
আলী কদর পলাশ
এক থানায় এক দারোগা ছিলেন।
তিনি চোর ধরতেন কি না জানা নেই। ডাকাত ধরতেন কি না তাও জানা নেই। তবে তিনি অন্তত একটি বিষয়ে খুব সৎ ছিলেন।
ঘুষ নিয়ে তার কোনো ভান ছিল না।
ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা গেল, তিনি নাকি পুলিশের পোশাক লাগিয়েছেন ঘুষের টাকা দিয়ে, ঘুষ খাওয়ার জন্যই।
এত অকপট মানুষ আজকাল কোথায় পাওয়া যায়!

সাধারণত ঘুষখোর ঘুষ খায় গোপনে। দরজা একটু টেনে দেয়। টেবিলের নিচে হাত বাড়ায়। ফাইলের মধ্যে খাম ঢোকে। কেউ বলে, ‘চা খাওয়ার কিছু দিয়েন।’ কেউ বলে, ‘স্যারকে একটু ম্যানেজ করতে হবে।’ কেউ আবার সরাসরি কিছুই বলে না। শুধু ফাইলটি এমনভাবে ঘুম পাড়িয়ে রাখে যে টাকা না দিলে তার ঘুম ভাঙে না।
কিন্তু আমাদের এই দারোগা সেসব পুরোনো রীতি মানেননি।
তিনি যেন দুর্নীতির নতুন দর্শন ঘোষণা করেছেন।
ঘুষ খাব, তাই পুলিশ হয়েছি।
বাহ!
এ যেন কোনো ডাক্তার বলছেন, রোগী মারার জন্য চিকিৎসক হয়েছি। কোনো শিক্ষক বলছেন, নকল শেখানোর জন্য শিক্ষক হয়েছি। কোনো বিচারক বলছেন, বিচার বিক্রি করতেই আদালতে বসেছি।
শুনলে হাসি পায়।
তারপরই ভয় লাগে।
কারণ কথাটি মজা হলেও যে সমাজে এই মজা করা যায়, সেই সমাজের অসুখ বেশ গভীর।
হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে একটি মামলার তদন্তে গিয়ে সহকারী উপপরিদর্শক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসাইন এমন বক্তব্য দিয়েছেন বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তার বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে আরও কিছু অভিযোগ উঠেছে। সেসব অভিযোগ অবশ্যই তদন্তসাপেক্ষ। অভিযোগ মানেই অপরাধ প্রমাণ নয়।
কিন্তু মুখের কথাটিরও তো একটি দায় আছে।
পুলিশের পোশাক পরে ঘুষকে নিয়ে এমন রসিকতা করা যায় কী করে?
একজন সাধারণ মানুষ থানায় যায় কেন?
বিকেলে চা খেতে?
দারোগার গল্প শুনতে?
না।
কেউ যায় তার মেয়েকে বাঁচাতে। কেউ যায় জমি দখলের বিচার চাইতে। কেউ যায় মার খেয়ে। কেউ যায় নিখোঁজ সন্তানের খোঁজে। কেউ যায় জীবনের শেষ আশাটুকু নিয়ে।
তার পকেটে টাকা নাও থাকতে পারে।
কিন্তু তার বিশ্বাস থাকে।
সেই বিশ্বাসের সামনে যদি একজন পুলিশ সদস্য দাঁড়িয়ে বলেন, ঘুষ খাওয়ার জন্যই পোশাক পরেছেন, তবে মানুষটি কী ভাববে?
ভাববে, তাহলে আগে টাকা গুনব, না অভিযোগ বলব?
আমাদের দেশে ঘুষেরও অদ্ভুত শিষ্টাচার আছে।
কেউ বলে না, ‘ঘুষ দিন।’
বলে, ‘খরচাপাতি আছে।’
কেউ বলে, ‘ছেলেপেলেদের চা খাওয়াবেন।’
কেউ বলে, ‘ফাইলটা একটু তাড়াতাড়ি করতে গেলে বুঝতেই তো পারছেন।’
এই ‘বুঝতেই তো পারছেন’ বাক্যটি সম্ভবত আমাদের দুর্নীতির জাতীয় অভিধানে আলাদা জায়গা পাওয়ার যোগ্য।
সবাই বুঝে।
কেউ বলে না।
চুনারুঘাটের ওই পুলিশ সদস্য সম্ভবত এই অলিখিত নিয়মটাই ভেঙে ফেলেছেন।
তিনি বলে ফেলেছেন।
তাই এত সমস্যা।
কিন্তু মজার আড়ালে একটা কঠিন সত্য আছে।
দুর্নীতি তখনই সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে, যখন মানুষ সেটিকে লজ্জার বিষয় মনে করা বন্ধ করে দেয়।
প্রথমে ঘুষ নেওয়া হয় লুকিয়ে।
তারপর নেওয়া হয় প্রকাশ্যে।
তারপর বলা হয়, সবাই নেয়।
শেষে হয়তো গর্ব করে বলা হয়, এজন্যই চাকরিতে এসেছি।
সেখানে পৌঁছে গেলে শুধু একজন ব্যক্তিকে শাস্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান হয় না।
তখন আয়নার সামনে পুরো ব্যবস্থাকেই দাঁড়াতে হয়।
বাংলাদেশ পুলিশের অসংখ্য সদস্য সৎভাবে কাজ করেন। রাত জাগেন। বিপদের মধ্যে যান। উৎসবের দিন রাস্তায় থাকেন। অপরাধীর গুলির সামনে দাঁড়ান।
তাদের জন্যই এই বক্তব্য আরও অপমানজনক।
কারণ একজন মানুষ যখন পুলিশের পোশাককে ঘুষের সঙ্গে মিলিয়ে দেন, তখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা সৎ পুলিশ সদস্যটির গায়েও সন্দেহের ধুলো লাগে।
সে অন্যায়।
সৎ পুলিশ সদস্যদের প্রতিও অন্যায়।
তাই এই ঘটনার তদন্ত কেবল একজন এএসআই কী বলেছেন, সেই প্রশ্নে আটকে থাকলে চলবে না।
দেখতে হবে অভিযোগগুলো সত্য কি না।
দেখতে হবে তদন্তের নামে কারও কাছে টাকা চাওয়া হয়েছে কি না।
দেখতে হবে প্রভাব খাটানোর অভিযোগের কোনো ভিত্তি আছে কি না।
আর সবচেয়ে জরুরি, পুলিশ বাহিনী নিজেই কী বার্তা দেয়।
ঘুষ নিয়ে ঠাট্টা করলে কি শুধু ‘প্রেক্ষাপট’ খোঁজা হবে, নাকি বলা হবে, এই পোশাকেরও একটা মর্যাদা আছে?
এক থানায় এক দারোগা ছিলেন।
গল্পটি এখানেই শেষ হতে পারত।
কিন্তু শেষ হচ্ছে না।
কারণ গল্পের আসল চরিত্র ওই দারোগা নন।
আসল চরিত্র আমরা।
আমরা যারা ঘুষ দিয়ে বলি, উপায় ছিল না।
ঘুষ নিয়ে বলি, সবাই নেয়।
দেখে চুপ থাকি।
শুনে হাসি।
তারপর একদিন অবাক হয়ে প্রশ্ন করি, দেশ থেকে দুর্নীতি যাচ্ছে না কেন।
যেদিন ঘুষের গল্প শুনে আমরা হাসব না, লজ্জা পাব, সেদিন হয়তো গল্পটা বদলাবে।
তখন কোনো দারোগা হয়তো বলবেন,
আমি পুলিশের পোশাক পরেছি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য।





