নিজস্ব প্রতিবেদক
'ভালো বাপ, ভালো স্বামী হতে পারিনি, ক্ষমা করিস’—কারাফটকে কফিনে মোড়া মৃত স্ত্রী-সন্তানকে দেখে ভেঙে পড়লেন বন্দি সাদ্দাম। ক্ষমতার পালাবদলে নিয়মের নিষ্ঠুরতায় থেমে গেল একটি পরিবার। মৃত্যু বেঁধে দিল একটি ইতিহাস। তৈরি হল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আজীবনের প্রশ্ন।
জীবিত শিশুকে কোলে নেওয়া হয়নি, মৃত শিশুকেও না—
বাগেরহাটের সাবেকডাঙ্গা গ্রামের এক বাড়িতে শুক্রবার যে নীরবতা নেমে এসেছিল, তা শনিবার রাত পর্যন্ত গড়ায় আরও ভারী শোকে। গৃহবধূ কানিজ সুবর্ণা ও তার নয় মাস বয়সী শিশুসন্তানের মরদেহ শনিবার মধ্যরাতে দাফন হয়েছে বাগেরহাট সদর উপজেলার ওই গ্রামে। কিন্তু দাফনের আগে যে দৃশ্য দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছে—তা ঘটেছে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের লোহার গেইটে। ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে করে মৃত স্ত্রী ও শিশুর মরদেহ কারাফটকে আনা হলে পাঁচ মিনিটের জন্য তাদের সামনে আনা হয় কারাবন্দি স্বামী ও শিশুটির বাবা, ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল হাসান সাদ্দামকে। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই ক্ষণেই তিনি বলে ওঠেন—“আমি ভালো বাপ হতে পারিনি, বাপ ক্ষমা করিস… ভালো স্বামী হতে পারি নাই, ক্ষমা করিস।”
সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তি না পাওয়া, আবেদনপত্র ঘিরে প্রশাসনের সঙ্গে পরিবারের ভিন্ন ভাষ্য, আর শেষমেশ “লাশ দেখার ব্যবস্থা” করে পাঁচ মিনিটের সাক্ষাৎ—সব মিলিয়ে ঘটনাটি এখন কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; রাষ্ট্র, রাজনীতি ও মানবিকতার সংঘাতে দাঁড়িয়ে থাকা এক জাতীয় আলোচনার নাম।
কী ঘটেছিল সাবেকডাঙ্গায়
পুলিশ শুক্রবার বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামের বাড়ি থেকে কানিজ সুবর্ণার মরদেহ উদ্ধার করে। পরিবারের বর্ণনা অনুযায়ী, মরদেহটি ঝুলন্ত অবস্থায় ছিল এবং পাশে ফ্লোরে পাওয়া যায় নয় মাস বয়সী শিশুর মরদেহ। ময়নাতদন্ত শেষে জানাজা ও দাফন প্রস্তুত হয়। এই সময়ই পরিবারের পক্ষ থেকে কারাবন্দি সাদ্দামকে জানাজায় আনতে প্যারোলের জন্য আবেদন করার উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে স্বজনরা জানিয়েছেন।
“আবেদন করেছি”—স্বজনদের দাবি
পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য, প্যারোলের আবেদন নিয়ে তারা বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের কাছে গেলে আবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ না করে তাদের কারা প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়। পরে কারা প্রশাসন থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়—মরদেহ যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের গেইটে নিয়ে গেলে সাদ্দামের সঙ্গে দেখা করানো যাবে। সেই আশ্বাসের ওপর ভর করেই শনিবার বিকেলে ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ দুটি বাগেরহাট থেকে যশোরে নেওয়া হয়।
সাদ্দামের ভাই মো. শহীদুল ইসলাম জানান, স্ত্রী-সন্তানের মরদেহ কারাফটকে পৌঁছানোর পর তাদের সঙ্গে আরও কয়েকজন স্বজন ছিলেন। নির্ধারিত সময়ের জন্য সাদ্দামকে গেইটে আনা হয়—হাতে হাতকড়া ছিল না। কিন্তু তিনি শিশুটিকে কোলে নেননি। ভাইয়ের ভাষায়, “জীবিত থাকতেই তো কোলে নিতে পারলাম না, এখন আর নিয়ে কী করবো।” এরপর শিশুটির মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন—“আমি ভালো বাপ হতে পারিনি, বাপ ক্ষমা করিস।” স্ত্রীর উদ্দেশেও বলেন—“ভালো স্বামী হতে পারি নাই, ক্ষমা করিস।” শহীদুল ইসলামের দাবি, এ সময় সাদ্দাম গেইট থেকে এক মুঠো মাটি তুলে তাকে দেন এবং বলেন, সেটি যেন স্ত্রী-সন্তানের কবরে দিয়ে দেওয়া হয়। পরে মরদেহ দুটি আবার বাগেরহাটে এনে রাত সাড়ে এগারটার দিকে জানাজা শেষে দাফন করা হয়।
জেলা প্রশাসনের বক্তব্য: “যশোরে আবেদন করার কথা বলা হয়েছিল”
বাগেরহাট জেলা প্রশাসক আব্দুল বাতেন বলেন, পরিবারের সদস্যরা তাদের কাছে গেলে জানানো হয়—এ ধরনের আবেদন করতে হবে যশোরে জেল সুপার কিংবা জেলা প্রশাসকের কাছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বাগেরহাটের জেল সুপার যশোর কারাগারের সঙ্গে আলোচনা করেছে এবং সাক্ষাতের জন্য পরিবার যশোরে গেছে; জেলা প্রশাসন সহযোগিতা করেছে।
তবে যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেছেন, তারা এ ধরনের কোনো আবেদনই পাননি। অর্থাৎ পরিবার “আবেদন করেছি” বললেও প্রশাসনের একটি অংশ বলছে “আবেদন পাইনি”—এই দ্বন্দ্বই ঘটনাটির প্রশাসনিক দিক নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
কারা কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা: “অনুমতি না থাকলেও মানবিক বিবেচনায় দেখা করানো”
যশোর কারা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বন্দিকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার এখতিয়ার জেলা প্রশাসকের। অনুমতি না থাকায় প্যারোল দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে মৃতদেহ কারাফটকে আনার পর মানবিক বিবেচনায় সাদ্দামকে দেখার সুযোগ দেওয়া হয়। পরিবার ও কারা কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, দুই মরদেহের সঙ্গে স্বজনরা গেইটে পৌঁছালে পাঁচ মিনিট সময় দিয়ে সাদ্দামকে সেখানে আনা হয়।
যশোর জেলা প্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি
সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ার পর যশোর জেলা প্রশাসন সংবাদমাধ্যমে একটি বিবৃতি পাঠায়। সেখানে বলা হয়—সাদ্দামের স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুতে পরিবার পক্ষ থেকে যশোর জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ বরাবর প্যারোলে মুক্তির কোনো আবেদন করা হয়নি। বরং পরিবারের মৌখিক আবেদনের প্রেক্ষিতে কারা কর্তৃপক্ষ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে মানবিক বিবেচনায় কারাফটকে লাশ দেখানোর ব্যবস্থা করে।
পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতেও একই ধরনের বক্তব্য উঠে আসে—প্যারোলের বিষয়ে কোনো আবেদন করা হয়নি, পরিবারের মৌখিক অভিপ্রায় অনুযায়ী জেলগেটে দেখা করার সিদ্ধান্ত হয় এবং জেলা প্রশাসন ও কারাগার “সর্বোচ্চ সহযোগিতা” করেছে।
তবে স্বজনদের দাবি, তারা আবেদন করতে গিয়েছিলেন এবং সেটি আমলে নেওয়া হয়নি—এ কথাতেই এখন প্রশ্ন উঠেছে, আবেদন প্রক্রিয়াটি কোথায় আটকাল, আর কার সিদ্ধান্তে “দাফনের আগে শেষ দেখা”কে গেইটে সীমাবদ্ধ করা হলো।
রাজনীতি, মামলা ও বন্দিত্বের প্রেক্ষাপট
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে সাদ্দাম আত্মগোপনে ছিলেন। পরে গত বছরের এপ্রিলের শুরুতে গোপালগঞ্জ থেকে তাকে আটক করে পুলিশ। এরপর থেকে কয়েকটি মামলায় তিনি কারাবন্দি। পরিবারের সদস্যরা বলেছেন, সাদ্দাম আটক হওয়ার সময় তার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা ছিলেন এবং পরে সন্তান জন্মের পরও একাধিকবার শিশুকে নিয়ে কারাগারের গেইটে গিয়েছেন; কিন্তু প্রত্যাশিতভাবে বাবার কোলে শিশু উঠতে পারেনি।
দেশজুড়ে প্রতিক্রিয়া: “মৃত শিশু দেখা করতে গেছে…”
কারাফটকে সাদ্দামের সাক্ষাতের ছবি ও বিবরণ ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ-আবেগের ঢেউ ওঠে। কবি ইমতিয়াজ মাহমুদের “মৃত শিশু দেখা করতে গেছে, তার জীবিত পিতার সাথে”—এই বাক্য ভাইরাল হয়ে বিভিন্ন পোস্টার ও ফটোকার্ডে ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই ঘটনাটিকে অমানবিক ও নিষ্ঠুর বলছেন। আবার কেউ কেউ সামাজিক মাধ্যমে লিখছেন, অতীতেও এমন বা আরও কঠোর ঘটনা ঘটেছে—তবে সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলছেন, আগে ঘটেছে বলেই কি এখনো ঘটতে থাকবে?
মানবাধিকারকর্মীদের একাংশ বলছেন, আবেদন প্রক্রিয়ার নামে সময়ক্ষেপণ করে শেষ পর্যন্ত লাশ গেইটে এনে “দেখা” করানোর পরামর্শ দেওয়া এক ধরনের নির্মমতা; প্রশাসন একটু মানবিক হলেই একজন বন্দি শেষ বিদায় জানাতে পারতেন।
কারাফটকে পাঁচ মিনিট—আর তীব্র প্রশ্ন
এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে একটি দৃশ্য—একজন বাবা জীবিত সন্তানকে কখনো কোলে নিতে পারেননি; আর মৃত্যু এসে গেলে, সেই বাবাই শিশুটিকে কোলে তোলেননি, শুধু মাথায় হাত বুলিয়ে ক্ষমা চেয়েছেন। রাষ্ট্র বলছে—এটাই ছিল “মানবিক বিবেচনায়” সর্বোচ্চ সহযোগিতা। স্বজনেরা বলছেন—এটা ছিল বাধ্য হয়ে মেনে নেওয়া একটি নির্মম বাস্তবতা।
কারাফটকের লোহার গেইট তাই এখন একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছে—যেখানে শোকেরও সময় বেঁধে দেওয়া হয়, বিদায়েরও অনুমতি লাগে, আর একটি পরিবারের ইতিহাস দাঁড়িয়ে থাকে রাজনীতি ও প্রশাসনের কঠিন কাগজপত্রের মুখোমুখি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬