নিজস্ব প্রতিবেদক
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হতেই রাজনৈতিক মাঠে দোষারোপ না করার বার্তা উচ্চারণ করেও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরগুলো পরোক্ষ অভিযোগ-ইঙ্গিতে একে অন্যকে কাঠগড়ায় তুলতে শুরু করেছে। এপির খবরে বলা হয়েছে প্রচারণার প্রথম দিনেই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে ভোট, ধর্মীয় আবেগ, নিরাপত্তা ও ফ্যাসিবাদ—এসব ইস্যু সামনে এনে পাল্টাপাল্টি বার্তা ছোড়া হয়। ফলে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরুতেই পারস্পরিক অনস্থার দিকে মোড় নিচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
বিএনপির প্রধান প্রচার সমাবেশে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান মধ্যপ্রাচ্যসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নারীদের এনআইডি কার্ড ও মোবাইল নম্বর নিয়ে “একটি দল” বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। তিনি কারও নাম না নিলেও ‘ভোট ডাকাতি’ ও নতুন ষড়যন্ত্রের প্রসঙ্গ তুলে ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য দেন—গত ১৫–১৬ বছর ভোটাধিকার হরণ হয়েছে, এখন “আরেকটি রাজনৈতিক দল” একই পথে আছে—এমন ভাষ্যও দেন। একই সঙ্গে তিনি নির্বাচনের আগেই “এই দেব, ওই দেব… টিকিট দেব”—ধরনের বক্তব্যকে ধর্মীয় আবেগের অপব্যবহার হিসেবে উল্লেখ করে সতর্ক করেন।
এই অবস্থান তারেক রহমানের সাম্প্রতি এক বক্তব্যের সঙ্গেও এক ধরনের বৈপরীত্য তৈরি করেছে। তিন দিন আগে এক অনুষ্ঠানে তিনি “দোষারোপের রাজনীতি নয়”—মানুষকে ভালো রাখার রাজনীতির কথা বলেছিলেন—এমন প্রসঙ্গও উঠে আসছে আলোচনা-সমালোচনায়। নির্বাচনকে সামনে রেখে তারেক রহমানের দেশে ফেরা, মাঠে সক্রিয় প্রচারে নামা—সব মিলিয়ে বিএনপির ভেতরে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে বলেও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান ঢাকার জনসভায় “আমি কারো সমালোচনা করতে চাই না” বললেও বক্তব্যে ‘নতুন জামা’ পরা ফ্যাসিবাদ, ‘নতুন ভোট ডাকাত’—এ ধরনের শব্দচয়নে প্রচ্ছন্ন বার্তা দেন। তিনি বলেন, অতীতে যেভাবে পরিণতি হয়েছিল, “নতুন জামা পরা ফ্যাসিবাদ” সামনে এলে একই পরিণতি হবে—এমন হুঁশিয়ারিও দেন। পাশাপাশি চাঁদাবাজি, দখলবাণিজ্য, মামলাবাজি, দুর্নীতি, সন্ত্রাস—এসব বন্ধ করতে পারাই ‘আগামীর বাংলাদেশ’ উপহার দেওয়ার শর্ত—এমন বক্তব্যে তিনি ‘শৃঙ্খলা’ ও ‘সুশাসন’ ইস্যুকে সামনে আনেন। শফিকুর রহমানের ‘ফ্যাসিবাদ’ ও সহিংসতা-সন্ত্রাস প্রতিরোধের বক্তব্য আগেও বিভিন্ন ঘটনায় উঠে এসেছে।
প্রচারণার প্রথম দিনের উত্তাপ কেবল দুই দলেই সীমিত নয়। দেশজুড়ে বড় দলগুলোর সমাবেশের পাশাপাশি নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোরও মাঠে নামার ছবি দেখা যাচ্ছে। নির্বাচনের পটভূমিটিও ব্যতিক্রমী—২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা; একই সঙ্গে রাজনৈতিক সংস্কারের একটি জাতীয় সনদের ওপর গণভোট আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না—এ বাস্তবতায় রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ভারসাম্য বদলে গেছে, আর শূন্যতা পূরণে বিভিন্ন জোট ও নতুন দলগুলো নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে মরিয়া। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন একটি জোট এবং ছাত্র আন্দোলন-উদ্ভূত নতুন দলসহ একাধিক শক্তি নিজেদের প্রভাব বাড়াতে প্রচার জোরদার করছে।
প্রচারণার প্রথম দিনের এবং দ্বিতীয় দিনের ভাষা-ভঙ্গিমা দেখে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন—এবারের নির্বাচন শুধু উন্নয়ন বা অর্থনীতির প্রতিশ্রুতির প্রতিযোগিতা নয় বরং ভোটাধিকার, ধর্মীয় আবেগের ব্যবহার, ফ্যাসিবাদ বনাম গণতন্ত্র—এ ধরনের পরিচয়-রাজনীতির ফ্রেমে লড়াই দ্রুত ঘনীভূত হতে পারে। সেই সঙ্গে ডিজিটাল তথ্য, এনআইডি, মোবাইল নম্বর—এসব নিয়ে বিভ্রান্তির অভিযোগ সামনে আসায় প্রচারণা জুড়ে তথ্য-সুরক্ষা ও গুজব মোকাবিলাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
এখন দেখার বিষয়—সমালোচনা না করার ঘোষণার পরও ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্যের এই ধারা আগামী দিনগুলোতে আরও ধারালো হয় কি না, নাকি দলগুলো কর্মসূচি-প্রতিশ্রুতি ও নীতিনির্ধারণী আলোচনায় ফিরে আসে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, ততই জনসভা-সমাবেশে শব্দচয়ন, ধর্ম-রাষ্ট্র বিতর্ক, এবং ভোটের নিরাপত্তা প্রশ্ন—সবকিছুই নির্ধারণ করবে মাঠের উত্তাপ ও ভোটারদের মনোভাব।
উল্লেখ্য, ২২ জানুয়ারি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্বাচনী প্রচারণা সিলেট থেকে শুরু হয়েছে।
সকালেই তিনি সিলেট শহরের হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহ পরাণ (রহ.)–এর মাজার জিয়ারত করেন, পরে সিলেটের আলিয়া মাদরাসা মাঠে জনসভায় বক্তব্য রাখেন।
এটি বিএনপির নির্বাচনী প্রচারের প্রথম বড় জনসভা হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সেখানে দলের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিতে শুরু হয়েছে প্রচারণা। এই জনসভাযতেও বক্তৃতার অন্যতম অংশ ছিল দোষারোপ।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান একই দিনে ঢাকায় গণসংযোগ ও জনসভা শুরু করেন, যেখানে তিনি নির্বাচনী সফর ঘোষণা করেন।
তিনি মূল নির্বাচনী এলাকা হিসেবে ঢাকা-১৫ থেকে গণসংযোগ ও জনসভা শুরু করেন এবং ২৩, ২৪ জানুয়ারির জন্য উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় জনসভা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। জামাতেরই জনসভাতেও আমির ক্রমাগত দোষারোপ করেছেন। তবে সবই আকার ইঙ্গিতে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬