
আলী কদর পলাশ
মানুষ যখন প্রথম আকাশের দিকে তাকিয়েছিল, তখন তার হাতে কোনো দূরবীন ছিল না। যখন সে প্রথম আগুনের কাছে হাত বাড়িয়েছিল, তখন তার সামনে কোনো পদার্থবিজ্ঞানের বই খোলা ছিল না। নদীর স্রোত, বজ্রের শব্দ, রাতের অন্ধকার, জন্ম ও মৃত্যু, ক্ষুধা ও ভয়—এসবের মধ্য দিয়েই মানুষের প্রথম পাঠ শুরু হয়েছিল।
মানুষের জ্ঞানের ইতিহাস তাই মূলত প্রশ্নের ইতিহাস।
কে আমি? কোথা থেকে এলাম? আকাশ কেন অন্ধকার হয়? মৃত্যু কেন আসে? আগুন কেন পোড়ায়? নদী কেন পথ বদলায়?
এই প্রশ্নগুলোর সব উত্তর মানুষ একদিনে পায়নি। উত্তর খুঁজতে গিয়ে সে কখনো গল্প বানিয়েছে, কখনো দেবতার কল্পনা করেছে, কখনো দর্শন সৃষ্টি করেছে, আবার কখনো পরীক্ষাগারে দাঁড়িয়ে পুরোনো ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে।
এভাবেই সভ্যতা এগিয়েছে।
জন লক মানুষের মনকে জন্মের সময় সাদা কাগজের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। অভিজ্ঞতা সেই কাগজে অক্ষর লিখতে থাকে। অন্যদিকে রেনে দেকার্ত মানুষের অস্তিত্বের কেন্দ্রে রেখেছিলেন চিন্তাকে। তাঁর বিখ্যাত উচ্চারণ, “আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি।”
অভিজ্ঞতা এবং চিন্তা। চোখে দেখা এবং মনে বিচার করা। এই দুইয়ের কথোপকথনেই মানুষের জ্ঞান ক্রমে গভীর হয়েছে।
মানুষের চোখ ভুল করতে পারে। কানও ভুল শুনতে পারে। স্মৃতি প্রতারণা করতে পারে। এমনকি বুদ্ধিও কখনো নিজের পক্ষপাতের বন্দী হয়ে পড়ে। তাই সভ্যতা এমন একটি পদ্ধতির জন্ম দিয়েছে, যেখানে মানুষ নিজের ভুলকেও পরীক্ষা করতে পারে। আমরা তাকে বলি বিজ্ঞান।
বিজ্ঞানের সবচেয়ে সুন্দর দিক সম্ভবত এই যে, বিজ্ঞান নিজেকে চূড়ান্ত বলে ঘোষণা করে না। নতুন প্রমাণ এলে পুরোনো ব্যাখ্যা বদলে যায়। নিউটনের পর আইনস্টাইন আসেন। আইনস্টাইনের পরও প্রশ্ন থামে না। একটি উত্তর আবার নতুন প্রশ্নের দরজা খুলে দেয়।
এই বিনয়ই জ্ঞানের সৌন্দর্য।
মানবসভ্যতার ইতিহাস ধর্মগ্রন্থের ইতিহাসের চেয়েও দীর্ঘ। মানুষ লিখতে শেখার বহু আগে আগুন ব্যবহার করেছে, পাথর কেটেছে, শিকার করেছে, আশ্রয় বানিয়েছে, সন্তানকে রক্ষা করেছে, মৃতকে সমাহিত করেছে। সে আকাশ দেখেছে, ঋতু চিনেছে, নদীর পথ অনুসরণ করেছে।
এরপর এসেছে লেখা।
মেসোপটেমিয়ার কিউনিফর্ম, মিশরের প্যাপিরাস, প্রাচীন বিশ্বের নানা লিপি মানুষের স্মৃতিকে শরীরের বাইরে নিয়ে গেছে। মানুষ প্রথমবার তার চিন্তাকে নিজের মৃত্যুর পরেও বাঁচিয়ে রাখার উপায় পেল।
‘এপিক অব গিলগামেশ’ সেই প্রাচীন স্মৃতির অন্যতম বিস্ময়। সেখানে মানুষের ভয় আছে, বন্ধুত্ব আছে, মৃত্যুচিন্তা আছে, প্লাবনের কাহিনি আছে। পরবর্তী বহু সভ্যতা ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের কাহিনির সঙ্গে তার নানা সাদৃশ্য আমাদের একটি গভীর সত্য মনে করিয়ে দেয়—মানুষের সংস্কৃতি কখনো একা জন্মায় না। গল্প নদীর মতো। এক দেশ থেকে অন্য দেশে যায়, ভাষা বদলায়, চরিত্র বদলায়, কিন্তু কোথাও কোথাও তার প্রাচীন স্রোত থেকে যায়।
ধর্মও মানুষের এই দীর্ঘ যাত্রার অংশ। ভয়, বিস্ময়, নৈতিকতা, মৃত্যু, অজানা এবং অনন্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষ ধর্ম সৃষ্টি করেছে, ধর্মকে ধারণ করেছে অথবা ধর্মের মধ্যে নিজের অস্তিত্বের অর্থ খুঁজেছে।
তাই ধর্মকে অবজ্ঞা করে মানুষের ইতিহাস বোঝা যায় না।
কিন্তু ধর্মকে বিজ্ঞান বানিয়েও প্রকৃতিকে বোঝা যায় না।
পৃথিবীর বয়স জানতে ভূতত্ত্ব প্রয়োজন। নক্ষত্র বুঝতে জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রয়োজন। জীবনের ইতিহাস জানতে জীববিজ্ঞান প্রয়োজন। মানুষের মস্তিষ্ক বুঝতে স্নায়ুবিজ্ঞান প্রয়োজন। রোগ সারাতে চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রয়োজন।
বিশ্বাস মানুষকে অর্থ দিতে পারে। বিজ্ঞান বলে দেয় কোনো বস্তু কীভাবে কাজ করে। দর্শন প্রশ্ন তোলে, আমরা সেই জ্ঞান দিয়ে কী করব।
এই তিনকে একে অন্যের জায়গায় বসাতে গেলেই বিভ্রান্তি জন্মায়।
মানুষের মস্তিষ্ক ধর্ম দেখে তৈরি হয় না। একটি শিশু পৃথিবীতে আসে সম্ভাবনা নিয়ে। তার চারপাশ তাকে ভাষা শেখায়, বিশ্বাস শেখায়, ভয় শেখায়, ভালোবাসা শেখায়। পরিবার তাকে পরিচয় দেয়, সমাজ তাকে ধারণা দেয়, শিক্ষা তাকে প্রশ্ন করতে শেখাতে পারে অথবা প্রশ্ন করতে ভয়ও শেখাতে পারে।
এখানেই মানুষের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
নিজের বিশ্বাসকে ভালোবাসা সহজ। নিজের বিশ্বাসকে প্রশ্ন করা কঠিন।
নিজের মতের মানুষের সঙ্গে একমত হওয়া সহজ। ভিন্নমতের মানুষের মানবিক মর্যাদা স্বীকার করা কঠিন।
কিন্তু সভ্যতার ইতিহাসে বড় পরিবর্তন এসেছে সেই মানুষগুলোর হাত ধরে, যারা প্রশ্ন করতে ভয় পায়নি।
সক্রেটিস প্রশ্ন করেছিলেন।
দেকার্ত সন্দেহ করেছিলেন।
স্পিনোজা ঈশ্বর ও প্রকৃতিকে নতুনভাবে চিনতে চেয়েছিলেন।
কান্ট মানুষের জ্ঞানের সীমা কোথায়, সেটিই জানতে চেয়েছিলেন।
কেউই শেষ কথা বলেননি।
দর্শনের সৌন্দর্য এখানেই। তার কোনো শেষ পৃষ্ঠা নেই।
আজ neuroscience আমাদের মস্তিষ্কের কোটি কোটি নিউরনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিস্ময়কর তথ্য দিচ্ছে। কিন্তু consciousness বা চেতনা কীভাবে জন্ম নেয়, সেই প্রশ্নের পূর্ণ উত্তর এখনো আমাদের হাতে নেই। Panpsychism থেকে materialism পর্যন্ত নানা দর্শন আছে। Quantum mechanics নিয়েও নানা অনুমান আছে। কিন্তু বিজ্ঞানের সততা হলো, যা জানা হয়নি তাকে জানা হয়েছে বলে ঘোষণা না করা।
অজানাকে স্বীকার করার সাহসও জ্ঞানের একটি রূপ।
এই পৃথিবীতে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, ইহুদি, নাস্তিক কিংবা সংশয়বাদী—সবাই একই মানবপ্রজাতির সদস্য। প্রত্যেকেই ভালোবাসতে পারে, ভয় পেতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে, ভুল করতে পারে এবং শিখতে পারে।
মানুষের মর্যাদার ভিত্তি তার ধর্মীয় পরিচয় নয়। তার মানুষ হওয়াটাই যথেষ্ট।
কোনো বিশ্বাস যদি মানুষকে অন্য মানুষকে ঘৃণা করতে শেখায়, তবে সেই বিশ্বাসের প্রয়োগকে প্রশ্ন করা দরকার। আবার কোনো যুক্তিবাদ যদি বিশ্বাসী মানুষকে মানুষ হিসেবেই তুচ্ছ করে, তবে সেই যুক্তিবাদও মানবিকতার পরীক্ষা পাস করে না।
জ্ঞান অহংকার শেখায় না।
প্রকৃত জ্ঞান মানুষকে বিনয়ী করে।
কারণ যত জানি, ততই বুঝি আমাদের না জানার পরিমাণ কত বিশাল।
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের দিকে তাকালে মানুষ আসলে নিজের ক্ষুদ্রতাই দেখতে পায়। কোটি কোটি নক্ষত্রের মাঝখানে একটি ক্ষুদ্র গ্রহ। সেই গ্রহে ক্ষণিকের জন্য বেঁচে থাকা একটি প্রাণী আমরা। অথচ সেই ক্ষুদ্র প্রাণীর মস্তিষ্ক মহাবিশ্বকে প্রশ্ন করতে পারে।
এটাই মানুষের বিস্ময়।
দেকার্ত বলেছিলেন, “আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি।”
আজ তার সঙ্গে হয়তো আরও একটি বাক্য যোগ করা যায়।
আমি প্রশ্ন করি, তাই আমি শিখি।
আমি ভুল স্বীকার করি, তাই আমি এগোই।
আমি অন্য মানুষকে সম্মান করি, তাই আমি মানুষ।
সত্য কোনো ধর্মের একক সম্পত্তি নয়। বিজ্ঞানীরও নয়, দার্শনিকেরও নয়। সত্যের কাছে পৌঁছানোর একমাত্র সৎ পথ হলো প্রশ্নকে বাঁচিয়ে রাখা।
কারণ যে বিশ্বাস প্রশ্নকে ভয় পায়, সে দুর্বল।
যে জ্ঞান প্রশ্নকে নিষিদ্ধ করে, সে জ্ঞান নয়।
আর যে মানুষ নিজের বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে উঠে অন্য মানুষের মর্যাদা দেখতে শেখে, সম্ভবত সেখান থেকেই সভ্যতার প্রকৃত শিক্ষা শুরু হয়।





