
এম.আর.জে শান্ত
একসময় বাংলা নাটক মানেই ছিল গল্প, অভিনয়, সংলাপ আর নির্মাণশৈলীর এক অপূর্ব সমন্বয়। ঈদের বিশেষ আয়োজন বা উৎসব ঘিরে দর্শকের দীর্ঘ অপেক্ষা থাকত নতুন গল্পের জন্য। একটি নাটকের জনপ্রিয়তা নির্ধারিত হতো তার শৈল্পিক গুণ ও গভীরতার বিচারে। সময়ের সাথে মাধ্যম বদলেছে; টেলিভিশনের পাশাপাশি ইউটিউব, ফেসবুকসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নাটক প্রকাশ এখন স্বাভাবিক বিষয়। আর এই পরিবর্তনের সাথে নাটকের সাফল্য মাপার অন্যতম বড় মাপকাঠি হয়ে উঠেছে ‘ভিউ’।
ভিউ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। একটি নাটক যত বেশি দর্শকের কাছে পৌঁছাবে, নির্মাতা ও প্রযোজকের জন্য ততই তা সাফল্যের বার্তা বয়ে আনবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই ভিউয়ের ইঁদুরদৌড়ে বাংলা নাটকের মান কতটা টিকে থাকছে?

বর্তমানে নাটকের প্রচারে গল্পের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে চটকদার শিরোনাম, আকর্ষণীয় পোস্টার, থাম্বনেইল কিংবা এমন কিছু দৃশ্য, যা প্রকাশের আগেই দর্শকের মনে কৌতূহল তৈরি করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্ব্যর্থবোধক সংলাপ, অপ্রয়োজনীয় ঘনিষ্ঠতা বা ইঙ্গিতপূর্ণ দৃশ্য ব্যবহার করা হচ্ছে দর্শক টানার কৌশল হিসেবে। ফলে নাটকটি কতটা মানসম্মত হলো, তার চেয়ে কত দ্রুত সেটি ভাইরাল হলো—সেই হিসাবটিই বড় হয়ে উঠছে।
এ প্রসঙ্গে অনেক নাট্যনির্মাতা ও শিল্পীরাও মাঝেমধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সবাই যখন শুধু ভিউ আর ট্রেন্ডিংয়ের পেছনে ছুটছে, তখন ভালো গল্প নিয়ে কাজ করার বাজেট ও সাহস দুটোই কমে যাচ্ছে।
প্রেম, সম্পর্ক, আবেগ কিংবা মানুষের জীবনের জটিলতা নাটকের গল্পে থাকতেই পারে। প্রাপ্তবয়স্ক বিষয় নিয়ে গল্প বলাও শিল্পের বাইরে নয়। কিন্তু গল্পের প্রকৃত প্রয়োজন আর দর্শকের সস্তা কৌতূহল উসকে দেওয়ার কৌশল এক নয়। কোনো দৃশ্য যদি গল্পকে এগিয়ে নেয় বা বাস্তবতাকে তুলে ধরে, তবে তা শিল্পের অংশ। কিন্তু কেবল ভিউ বাড়ানোর স্বার্থে কোনো দৃশ্য বা সংলাপ জুড়ে দেওয়া হলে শিল্পের জায়গাটি মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মূল বাস্তবতা হলো এখানে মনোযোগ ধরে রাখার তীব্র প্রতিযোগিতা। কয়েক সেকেন্ডের থাম্বনেইল বা শিরোনামই ঠিক করে দেয় দর্শক ভিডিওতে প্রবেশ করবেন কি না। সেই সুযোগ নিতে গিয়েই কিছু নির্মাতা সহজ ও দ্রুত আকর্ষণের পথ বেছে নিচ্ছেন, যার ফলশ্রুতিতে বাড়ছে যৌন ইঙ্গিতনির্ভর বা চটুল উপস্থাপন।
পুরো দায় নির্মাতা বা অভিনয়শিল্পীদের ওপর চাপিয়ে দিলে চিত্রটি সম্পূর্ণ হবে না। দর্শকের চাহিদাও এখানে সমানভাবে জড়িত। যে ধরনের কনটেন্টে মানুষ বেশি ক্লিক করছেন, দেখছেন বা শেয়ার করছেন, বাজার স্বাভাবিকভাবেই সেদিকে ঝুঁকবে। অর্থাৎ, ভিউয়ের এই বাজারে দর্শকও একটি বড় অংশীদার।
তবে ‘বেশি ভিউ মানেই ভালো নাটক’—এই ধারণা একেবারেই ভ্রান্ত। একটি নাটক কোটি ভিউ পেলেও তুলনামূলক কম দর্শকপ্রিয় নাটক গল্প ও অভিনয়ের বিচারে অনেক বেশি শক্তিশালী হতে পারে। জনপ্রিয়তা এবং গুণগত মান সবসময় একই সমান্তরালে চলে না।
সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন ভিউকে একমাত্র সাফল্যের মাপকাঠি ধরে নেওয়া হয়। এতে গল্পের গভীরতা, চরিত্রের সঠিক বিকাশ, সংলাপের মান কিংবা সামাজিক দায়বদ্ধতার মতো বিষয়গুলো পেছনে পড়ে যায়। দ্রুত ফল পাওয়ার চাপে নির্মাতারা অনেক সময় সহজ বিনোদন বা বিতর্কিত বিষয়ের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
অন্যদিকে, দর্শকেরও বড় দায়িত্ব রয়েছে। আমরা কোন ধরনের থাম্বনেইলে ক্লিক করছি বা কোন কনটেন্ট ভাইরাল করছি, তার ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী কাজগুলোর মান নির্ধারিত হয়। দর্শক যদি মানসম্মত গল্পকে উৎসাহ জোগান, তবে নির্মাতারাও ভালো কাজ করতে অনুপ্রাণিত হবেন।
বাংলা নাটকের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ শুধু অশ্লীলতা রোধ করা নয়; বরং এমন একটি সুস্থ পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে ভালো গল্প ও নির্মাণও বাণিজ্যিকভাবে সফল হতে পারে। ভিউ থাকবে, বিনোদন ও প্রেম থাকবে, সমকালীন জীবনের বাস্তবতার প্রতিফলনও থাকবে—তবে তা হতে হবে গল্পের প্রয়োজনে, কেবল ক্লিকের লোভে নয়।
নাটক কেবল একটি ভিডিও নয়; এটি একটি সমাজের রুচি, সময়ের ভাষা এবং মানুষের জীবনকে ফুটিয়ে তোলার দর্পণ। ভিউ একটি সংখ্যামাত্র, কিন্তু একটি ভালো নাটকের প্রভাব অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী।
তাই প্রশ্নটি কেবল ‘কত ভিউ হলো? হওয়া উচিত নয়, বরং প্রশ্ন করা দরকার— কী দেখিয়ে সেই ভিউ অর্জন করা হলো?
ভিউ যদি নাটকের সাফল্যের মাপকাঠি হয়, তবে মানই হওয়া উচিত তার একমাত্র ভিত্তি। এই ভিত্তি দুর্বল করে অশ্লীলতার ওপর জনপ্রিয়তা গড়ার চেষ্টা সাময়িক ভিউ আনতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা দর্শক ও শিল্প উভয়কেই ধ্বংস করবে।
লেখক: তরুণ নির্মাতা ও সাংবাদিক





