্ষমতা প্রদর্শন করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে।
পঞ্চম। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নিজের দায় নিতে হবে। আমলাতন্ত্রকে ঢাল বানিয়ে পার পাওয়া যাবে না। রাষ্ট্রের ব্যর্থতায় শেষ দায় সরকারকেই বহন করতে হয়। এটিই গণতন্ত্রের নিয়ম।
উপদেষ্টার বক্তব্য অনেককে স্বস্তি দেবে। কারণ কেউ তো বলছে। কেউ তো সাহস দেখাচ্ছে। কিন্তু শুধু বলা যথেষ্ট নয়। কঠিন ভাষা দিয়ে যদি কঠিন সিদ্ধান্ত না আসে, তাহলে এটি আরেকটি বক্তৃতা হয়ে থাকবে। আর জনগণের কাছে বক্তৃতার বাজার ভেঙে পড়েছে বহু আগেই।
রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর মানুষের আস্থা ভাঙলে তা ফেরানো কঠিন। আজ জগদ্দল পাথরের কথায় হাততালি হবে। কাল সেই হাততালিই বদলে যাবে আগুনে। তাই এখনই কাজের কাজ দরকার। নাম ধরে ব্যবস্থা দরকার। নিয়ম বদলানো দরকার। নইলে এই স্বীকারোক্তি ইতিহাসে থাকবে। সংস্কার থাকবে না।
২৯ জানুয়ারি, ২০২৬
ধানমন্ডি, ঢাকা
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬