
আলী কদর পলাশ
একটি চিঠি কখনো কখনো সময়ের চেয়েও দীর্ঘজীবী হয়। লেখক চলে যান, প্রাপকও থাকেন না, বদলে যায় দেশ, পৃথিবী, সভ্যতার ভাষা। তবু কাগজের কয়েকটি পঙ্ক্তি রয়ে যায়। শত বছর পর সেই পঙ্ক্তি খুলে দিলে মনে হয়, দুজন মানুষ যেন আবার মুখোমুখি বসেছেন। একজন কবি, অন্যজন দার্শনিক। একজন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অন্যজন বার্ট্রান্ড রাসেল।
নোবেল পুরস্কারের অফিসিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাঁদের ১১৪ বছরের পুরনো একটি চিঠি। ১৯১২ সালের ১৩ অক্টোবর লেখা সেই চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ রাসেলকে জানিয়েছিলেন, তিনি তাঁর ‘দ্য এসেন্স অব রিলিজিয়ন’ প্রবন্ধটি পড়েছেন। পড়তে গিয়ে তাঁর মনে পড়েছে উপনিষদের একটি শ্লোক। ধর্ম, মানুষ, ভয়, অসীম এবং মুক্তির প্রশ্নে দুই ভিন্ন ভূখণ্ডের দুই মনীষীর চিন্তা যেন একটি বিন্দুতে এসে মিলেছিল।
ঘটনাটি ছোট। একটি চিঠি মাত্র। অথচ তার ভেতর লুকিয়ে আছে এক বিশাল পৃথিবী।

রবীন্দ্রনাথ তখনো নোবেলজয়ী নন। ঠিক পরের বছর ১৯১৩ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাবেন। প্রথম অইউরোপীয় সাহিত্যিক হিসেবে সেই অর্জন তাঁকে বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যাবে। আর যাঁকে তিনি চিঠি লিখছেন, সেই বার্ট্রান্ড রাসেলও তখন ভবিষ্যতের নোবেলজয়ী। আরও ৩৭ বছর পরে ১৯৫০ সালে মানবতাবাদী আদর্শ ও চিন্তার স্বাধীনতার পক্ষে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ রচনার স্বীকৃতি হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাবেন তিনি।
কিন্তু ইতিহাসের সৌন্দর্য এখানেই যে, চিঠিটি লেখা হয়েছিল কোনো পুরস্কারের পরিচয় থেকে নয়। একজন মানুষ আরেকজন মানুষের চিন্তাকে ছুঁয়ে গিয়েছিলেন বলেই চিঠিটি লেখা হয়েছিল। এখানে পদক নেই, খ্যাতির হিসাব নেই, কে পূর্বের আর কে পশ্চিমের সেই অহংকারও নেই। আছে শুধু ভাবনার সঙ্গে ভাবনার সাক্ষাৎ।
রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শনের কেন্দ্রে ছিল মানুষ। ধর্ম তাঁর কাছে মানুষের চারপাশে তোলা দেয়াল ছিল না। বরং মানুষ নিজের ক্ষুদ্র সত্তা অতিক্রম করে বৃহত্তরের সঙ্গে মিলিত হতে পারে, এ ছিল তাঁর বিশ্বাসের অন্যতম ভিত্তি। তাই রাসেলের ধর্মবিষয়ক একটি লেখা পড়েও তিনি উপনিষদের স্মৃতি খুঁজে পান। প্রাচ্যের প্রাচীন বাণী এবং পাশ্চাত্যের আধুনিক যুক্তিবাদী চিন্তার মধ্যে তিনি বিরোধের দেয়াল খাড়া করেননি। খুঁজেছেন মিলনের পথ।
আমাদের সময়ের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে বিষয়টি বিশেষভাবে মনে রাখার মতো।
এখন আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি, যেখানে মানুষ প্রায়ই আগে পরিচয় জানতে চায়, পরে বক্তব্য শোনে। কে কোন ধর্মের, কোন জাতির, কোন দলের, কোন দেশের, কোন মতের, সেটিই যেন মানুষকে বিচার করার প্রথম মাপকাঠি হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্নমত অনেক সময় আলোচনার জন্ম দেয় না, জন্ম দেয় বিদ্বেষের। রাজনীতিতে প্রতিপক্ষ শত্রুতে পরিণত হয়। ধর্মের নামে মানুষ মানুষকে দূরে ঠেলে দেয়। জাতীয়তাবাদের নামে অন্য জাতিকে ছোট করার প্রবণতা দেখা দেয়। এমনকি জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও আমরা অনেক সময় নিজের মতের বাইরে থাকা চিন্তাকে শুনতে চাই না।
১১৪ বছর আগের একটি চিঠি তাই আজও আমাদের প্রশ্ন করে, আমরা কি সত্যিই এতটা এগিয়েছি?
রবীন্দ্রনাথ এবং রাসেলের চিন্তা এক ছিল না। তাঁদের দর্শনের উৎসও এক নয়। একজন কবির চোখে জীবন দেখেছেন, অন্যজন যুক্তি, গণিত ও দর্শনের কঠিন পথ ধরে সত্যের সন্ধান করেছেন। রাসেল ছিলেন প্রশ্ন করতে অভ্যস্ত। রবীন্দ্রনাথও কোনো সংকীর্ণ ধর্মবোধের মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। অথচ তাঁদের মধ্যে কথোপকথনের পথ বন্ধ হয়নি। বরং পার্থক্যই তাঁদের কৌতূহলী করেছে।
এই জায়গাটিই সভ্যতার সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
মানুষের সঙ্গে মানুষের মিল শুধু একই মতের মধ্যে হয় না। ভিন্নমতের মধ্যেও গভীর যোগাযোগ সম্ভব। প্রয়োজন কৌতূহল, শ্রদ্ধা এবং নিজের জানার সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার সাহস। জ্ঞান তখনই এগোয়, যখন মানুষ অন্যের কথা শোনে। সভ্যতাও তখনই বড় হয়, যখন এক সংস্কৃতি আরেক সংস্কৃতির কাছ থেকে শেখে।
রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনের স্বপ্নের ভেতরেও এই বিশ্বমানবতার বোধ ছিল। তিনি এমন শিক্ষা চেয়েছিলেন, যেখানে জানালা বন্ধ থাকবে না। পৃথিবীর বাতাস আসবে। ভারতীয় ঐতিহ্য থাকবে, আবার বিশ্বের জ্ঞানও সেখানে প্রবেশ করবে। নিজের শিকড় অস্বীকার করে নয়, শিকড়কে শক্ত রেখেই বিশ্বকে গ্রহণ করার শিক্ষা ছিল সেটি।
বাংলাদেশের জন্যও এই ভাবনার আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ আমাদের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা। তাঁর সাহিত্য আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির গভীরে মিশে আছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে কেবল কবিতা, গান কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্যে আটকে রাখলে তাঁকে পুরোটা পাওয়া যায় না। তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষার একটি হলো মুক্তবুদ্ধি। মানুষকে বড় করে দেখা। সংকীর্ণ পরিচয়ের ওপরে মানবিক পরিচয়কে স্থান দেওয়া।
এই শিক্ষা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাতেও জরুরি।
আমরা শিক্ষার্থীদের অনেক তথ্য শেখাই। পরীক্ষার জন্য উত্তর মুখস্থ করাই। কিন্তু প্রশ্ন করতে শেখাই কতটা? ভিন্নমত শুনতে শেখাই কতটা? একটি বই পড়ে আরেকটি বইয়ের কথা মনে পড়া, একটি দর্শনের সঙ্গে আরেকটি দর্শনের সম্পর্ক খুঁজে বের করা, একটি সংস্কৃতির আলো দিয়ে অন্য সংস্কৃতিকে বোঝার চেষ্টা করা, এসবই তো প্রকৃত শিক্ষার অংশ।
রবীন্দ্রনাথ রাসেলের লেখা পড়ে উপনিষদের কথা মনে করেছিলেন। এই একটি ঘটনাই শিক্ষার অসাধারণ উদাহরণ। জ্ঞান তাঁর কাছে আলাদা আলাদা বাক্সে রাখা ছিল না। সাহিত্য একদিকে, দর্শন আরেকদিকে, ধর্ম অন্যদিকে এমন নয়। সবকিছু মিলিয়েই মানুষের চিন্তার জগৎ।
আজকের প্রযুক্তিনির্ভর যুগে জ্ঞান মানুষের হাতের মুঠোয়। কয়েক সেকেন্ডে হাজার তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু তথ্য পাওয়া আর জ্ঞানী হওয়া এক কথা নয়। তথ্যের পাহাড়ের মাঝেও মানুষ সংকীর্ণ হতে পারে। হাজার মানুষের সঙ্গে অনলাইনে যুক্ত থেকেও নিজের মতের ছোট একটি ঘরের মধ্যে বন্দী থাকতে পারে।
এই কারণে রবীন্দ্রনাথ ও রাসেলের সেই পুরনো চিঠিটির মূল্য আরও বেড়ে যায়। সেটি আমাদের বলে, পড়ো। কিন্তু শুধু নিজের পছন্দের লেখা নয়। অন্যের কথাও পড়ো। প্রশ্ন করো। নিজের বিশ্বাসকে যাচাই করো। অন্য সভ্যতার দরজা খুলে দেখো। তবেই নিজের চিন্তাও সমৃদ্ধ হবে।
চিঠিটির আরেকটি গভীর বিষয় ভয়।
রবীন্দ্রনাথ সেখানে মানুষের সসীম সত্তার দেয়াল ভেঙে অসীম জীবনের আনন্দে পৌঁছানোর কথা বলেছিলেন। সেই অবস্থায় মানুষ ভয় থেকে মুক্ত হয়। এই ভয় শুধু ব্যক্তিগত মৃত্যুভয় নয়। মানুষ যখন নিজেকে খুব ছোট কোনো পরিচয়ের মধ্যে আটকে ফেলে, তখন তার চারপাশে ভয় তৈরি হয়। অন্য ধর্মকে ভয়, অন্য জাতিকে ভয়, অন্য মতকে ভয়, অন্য সংস্কৃতিকে ভয়।
আর ভয় থেকে জন্ম নেয় ঘৃণা।
বিশ্বের বহু সংঘাতের গভীরে এই ভয় কাজ করে। আমার পরিচয় হারিয়ে যাবে, আমার বিশ্বাস বিপন্ন হবে, আমার ক্ষমতা কমে যাবে, আমার গোষ্ঠী পিছিয়ে পড়বে এই আশঙ্কা মানুষকে অনেক সময় আক্রমণাত্মক করে তোলে। রবীন্দ্রনাথের অসীমের ধারণা সেই ছোট দেয়াল ভাঙার কথা বলে। রাসেলের যুক্তিবাদও মানুষকে অন্ধ বিশ্বাস থেকে বেরিয়ে প্রশ্ন করতে শেখায়।
একজন যেন হৃদয়ের দরজা খুলছেন, অন্যজন বুদ্ধির জানালা।
দুই পথ শেষ পর্যন্ত মানুষকেই খুঁজছে।
নোবেল পুরস্কারের কর্তৃপক্ষ এত বছর পর এই চিঠি সামনে এনে শুধু ইতিহাসের একটি দুর্লভ দলিল দেখায়নি। অজান্তেই হয়তো আমাদের সময়ের জন্য একটি আয়নাও তুলে ধরেছে। সেই আয়নায় আমরা দেখতে পারি, শতাধিক বছর আগে দুই মনীষী কত সহজে একে অন্যের চিন্তার দিকে হাত বাড়িয়েছিলেন, আর আজ এত যোগাযোগ প্রযুক্তির মধ্যেও আমরা কত দ্রুত একে অন্যের কাছ থেকে দূরে সরে যাই।
চিঠির কাগজ পুরনো হয়েছে। অক্ষরও সময়ের ছাপ বহন করছে। কিন্তু প্রশ্নগুলো পুরনো হয়নি।
মানুষ কি শুধু নিজের বিশ্বাস নিয়েই বাঁচবে, নাকি অন্যের সত্যটুকুও বোঝার চেষ্টা করবে? ধর্ম কি দেয়াল হবে, নাকি মানুষকে বৃহত্তর মানবতার দিকে নিয়ে যাবে? যুক্তি কি হৃদয়হীন হবে, নাকি মানবিকতার পাহারাদার হবে? আর শিক্ষা কি শুধু জীবিকার সিঁড়ি, নাকি মানুষকে উদার করার পথ?
রবীন্দ্রনাথ ও রাসেলের সেই চিঠি এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেয় না। মহান চিন্তার কাজ উত্তর মুখস্থ করানো নয়। মহান চিন্তা প্রশ্ন জাগিয়ে রাখে।
১১৪ বছর পরে সেই চিঠি আবার আমাদের সামনে এসেছে। ভালোই হয়েছে।
এমন এক সময়ে এসেছে, যখন পৃথিবীর খুব প্রয়োজন একে অন্যের কথা শোনা। খুব প্রয়োজন যুক্তির পাশে মানবতা, বিশ্বাসের পাশে উদারতা এবং নিজের পরিচয়ের পাশে বিশ্বমানবের পরিচয়টুকু মনে রাখা।
এক শতাব্দীরও বেশি আগে একজন বাঙালি কবি আর একজন ব্রিটিশ দার্শনিকের মধ্যে কয়েকটি পঙ্ক্তির যে সেতু তৈরি হয়েছিল, তার ওপর দিয়ে আজও হেঁটে যাওয়া যায়।
শুধু আমাদের মনটুকু খোলা রাখতে হবে।





