
আলী কদর পলাশ
বাংলাদেশে শীত আসে কুয়াশা নিয়ে, আর নির্বাচন আসে কৌতুক নিয়ে—এ কথা আজকাল প্রকৃতির নিয়মের মতোই স্থির। কুয়াশায় যেমন দূরের বস্তু কাছে মনে হয়, তেমনি নির্বাচনে দূরদেশের মিত্রও হঠাৎ আত্মীয় হয়ে ওঠে।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের দীর্ঘ প্রতিবেদন পড়িয়া জনতার মনে চাঞ্চল্য জাগিল। বলা হইল, জামায়াত নাকি এবার ইতিহাসের সেরা ফল করিবে; আর ওয়াশিংটনের কূটনীতিকগণ তাহাদের বন্ধু করিতে চান। “বন্ধু” শব্দটি শুনিয়া আমাদের গ্রামের সহজ মানুষের চোখ ভিজিবার কথা; কিন্তু আধুনিক কূটনীতিতে বন্ধু মানে পাশে দাঁড়ানো নহে—পাশে দাঁড় করাইয়া রাখা। যেন প্রয়োজন হইলে কাঁধে হাত রাখিয়া বলা যায়, “তুমি যা বলিলে, তাহার ফল কিন্তু এইরূপ হইতে পারে।”
ঘটনার চাবিকাঠি হইল এক অডিও রেকর্ড। আমাদের যুগে সত্যকে আর শপথের গামছা পরানো লাগে না; মোবাইলই যথেষ্ট—আদালত, সংবাদদাতা, ইতিহাস, সবই ইহার ভিতর বসবাস করে। রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এক ভদ্রলোক বলেন, দেশে ইসলামি ভাবধারা বাড়িয়াছে; জামায়াত ভালো করিবে; আমরা তাহাদের বন্ধু হইতে চাই। অতঃপর তিনি প্রশ্ন করেন, সাংবাদিকেরা কি টকশোতে তাহাদের ছাত্রসংগঠনের লোক ডাকিবেন? বুঝিলাম, টকশো এখন আমাদের রাজসভা। রাজদরবারে এক সময় মশাল জ্বলিত; এখন রিং লাইট জ্বলে। আগে দরবারে দরবারি কবি থাকিত; এখন প্যানেলিস্ট থাকে। আগে রাজা প্রশ্ন করিত; এখন অ্যাঙ্কর করেন। প্রজারা দুই মিনিটের মধ্যে দেশ উদ্ধার করিতে বাধ্য থাকে—ইহাই নতুন শাসনতন্ত্র।
তারপর আসিল আসল মশলা। শরিয়া আইন চাপাইবে কি না—ইহাতে কূটনীতিক ভদ্রলোক বিশেষ ভ্রুক্ষেপ করিলেন না। তিনি বলিলেন, জামায়াত উদ্বেগজনক কিছু করিলে পরদিনই শতভাগ ট্যারিফ বসাইয়া দেওয়া হইবে। ইহা শুনিয়া আমার মনে হইল, ধর্মনীতির উপর যুক্তি কম কাজ করে; বাণিজ্যনীতির উপর যুক্তি বেশি কাজ করে। আমাদের অর্থনীতির রক্ত চলাচল যে ক্রয়াদেশে বাঁধা, সেখানে ট্যারিফ মানে হঠাৎ শিরা চেপে ধরা। তখন আদর্শ কাশিতে কাশিতে সরে দাঁড়ায়, আর পকেটের অঙ্ক কণ্ঠ পরিষ্কার করিয়া কথা বলে।
দলটির “ভাবমূর্তি নরম” করার কথাও বলা হইল, এবং “দুর্নীতি নির্মূল” মুখ্য লক্ষ্য ঘোষিত হইল। আমাদের দেশে দুর্নীতি নির্মূল এমন এক মহাকাব্য, যাহা প্রত্যেক নতুন রাজনৈতিক চরিত্র মঞ্চে উঠিয়াই আবৃত্তি করে; দর্শক হাততালি দেয়, তারপর বিরতিতে বিজ্ঞাপন চলে—কাব্য শেষ হয় না, কেবল স্পন্সর বদলায়।
অন্তর্বর্তী সরকারও ঘোষণা করিল—নির্বাচন নির্দিষ্ট দিনে; একদিন আগেও নয়, একদিন পরেও নয়। ইহা শুনিয়া মনে হইল, ক্যালেন্ডার যেন শাসনমান্য হইল। সময় আমাদের দেশে ঘড়ি মানে না; বিবৃতি মানে। তবে বিবৃতির ভিতরও সময় মাঝে মাঝে ছুটির ছলে পালাইয়া যায়—ইহা পুরাতন অভ্যাস।
আর পটভূমিতে রহিয়াছে দিল্লি ও ওয়াশিংটনের মনোমালিন্য। দুই বড় পক্ষের সম্পর্ক যখন তলানিতে যায়, মাঝখানের দেশ হঠাৎ করিয়া “অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ” হইয়া ওঠে। তখন আমরা সেতু হইয়া যাই। সেতুর কাজ লোক পার করা; কিন্তু টোল কেহ দেয় না—চাপ সেতুই সহ্য করে। কাজেই মিত্রতা এখানে ফুলের মালা নহে; ইহা ভারসাম্যের বস্তা, কাঁধ বদলাইয়া বহন করিতে হয়।
শেষে প্রশ্ন থাকে, গণতন্ত্র কোথায় দাঁড়াইয়া আছে? ব্যালট বাক্সে, না টকশোর টেবিলে, না শুল্কের খাতায়? আমার ধারণা, গণতন্ত্র আমাদের দেশে এক প্রকার অতিথি—আসিবার কথা বলে, আসে না; কিন্তু তাহার নামে প্রতিদিন ভোজ বসে। আর বিদেশি বন্ধুগণ দরজায় দাঁড়াইয়া হাসিতে হাসিতে বলেন, “আমরা বন্ধু হইতে চাই”—তারপর প্রয়োজনমতো হাতের ভিতর লুকানো ট্যারিফের আঙুলটিও, ভদ্রতার সহিত, দেখাইয়া দেন।
এই হইল আমাদের নির্বাচন। কুয়াশার ভিতর দিয়া পথ চলা—সামনে কী আছে দেখা যায় না; কিন্তু পিছনে যে শব্দ হয়, তাহা বেশ স্পষ্ট। আর আজকাল শব্দ ধরার জন্য ইতিহাসকে আর কষ্ট করিতে হয় না—একখানি অডিও রেকর্ডই যথেষ্ট।
২৪ জানুয়ারি, ২০২৬
ধানমন্ডি, ঢাকা
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬