
স্টাফ রিপোর্টার
চুয়াডাঙ্গার কৃতী সন্তান, বিশিষ্ট লেখক উম্মে মুসলিমা পেয়েছেন বাংলা বিভাগ অ্যালামনাই, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিভাগীয় কমিটির সাহিত্য পুরস্কার-২০২৬। কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও মনস্তাত্ত্বিক রচনায় দীর্ঘদিনের সৃজনশীল অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে এ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।
বাংলা সাহিত্যের ভুবনে উম্মে মুসলিমা একটি স্বতন্ত্র নাম। নিজস্ব লেখনিভঙ্গি ও গভীর জীবনবোধ দিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে পাঠককে মুগ্ধ করে আসছেন। তাঁর সাহিত্যকর্মে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সমাজবাস্তবতা, নারীজীবনের নানা টানাপোড়েন, সম্পর্কের জটিলতা এবং মানবিক অনুভূতির গভীর অনুরণন লক্ষ করা যায়।
গত ৩ অক্টোবর ২০২৬, শনিবার, ঢাকার ধানমন্ডির রাপা প্লাজার বাহারি আহারে অনুষ্ঠিত বাংলা বিভাগ অ্যালামনাই, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকা বিভাগীয় মহাসম্মিলন-২০২৬-এ আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর হাতে সাহিত্য পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। পুরস্কারের সঙ্গে ছিল ক্রেস্ট, উত্তরীয় এবং ১০ হাজার টাকা অর্থমূল্য।

সাহিত্য পুরস্কার প্রদান পর্বে কবি তারিক উল ইসলাম উম্মে মুসলিমার সাহিত্যকর্ম ও সৃষ্টিশীলতার বিভিন্ন দিক নিয়ে বক্তব্য দেন। পরে ডালিয়া তাঁর কবিতা আবৃত্তি করেন। পুরস্কার গ্রহণের পর উম্মে মুসলিমাও অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।
গুণিজন সম্মাননা ও সাহিত্য পুরস্কার
মহাসম্মিলনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ঢাকা বিভাগীয় কমিটির গুণিজন সম্মাননা, সাহিত্য পুরস্কার ও উদীয়মান সাহিত্যিক পুরস্কার-২০২৬ প্রদান।
এ বছর গুণিজন সম্মাননা পেয়েছেন বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব আব্দুল আজিজ এবং এ.এম.এম. হাসিবুল ইসলাম। অসুস্থতার কারণে হাসিবুল ইসলাম অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি। তাঁর পক্ষ থেকে তাঁর কন্যা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।
ঢাকা বিভাগীয় কমিটির সাহিত্য পুরস্কার-২০২৬-এর জন্য মনোনীত হন বিশিষ্ট লেখক উম্মে মুসলিমা। অন্যদিকে উদীয়মান সাহিত্যিক পুরস্কার-২০২৬-এর জন্য মনোনীত হন মো. জাহাঙ্গীর আলম (জারিফ আলম)। উদীয়মান সাহিত্যিক পুরস্কারের অর্থমূল্য ছিল ৫ হাজার টাকা।
গুণিজনদের ক্রেস্ট ও উত্তরীয় পরিয়ে সম্মাননা জানানো হয়। পুরস্কার ও সম্মাননা প্রদান পর্বে উপস্থিত সদস্য ও অতিথিদের মধ্যে সৃষ্টি হয় আনন্দঘন ও আবেগময় পরিবেশ।
চুয়াডাঙ্গার কৃতী সন্তান
উম্মে মুসলিমার জন্ম চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার কালিদাসপুর গ্রামে। তাঁর শৈশবের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে বাবার চাকরিস্থল কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় এবং নিজ গ্রামে। কৈশোরে তিনি বেড়ে ওঠেন আলমডাঙ্গায়।
শৈশব থেকেই তাঁর পরিবারে ছিল সাহিত্যচর্চার অনুকূল পরিবেশ। তাঁর পিতামহ ছিলেন চারণকবি। সমাজের নানা অসঙ্গতি ও অনিয়ম নিয়ে তিনি প্রহসনধর্মী কবিতা রচনা করতেন। তাঁর বাবা ও বড় বোনেরও কবিতা লেখার প্রতি আগ্রহ ছিল। পারিবারিক এই সাহিত্যিক আবহ তাঁর সৃজনশীল মনন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন
১৯৭৬ সালে উম্মে মুসলিমা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অনার্সে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনেই তাঁর সাহিত্যিক সত্তার বিকাশ আরও দৃঢ় হয়। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে তাঁর শিক্ষাজীবন সাহিত্যচর্চাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও মননশীল ভিত্তি দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়জীবন থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
সত্তরের দশক থেকে সাহিত্যচর্চা
সত্তরের দশক থেকেই উম্মে মুসলিমা নিয়মিত সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। দীর্ঘ কয়েক দশকের সাহিত্যজীবনে কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও মনস্তত্ত্বভিত্তিক রচনাসহ বিভিন্ন ধারায় তাঁর প্রায় ২০টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে—
কবিতা
আজও বৃক্ষ আজও নদী
খানিক সত্যি খানিক কাব্য
কাগজোছনা ও মাঘবসন্ত
প্রবঞ্চিতার কাব্য
গল্প
হাজার কালার মেয়েমানুষেরা
ফেরা না ফেরার গল্প
আলো আছে আলো নেই
ক্ষুধা ও ক্ষেত্রনাশ
তুচ্ছ প্রেম গুচ্ছ প্রতারণা
ধর্ষিতার গোধূলি
প্রবন্ধ
নারী শ্রম নারী প্রাপ্তি
নারী বলে আত্মশ্লাঘা বোধ করি
মনস্তত্ত্ববিষয়ক রচনা
স্বামীকে কীভাবে কবজা করবেন
তাঁর লেখায় নারীর সামাজিক অবস্থান, ভালোবাসা ও প্রতারণা, দুঃখ-বেদনা, সম্পর্কের জটিলতা এবং মানবিক সংগ্রামের নানা দিক বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বৃহত্তর সমাজবাস্তবতাকে তিনি সাহিত্যের ভাষায় রূপ দিয়েছেন।
সাহিত্যে নারীর নিজস্ব কণ্ঠস্বর
উম্মে মুসলিমার সাহিত্যকর্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নারীর জীবন ও মনোজগতকে সংবেদনশীলতা ও নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে তুলে ধরা। তাঁর লেখায় নারী কেবল কোনো গল্পের চরিত্র নয়; বরং সমাজ, পরিবার, সম্পর্ক ও অস্তিত্বের নানা প্রশ্নের মুখোমুখি একজন স্বতন্ত্র মানুষ।
ভালোবাসা, বঞ্চনা, প্রতারণা, সামাজিক বৈষম্য, আকাঙ্ক্ষা ও আত্মমর্যাদার মতো বিষয় তাঁর লেখায় কখনো সরাসরি, কখনো প্রতীকীভাবে উঠে এসেছে। ফলে তাঁর সাহিত্য একই সঙ্গে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বৃহত্তর সমাজবাস্তবতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
জীবনসঙ্গী কবি আপেল আবদুল্লাহ
উম্মে মুসলিমার ব্যক্তিজীবনের সঙ্গীও সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত। তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের সহপাঠী কবি আপেল আবদুল্লাহর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয় ১৯৮৪ সালের ১৬ নভেম্বর।
আপেল আবদুল্লাহ সরকারের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি স্মল ফার্মার্স ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকও ছিলেন।
সাহিত্য ও সংস্কৃতিমনস্ক এই দম্পতির দীর্ঘ পথচলা তাঁদের সৃজনশীল জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে।
স্বীকৃতির নতুন অধ্যায়
সত্তরের দশক থেকে শুরু হওয়া উম্মে মুসলিমার সাহিত্যযাত্রা আজও অব্যাহত। কবি হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও সময়ের সঙ্গে তিনি কথাসাহিত্যিক, প্রবন্ধকার ও মননশীল লেখক হিসেবে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন।
বাংলা বিভাগ অ্যালামনাই, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিভাগীয় কমিটির সাহিত্য পুরস্কার-২০২৬ তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যচর্চার প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। চুয়াডাঙ্গার কালিদাসপুরের মাটি থেকে উঠে আসা এই সাহ





