
নিজস্ব প্রতিবেদক
বিশ্বজুড়ে বিদেশি উন্নয়ন সহায়তা কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের ছোট ও মাঝারি এনজিওগুলো বড় ধরনের অর্থায়ন সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম নেই এবং বিদেশি অনুদানের ওপর প্রায় পুরোপুরি নির্ভরশীল প্রায় ২ হাজার ২০০টি এনজিও সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্থায়ন সংকট দীর্ঘ হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানি-স্যানিটেশন, জলবায়ু ও অন্যান্য সামাজিক সেবায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) আয়োজিত ‘বিদেশ-নির্ভরতা পেরিয়ে: বাংলাদেশে এনজিও অর্থায়নের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটি উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. কাজী ইকবাল।
গবেষণায় এনজিওবিষয়ক ব্যুরো ও ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের তথ্য বিশ্লেষণের পাশাপাশি ৪৬টি এনজিওর ওপর জরিপ, জাতীয় পরামর্শ সভা, উত্তরাঞ্চলের ছোট ও মাঝারি এনজিও নিয়ে দলীয় আলোচনা এবং বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ধনী দেশগুলোর উন্নয়ন সহায়তা প্রকৃত মূল্যে ২৩ শতাংশ কমেছে। এক বছরে সহায়তা কমার হিসাবে এটি সবচেয়ে বড় পতন। যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসএআইডি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্সের আগামী কয়েক বছরের সহায়তা বাজেট কমানোর কারণে বর্তমান পরিস্থিতিকে সাময়িক সংকট নয়, বরং কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন গবেষকরা।
বাংলাদেশে বিদেশি সহায়তা কমার পুরো প্রভাব এখনো দৃশ্যমান হয়নি। এর অন্যতম কারণ, আগে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর অর্থ এখনো ছাড় হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পুরোনো প্রকল্পগুলোতে ১০ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা ছাড় হয়েছে। তবে নতুন প্রকল্প অনুমোদনের সংখ্যা ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
২০২১-২২ অর্থবছরে এনজিও খাতে ২ হাজার ৬১টি প্রকল্প অনুমোদিত হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ১ হাজার ৬৫৪টিতে। ফলে পুরোনো প্রকল্পের অর্থ শেষ হওয়ার পর এনজিওগুলোর অর্থায়ন সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
৪৬টি এনজিওর ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, বিদেশি অনুদাননির্ভর সেবাধর্মী এনজিওগুলোর বাজেট গড়ে ৪০ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম থাকা এনজিওগুলোর বাজেট কমেছে প্রায় ১২ শতাংশ।
গবেষকদের মতে, নিজস্ব আয় বা ক্ষুদ্রঋণভিত্তিক অর্থের উৎস থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলকভাবে সংকট সামাল দিতে পারছে। কিন্তু অনুদাননির্ভর ছোট ও মাঝারি এনজিওগুলোর বিকল্প অর্থের উৎস অত্যন্ত সীমিত।
অর্থায়ন সংকট বাড়লে মাঠপর্যায়ে কর্মসূচি কমানো, কর্মী ছাঁটাই এবং সামাজিক সেবা সীমিত করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এমনকি টিকে থাকার জন্য কোনো কোনো এনজিও সামাজিক কার্যক্রম কমিয়ে ক্ষুদ্রঋণ বা আয়মূলক কর্মকাণ্ডে ঝুঁকতে পারে। এতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া এনজিওগুলোর সেবা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংকট মোকাবিলায় গবেষণায় চারটি বিকল্প অর্থায়নের পথের কথা বলা হয়েছে। এগুলো হলো—
১. সরকারি প্রকল্প ও ব্যয়ে এনজিওকে যুক্ত করা
২. করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) অর্থ ব্যবহার
৩. সামাজিক ব্যবসা সম্প্রসারণ
৪. নতুন ধরনের অর্থায়ন ব্যবস্থা চালু করা
গবেষকদের মতে, বড় পরিসরে অর্থ জোগানের সক্ষমতা মূলত সরকারেরই রয়েছে। বিদেশি অনুদানের পরিমাণ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির মাত্র ৩ দশমিক ৪ শতাংশের সমান। ২০২৫ সালের সরকারি ক্রয়বিধিতে সরকারি সেবা প্রদানে এনজিওকে যুক্ত করার সুযোগ থাকলেও বাস্তবে এর ব্যবহার খুবই সীমিত।
গবেষণায় সরকার ও এনজিওর যৌথভাবে সেবা দেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রত্যন্ত এলাকায় এনজিওগুলোর পৌঁছানোর সক্ষমতা, স্থানীয় জনগোষ্ঠী সম্পর্কে জ্ঞান এবং জনগণকে সেবা গ্রহণে সম্পৃক্ত করার অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো গেলে সরকারের ব্যয় কমার পাশাপাশি সেবার কার্যকারিতাও বাড়তে পারে।
বিদেশি অনুদানের বিকল্প হিসেবে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার অর্থকে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এখানেও সংকোচন দেখা দিয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয় ২০২৫ সালে ৩৪৫ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। ফলে বিদেশি অনুদানের বড় ঘাটতি এককভাবে সিএসআর অর্থ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।
সামাজিক ব্যবসা ও নতুন আর্থিক ব্যবস্থাও বিকল্প হতে পারে। তবে ছোট এনজিওগুলোর ক্ষেত্রে বন্ড বা ফলভিত্তিক অর্থায়নের মতো ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় জামানত, ঋণপোর্টফোলিও ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে।
সংকট মোকাবিলায় যোগ্য এনজিওগুলোর একটি উন্মুক্ত তালিকা তৈরির সুপারিশ করেছে বিআইডিএস। তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি ক্রয়, সিএসআরসহ বিভিন্ন তহবিল ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া সরকারি ক্রয়বিধিতে এনজিওকে সেবা প্রদানকারী হিসেবে যুক্ত করার বিধান কার্যকর করতে আলাদা নির্দেশিকা তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে। ছোট ও মাঝারি এনজিওর জন্য এনজিও ফাউন্ডেশন ও পিকেএসএফের মাধ্যমে তহবিল গঠন, সিএসআর নীতিতে যোগ্য বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও নির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ এবং সামাজিক ব্যবসার আইনি স্বীকৃতি ও কর সুবিধা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিদেশি অনুদানের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। দেশের প্রয়োজন ও সরকারের অগ্রাধিকার অনুযায়ী এনজিওগুলোর সক্ষমতাকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়ে একটি নীতিকাঠামো তৈরি প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করলে দেশের উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষায় এনজিওগুলো আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। সরকারি কার্যক্রমে এনজিওগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে একদিকে তাদের বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিও আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
বিশেষ করে সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে এনজিওগুলোর মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। পাশাপাশি দেশের সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশেও এনজিওগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানোর কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।
গবেষকদের মতে, বিদেশি অনুদান কমার প্রভাব বাংলাদেশে এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি। তবে নতুন প্রকল্প অনুমোদনের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রবণতা সামনে বড় সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পুরোনো প্রকল্পের অর্থ শেষ হওয়ার পর ছোট ও মাঝারি এনজিওগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
এ পরিস্থিতিতে বিদেশি অনুদানের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরকারি প্রকল্প, দেশীয় অর্থায়ন, সিএসআর এবং সামাজিক ব্যবসাকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগিয়ে নতুন অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন গবেষকরা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। নিউজ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬