
এম.আর.জে শান্ত
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনে দীর্ঘকাল ধরে চলা ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সরশিপ আইন, ১৯৬৩’ বাতিল করে ২০২৩ সালে প্রণয়ন করা হয়েছে ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন আইন, ২০২৩’। একই সঙ্গে ঐতিহাসিক ‘সেন্সর বোর্ড’-এর বদলে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ড’। বহু বছর ধরে নির্মাতা ও প্রযোজকদের কাছে সেন্সর বোর্ড মানেই ছিল ছবির কঠিন পরীক্ষা, আপত্তিকর দৃশ্য বা সংলাপে আপত্তি, কাটছাঁট এবং নানা বাধা পেরিয়ে ছাড়পত্র পাওয়ার জটিল প্রক্রিয়া। ২০২৩ সালের ১৩ নভেম্বর নতুন আইন প্রকাশের মাধ্যমে কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন হয়নি, বরং চলচ্চিত্র মূল্যায়নে একটি আধুনিক দর্শনের সূচনা ঘটার কথা সামনে এসেছে।

ভাষাগত ও ধারণাগত দিক থেকে ‘সেন্সর’ এবং ‘সার্টিফিকেশন’-এর মধ্যে মৌলিক ফারাক রয়েছে। যেখানে সেন্সরশিপের মূল লক্ষ্য ছিল নিয়ন্ত্রণ ও কনটেন্ট বাদ দেওয়া, সেখানে সার্টিফিকেশনের উদ্দেশ্য হলো একটি সিনেমা পরীক্ষা করে তা বয়সভিত্তিক কোন শ্রেণির দর্শকের জন্য কতটুকু উপযোগী তা নির্ধারণ করা। নতুন আইনে কেবল প্রদর্শনের অনুমতি আটকানো বা ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং দেশীয় চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশ, সামাজিক মূল্যবোধ ও শৈল্পিক গুণাবলি বৃদ্ধির বিষয়গুলোও যুক্ত করা হয়েছে। এমনকি চলচ্চিত্র প্রদর্শনের উপযোগী না হলেও নির্দিষ্ট পেশা বা গোষ্ঠীভিত্তিক সীমিত প্রদর্শনের জন্য অনুমোদন দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
তবে নাম বদলালেই কি কাটছাঁটের পুরোনো সংস্কৃতি বিলুপ্ত হয়েছে? আইনি বাস্তবতা বলছে, নতুন কাঠামোর মধ্যেও বোর্ডের হাতে দৃশ্য বা সংলাপ কর্তন এবং পরিবর্তনের ক্ষমতা রেখে দেওয়া হয়েছে। এমনকি মূল চলচ্চিত্রের পাশাপাশি সিনেমা বা ওটিটি কনটেন্টের পোস্টার, টিজার, ট্রেলার, গান ও প্রচারসামগ্রীও আগাম অনুমোদনের আওতায় আনা হয়েছে। একই সঙ্গে গল্প ও নির্মাণের দুর্বলতা কিংবা কারিগরি ত্রুটির অজুহাতে সার্টিফিকেশন প্রত্যাখ্যান করার বিধান থাকায়, বাস্তবে বোর্ডের নিয়ন্ত্রণমূলক ক্ষমতা কতটা শিথিল হলো তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। তবে ইতিবাচক দিক হচ্ছে, বোর্ডের যেকোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্মাতাদের পুনর্বিবেচনা আবেদন ও আইনি আপিলের কার্যকর সুযোগ রাখা হয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে সিনেমাহলের পাশাপাশি ওটিটি ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আধিপত্য বাড়ছে। এই সময়ে দাঁড়িয়ে সিনেমা আটকে রাখার চেয়ে সঠিক শ্রেণিবিন্যাসের মাধ্যমে দর্শককে স্পষ্ট তথ্য জানানো অনেক বেশি জরুরি। ‘সেন্সর’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘সার্টিফিকেশন’ নাম গ্রহণ করা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বার্তা। তবে কাগজ-কলমের এই রূপান্তর বাস্তবে কতটা মুক্তচিন্তা ও সৃজনশীলতার পথ সুগম করবে, তা নির্ভর করছে বোর্ড তাদের অর্পিত ক্ষমতা কতটুকু স্বচ্ছতা ও পেশাদারত্বের সাথে প্রয়োগ করছে তার ওপর।





