নুসরাত বিনতে শহিদ
বাংলাদেশে শীত এলেই বিয়ের মৌসুমের ঢেউ লাগে বাজারে—বিশেষ করে স্বর্ণালঙ্কারের দোকানগুলোতে। কিন্তু এবার সেই ঢেউয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেক বাস্তবতা: সোনার দাম অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় উঠেছে। ফলে বিয়ের গয়না কেনা শুধু উৎসবের পরিকল্পনা নয়, অনেকের কাছে এখন হয়ে উঠেছে অর্থনীতির অনিশ্চয়তার ভেতরে “নিরাপদ বিনিয়োগ” ভাবনার অংশ। এই প্রেক্ষাপটে ঢাকার বিভিন্ন শোরুমে ক্রেতার চাপ বাড়লেও, পরিচিত ও আস্থাভাজন ব্র্যান্ড হিসেবে ‘ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড’-এ মানুষের ভিড় চোখে পড়ার মতো—কেউ বিয়ের কেনাকাটায়, কেউ সঞ্চয়ের নিরাপদ ঠিকানা খুঁজতে।
২২ ক্যারেটে নতুন ইতিহাস ভরিতে ২ লাখ ৪৪ হাজার ১২৮ টাকা
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) জানিয়েছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবী/পাকা সোনার দাম বাড়ার প্রেক্ষিতে মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে এবং বুধবার (২১ জানুয়ারি) থেকে নতুন দাম কার্যকর। সর্বশেষ ঘোষণায় ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম ৫ হাজার ২৪৯ টাকা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৪৪ হাজার ১২৮ টাকা—যা দেশের স্বর্ণবাজারে সর্বোচ্চ দামের নতুন রেকর্ড। একই সঙ্গে ২১ ক্যারেট প্রতি ভরি ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৮৮ টাকা, ১৮ ক্যারেট ১ লাখ ৯৯ হাজার ৭৪৬ টাকা, এবং সনাতন পদ্ধতিতে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৮২১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
জানুয়ারিতে পাঁচ দফা বৃদ্ধি
এ দফার বাড়তি দাম একদিনের ঘটনা নয়। জানুয়ারির ধারাবাহিক সমন্বয়ে পাঁচ দফায় ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম মোট ১৭ হাজার ৩২২ টাকা বেড়েছে। এতদিন সর্বোচ্চ ছিল ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৯ টাকা, কিন্তু সেটিও টিকল না—২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে রেকর্ড ভেঙে তৈরি হলো নতুন রেকর্ড। ফলে শীতের বিয়ের মৌসুমে যে পরিবারগুলো ২–৩ ভরি গয়না ধরে কেনাকাটার পরিকল্পনা করেছিল, তাদের অনেকেরই এখন হিসাব বদলাতে হচ্ছে—কখনও ওজন কমিয়ে, কখনও নকশা বদলে, আবার কখনও কেনাকাটা ধাপে ধাপে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে।
‘ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড’-এ বাড়তি ভিড়—বিয়ে ও বিনিয়োগ, দুয়ের চাপ একসঙ্গে
এই বাজারচাপে পরিচিত ব্র্যান্ডগুলোর শোরুমে ক্রেতা বাড়ছে। বিশেষ করে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড-এ ভিড়ের বড় কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে দুটো প্রবণতা একসঙ্গে কাজ করছে। একদিকে শীতের বিয়ের কেনাকাটা—যেখানে পরিবারগুলো বিশ্বাসযোগ্যতা, মান, ডিজাইন ও সার্ভিস নিশ্চয়তা খোঁজে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির ধারায় অনেকেই সোনাকে দেখছেন অর্থনীতির অনিশ্চয়তার মধ্যে মূল্য সংরক্ষণের নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে। ফলে ‘বিয়ের গয়না’ আর ‘সঞ্চয়ের গয়না’—দুটো চাহিদাই একই বাজারে মিলেমিশে ভিড় বাড়াচ্ছে।
ট্রাম্পের শুল্ক-হুমকি ও উত্তেজনার রাজনীতি—বিশ্ব অনিশ্চয়তা, ঢাকার বাজারে প্রতিধ্বনি
আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়লেই নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ঝোঁক বাড়ে—সোনার মতো সম্পদ তখন বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। এই অনিশ্চয়তাকে আরও ঘনীভূত করে এমন এক ধরনের রাজনীতি, যা বাজারকে স্থিতিশীলতার বদলে চাপ ও ভয় দেখানোর বার্তা দেয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক-হুমকি নির্ভর কৌশল এবং সংঘাত তীব্র করার ধরনের অবস্থান বিশ্ববাণিজ্যে অনিশ্চয়তার আবহ তৈরি করে—যার খেসারত শেষ পর্যন্ত দিতে হয় সাধারণ ক্রেতাকে। কারণ এই ধরনের নীতি-ভাষা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ধাক্কা দেয়, ঝুঁকি বাড়ার ধারণা তৈরি করে, আর তখনই সোনার মতো নিরাপদ সম্পদের দিকে দৌড় শুরু হয়—যার প্রতিফলন এসে পড়ে বাংলাদেশের দাম ট্যাগে, বিয়ের বাজারের বাজেটে।
রুপার দামও চড়েছে—বিকল্প পথেও স্বস্তি কম
সোনার সঙ্গে সঙ্গে রুপার দামও বাড়ানো হয়েছে। ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপা ৬ হাজার ৫৯০ টাকা, ২১ ক্যারেট ৬ হাজার ২৯৯ টাকা, ১৮ ক্যারেট ৫ হাজার ৪২৩ টাকা, এবং সনাতন পদ্ধতির রুপা ৪ হাজার ৮২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে যারা সোনার দাম বেড়ে গেলে রুপাকে বিকল্প ভাবেন, তারাও এখন দেখছেন—বিকল্পের দিকেও চাপ বাড়ছে, স্বস্তির জায়গা সংকুচিত হচ্ছে।
শেষকথা- শীতের বিয়ে, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও সোনার ‘দুই পরিচয়’
শীতের বিয়ের মৌসুম বাংলাদেশের স্বর্ণবাজারকে সবসময়ই চাঙা করে। কিন্তু এবার বাজার চাঙা নয়—বাজার উত্তপ্ত। রেকর্ড দামে সোনা একদিকে বিয়ের আনন্দের হিসাবকে কঠিন করছে, অন্যদিকে অনেকে এটাকে দেখছেন নিরাপদ বিনিয়োগের আশ্রয় হিসেবে। এই দ্বিমুখী চাহিদার মাঝখানে আস্থাভাজন ব্র্যান্ড হিসেবে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড-এ মানুষের ভিড় বাড়ছে—কেউ বিয়ের সাজে, কেউ সঞ্চয়ের নিশ্চয়তায়। আর বিশ্বরাজনীতিতে শুল্ক-হুমকি আর উত্তেজনা তৈরির মতো নীতির সমালোচনা তাই এখানেই এসে থামে—কারণ এর চাপ কেবল কূটনীতিতে নয়, শেষ পর্যন্ত পড়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কেনাকাটায়, বিয়ের বাজেটে, এবং বাজারের প্রতিটি দামের ট্যাগে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬