কালি দিয়ে রবীন্দ্রনাথ মোছা যায় না

Date:

spot_img

আলী কদর পলাশ

দেয়ালে একটি মুখ আঁকা ছিল। হাতে কালি নিয়ে কেউ সেই মুখ মুছে দিতে গেল। পুলিশ বাধা দিল। চারজন আটক হলেন। পরে মামলা হলো। ঘটনাটি এতটুকু হলে হয়তো একটি সাধারণ আইনশৃঙ্খলার সংবাদ হিসেবেই শেষ হয়ে যেতে পারত। কিন্তু যে মুখটির ওপর কালি পড়েছে, তাঁর নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ফলে ঘটনাটি আর একটি দেয়াল, কয়েকটি তুলি কিংবা কয়েকজন তরুণের প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকল না। এসে দাঁড়াল আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, সহিষ্ণুতা এবং আত্মপরিচয়ের সামনে।

ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আঁকা হয়েছিল শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সত্যজিৎ রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, কাজী নজরুল ইসলামসহ শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির কয়েকজন বিশিষ্ট মানুষের প্রতিকৃতি। সেই তালিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। কাকে রাখা হলো, কাকে রাখা হলো না, আরও কার ছবি থাকা উচিত ছিল, একজন বিদেশি বা অন্য ভূখণ্ডের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের ছবি কেন থাকবে, এসব প্রশ্ন তোলার অধিকার অবশ্যই নাগরিকের আছে। একটি উন্মুক্ত সমাজে প্রশ্নকে ভয় পাওয়া যায় না।

কিন্তু প্রশ্ন করা আর মুছে দেওয়া এক জিনিস নয়।

বিতর্ক আর ধ্বংসও এক নয়।

কোনো কবিকে অপছন্দ করা যায়। তাঁর দর্শন প্রত্যাখ্যান করা যায়। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে তীব্র সমালোচনা করা যায়। তাঁর সাহিত্যকেও নতুন সময়ের চোখে পুনর্বিচার করা যায়। সভ্য সমাজে এ সবই সম্ভব। কিন্তু কারও মুখে কালি ঢেলে তাঁকে ইতিহাস থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা অন্য মানসিকতার পরিচয় দেয়। সেখানে যুক্তির জায়গা দখল করে প্রতীকী প্রতিশোধ, আর আলোচনার জায়গা দখল করে অসহিষ্ণুতা।

ঘটনাস্থলে অংশগ্রহণকারীদের একজন বলেছেন, তাঁরা ‘ভারতীয় আগ্রাসনের প্রতিবাদ’ জানাতে এসেছেন। এখানেই ঘটনাটির গভীরতম অসংগতি।

ভারতের কোনো রাষ্ট্রনীতি, সীমান্তনীতি, কূটনৈতিক আচরণ কিংবা বাংলাদেশের প্রতি কোনো রাজনৈতিক ভূমিকার প্রতিবাদ করা সম্পূর্ণ বৈধ রাজনৈতিক অধিকার। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। তার সার্বভৌমত্ব, স্বার্থ ও মর্যাদার প্রশ্নে প্রতিবাদ থাকবে, বিতর্ক থাকবে, প্রয়োজনে কঠোর ভাষাও থাকবে। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের বর্তমান রাজনীতি আর শতবর্ষের সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে এক পাল্লায় মাপা যায় না।

রবীন্দ্রনাথ কোনো সরকারের মুখপাত্র নন। তিনি কোনো বর্তমান রাষ্ট্রনীতির প্রতিনিধি নন। তাঁকে আজকের দিল্লি, কলকাতা কিংবা ঢাকার রাজনৈতিক সম্পর্ক দিয়ে বিচার করার চেষ্টা ইতিহাসকে বর্তমানের সংকীর্ণ ঘরে বন্দী করা।

রাষ্ট্রের সীমানা কাঁটাতারে আঁকা যায়। সংস্কৃতির সীমানা তত সহজে আঁকা যায় না।

রবীন্দ্রনাথ জন্মেছিলেন এমন এক সময়ে, যখন আজকের বাংলাদেশ ও ভারত বর্তমান রাষ্ট্রসীমায় বিভক্ত ছিল না। তাঁর জীবন ও সৃষ্টির সঙ্গে পূর্ববঙ্গের সম্পর্কও কোনো দূরের সম্পর্ক নয়। শিলাইদহ, শাহজাদপুর, পতিসর তাঁর জীবন, সাহিত্য ও ভাবনার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। বাংলার নদী, মাটি, কৃষক, বর্ষা, প্রকৃতি তাঁর লেখায় যে ভাবে এসেছে, তার একটি বড় অংশ এই ভূখণ্ডের অভিজ্ঞতা থেকে নির্মিত। তাই তাঁকে কেবল আরেক দেশের নাগরিক পরিচয়ে সংকুচিত করা ইতিহাসের প্রতিও অবিচার।

সবচেয়ে বড় কথা, স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

আমাদের পতাকা যখন উড়ে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মর্যাদার মুহূর্তে যখন জাতীয় সংগীত বাজে, আমরা তাঁরই লেখা গান গাই। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপরিচয়ের সবচেয়ে আবেগময় প্রতীকগুলোর একটির সঙ্গে তাঁর নাম অবিচ্ছেদ্য। ফলে তাঁর প্রতিকৃতিকে ‘বিদেশি আগ্রাসনের প্রতীক’ বানাতে গেলে প্রশ্ন জাগে, আমরা তবে নিজেদের ইতিহাসকেই কোথায় রাখব?

রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসতেই হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। নজরুলকে ভালোবাসতেই হবে, তাও নয়। লালনকে, জীবনানন্দকে, বিদ্যাসাগরকে, সত্যজিৎ রায়কে কিংবা পৃথিবীর আর কোনো কবি, শিল্পী বা চিন্তাবিদকে শ্রদ্ধা করতেই হবে এমন কোনো আইন থাকতে পারে না। সংস্কৃতির মূল্যই হলো ব্যক্তির স্বাধীন পছন্দ।

কিন্তু অপছন্দের অধিকার আর ধ্বংসের অধিকার এক নয়।

একটি সমাজ কতটা সভ্য, তার একটি পরীক্ষা হলো সে তার অপ্রিয় কণ্ঠকেও কতটা সহ্য করতে পারে। আমরা যার সঙ্গে একমত নই, তাকেও কথা বলার সুযোগ দেওয়া, আমরা যাকে পছন্দ করি না, তার স্মৃতিচিহ্নও আইনসঙ্গতভাবে থাকার অধিকার স্বীকার করা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিরই অংশ।

আজ রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি পড়ল। কাল যদি অন্য কোনো মতের মানুষ নজরুলের প্রতিকৃতি মুছতে চায়? পরশু যদি কেউ জয়নুলকে অপছন্দ করে? তারপর যদি আরেক দল বলে, তাদের পছন্দের তালিকার বাইরে কোনো লেখক বা শিল্পীর ছবি জনপরিসরে রাখা যাবে না?

এই রাস্তার শেষ কোথায়?

ইতিহাসকে যদি দল, মত, ধর্ম, রাষ্ট্র কিংবা বর্তমান রাজনীতির সুবিধামতো কাটাছেঁড়া শুরু করা হয়, তবে কোনো ইতিহাসই নিরাপদ থাকে না। যে জাতি আজ একটি মুখ মুছতে আনন্দ পায়, কাল সে নিজেরই আরেকটি মুখ মুছতে বাধ্য হয়। সংস্কৃতি তখন মিলনের জায়গা না হয়ে প্রতিশোধের ময়দানে পরিণত হয়।

বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসই বহুত্বের ইতিহাস। এই ভূখণ্ডে বাউলের গান আছে, রবীন্দ্রসংগীত আছে, নজরুলের বিদ্রোহ আছে, জসীমউদ্দীনের পল্লি আছে, লালনের প্রশ্ন আছে, জয়নুলের দুর্ভিক্ষের রেখা আছে। আছে মসজিদের আজান, মন্দিরের ঘণ্টা, পাহাড়ের নিজস্ব সুর, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষা ও উৎসব। এগুলোর কোনো একটিকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশকে সম্পূর্ণ করা যায় না।

বাংলাদেশের শক্তি এখানেই যে তার আত্মপরিচয় কোনো এক রঙের নয়।

ফলে ধর্মীয় সম্প্রীতি, সাংস্কৃতিক সহাবস্থান কিংবা জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে আমাদের আরও সতর্ক হওয়া দরকার। ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক হোক, গবেষণা হোক, তর্ক হোক। কিন্তু কোনো সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতিকে আক্রমণ করে, বই পুড়িয়ে, ছবি মুছে কিংবা শিল্পকর্ম ভেঙে কোনো মতবাদ শক্তিশালী হয় না। বরং তার নিজের যুক্তির দুর্বলতাই প্রকাশ পায়।

ঘটনাটিকে আবার শুধু সংস্কৃতির প্রশ্নে দেখলেও চলবে না। এখানে আইনের প্রশ্নও আছে।

পুলিশ মামলা করেছে। অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, গোষ্ঠীগত শত্রুতা সৃষ্টি এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অভিযোগ কতটা প্রমাণিত হবে, সেটি আদালতের বিষয়। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকার অবশ্যই আছে। কোনো অভিযোগ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা ন্যায়বিচারের নীতি নয়। রাষ্ট্রেরও উচিত আইনের ধারাগুলো সতর্কতার সঙ্গে প্রয়োগ করা, যাতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং প্রকৃত অপরাধের মধ্যে সীমারেখা অস্পষ্ট না হয়।

কারণ অসহিষ্ণুতার জবাব আরেক ধরনের অসহিষ্ণুতা হতে পারে না।

একটি প্রতিকৃতি মুছতে যাওয়া যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এমন পরিবেশও তৈরি করা যাবে না যেখানে ভিন্নমত প্রকাশ করাই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রতিকৃতিকে রক্ষা করবে, একই সঙ্গে মতপ্রকাশের অধিকারও রক্ষা করবে। আইনের মর্যাদা এখানেই।

তবে আদালতের বাইরেও একটি সামাজিক আদালত আছে। সেখানে আমাদের নিজেদেরই নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে।

আমরা কেমন বাংলাদেশ চাই?

এমন বাংলাদেশ, যেখানে একটি কবির জন্মস্থান দেখে তাঁর কবিতার নাগরিকত্ব নির্ধারণ করা হবে? যেখানে একজন শিল্পীর পরিচয় তার সৃষ্টির বদলে বর্তমান ভূরাজনীতি দিয়ে বিচার করা হবে? যেখানে আমাদের অপছন্দের ইতিহাস কালির বালতি দিয়ে মুছে ফেলা যাবে?

নাকি এমন বাংলাদেশ, যেখানে একজন মানুষ বলতে পারবেন, ‘আমি রবীন্দ্রনাথকে পছন্দ করি না’, আর পাশের মানুষটি নির্ভয়ে বলতে পারবেন, ‘আমি তাঁকে ভালোবাসি’ এবং দুজনেই একই দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের মত প্রকাশ করতে পারবেন?

দ্বিতীয় বাংলাদেশটিই আমাদের প্রয়োজন।

কারণ সংস্কৃতির উত্তর সংস্কৃতি। বইয়ের উত্তর বই। কবিতার উত্তর কবিতা। যুক্তির উত্তর যুক্তি। কোনো কবির বিরুদ্ধে আপত্তি থাকলে লিখুন। তাঁর চিন্তার বিরুদ্ধে বই লিখুন। সভা করুন। প্রবন্ধ লিখুন। বিতর্ক করুন। নতুন শিল্প সৃষ্টি করুন। কিন্তু কালি দিয়ে মুখ মুছে দেওয়া কোনো যুক্তির বিজয় নয়।

বরং এতে একটি বিপজ্জনক বার্তা ছড়ায় যে অপছন্দ হলেই মুছে দিতে হবে।

এই মানসিকতাই প্রতিরোধ করা দরকার।

রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি পড়তে পারে। দেয়ালের ছবি মুছে যেতে পারে। নতুন রঙে পুরোনো মুখ ঢেকেও ফেলা যায়। কিন্তু একটি ভাষা, একটি জাতির সংগীত, সাহিত্য, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার মধ্যে যিনি শত বছরের বেশি সময় ধরে বাস করছেন, তাঁকে দেয়াল থেকে মুছে ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়া যায় না।

কবি দেয়ালে থাকেন না।

তিনি থাকেন মানুষের স্মৃতিতে, গানে, ভাষায়, পাঠে, আবেগে।

কালি দিয়ে একটি ছবি ঢাকা যায়।

রবীন্দ্রনাথকে নয়।

লেখক: প্রধান সম্পাদক

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

কমিশনার মামুনের পিতার মৃত্যুতে দোয়া মাহফিল

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর ও বংশাল থানা...

আগামী তিন বছরে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে: ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার

বাগেরহাট প্রতিনিধি আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশে এক লাখ নতুন...

খুলনায় ফুটপাত দখলমুক্ত করতে কেসিসির অভিযান, ভাঙা হলো অবৈধ দোকানপাট

খুলনা প্রতিনিধি খুলনা নগরীর ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ...

হোমনায় কৃষিজমি থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন, দুই ড্রেজার মালিককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা!

বিশেষ প্রতিনিধি কুমিল্লার হোমনা উপজেলার মাথাভাঙ্গা ইউনিয়নের ছয়ফুল্লাকান্দি এলাকায়...