খুঁটিতে বাঁধা বিবেক

Date:

spot_img

অভিযুক্ত মানুষও আইনের সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদার অধিকারী

বরিশালের উজিরপুরের বামরাইল বাজারের একটি দৃশ্য আমাদের সমাজের সামনে অস্বস্তিকর এক আয়না তুলে ধরেছে। চুরির চেষ্টার অভিযোগে একজন মানুষকে মারধর করে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। সকালে তাঁর নয় বছরের মেয়ে এসে বাবার পাশে বসেছে। হাতে চা আর রুটি। রুটির টুকরো চায়ে ভিজিয়ে বাবার মুখে তুলে দিয়েছে।

একটি শিশুর এই স্বাভাবিক কাজই আমাদের অস্বাভাবিক হয়ে ওঠা সমাজকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

লোকটি অপরাধ করেছেন কি না, সেটি নির্ধারণের দায়িত্ব কোনো বাজারের জনতার নয়। অভিযোগ থাকলে আইন আছে, পুলিশ আছে, আদালত আছে। একজন মানুষকে আটক করে মারধর করা, খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা কিংবা জনসমক্ষে অপমান করা বিচার নয়। এটি আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া।

অপরাধের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ স্বাভাবিক। চুরি সাধারণ মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে। কিন্তু অপরাধের অভিযোগ আর অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। এই পার্থক্য মুছে গেলে আইনের শাসনের জায়গা দখল করে নেয় জনতার আবেগ। তখন অভিযুক্তের অপরাধ প্রমাণের প্রয়োজন থাকে না। সন্দেহই শাস্তির কারণ হয়ে ওঠে।

এ ধরনের প্রবণতা ভয়ংকর।

আজ যে মানুষটিকে চোর সন্দেহে খুঁটির সঙ্গে বাঁধা হচ্ছে, কাল অন্য কোনো অভিযোগে নির্দোষ একজনও একই পরিণতির শিকার হতে পারেন। আইন তাই অপরাধীকে রক্ষা করার জন্য নয়, মানুষকে অন্যায় বিচার থেকে রক্ষা করার জন্যও প্রয়োজন।

বামরাইলের ঘটনাটির সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক সম্ভবত শিশুটির উপস্থিতি। নয় বছরের একটি মেয়েকে এমন দৃশ্য দেখতে হলো, যেখানে তার বাবা মানুষের ভিড়ের মাঝখানে বাঁধা। সে আইন বোঝে না, অভিযোগের ধারা বোঝে না। সে শুধু বুঝেছে তার বাবা ক্ষুধার্ত হতে পারেন। তাই খাবার নিয়ে এসেছে।

শিশুটির হাতে সেই রুটি যেন আমাদের সমাজের কাছে একটি নীরব প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো মানুষ অপরাধে অভিযুক্ত হলেই কি তার মানবিক মর্যাদা শেষ হয়ে যায়?

উত্তর অবশ্যই না।

রাষ্ট্র ও সমাজের সভ্যতার পরীক্ষা হয় সবচেয়ে দুর্বল, সবচেয়ে অসহায় এবং এমনকি অভিযুক্ত মানুষের সঙ্গে আচরণে। আদালতে দোষী সাব্যস্ত একজন মানুষও নির্যাতনের জন্য উন্মুক্ত নন। সেখানে কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে বেঁধে রেখে মারধর করার কোনো নৈতিক বা আইনগত অধিকার কারও থাকতে পারে না।

এই ঘটনায় দারিদ্র্যের একটি গভীর ছায়াও দেখা যায়। অভিযোগের সত্যতা বিচার করবে যথাযথ কর্তৃপক্ষ। কিন্তু আমাদের এটিও ভাবতে হবে, কেন সমাজের একটি অংশ এমন প্রান্তে পৌঁছায়, যেখানে ক্ষুধা, বেকারত্ব, হতাশা ও অপরাধের সীমারেখা কখনো কখনো ভয়ংকরভাবে কাছাকাছি চলে আসে। অপরাধকে সমর্থন না করেও অপরাধের সামাজিক কারণ অনুসন্ধান করা যায় এবং করা প্রয়োজন।

আরেকটি প্রশ্নও জরুরি। জনসমক্ষে কাউকে অপমান করা কেন এত সহজ হয়ে উঠছে? কেন মানুষের দুর্দশা ক্রমে দর্শনীয় ঘটনায় পরিণত হচ্ছে? কেন বিচার হওয়ার আগেই আমরা শাস্তি দিতে আগ্রহী হয়ে উঠছি?

সভ্য সমাজে আইন প্রতিশোধের নাম নয়। আইন ন্যায়বিচারের পদ্ধতি। সেখানে অভিযোগ থাকবে, তদন্ত হবে, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকবে, প্রমাণ বিবেচিত হবে এবং আদালত সিদ্ধান্ত দেবেন।

বামরাইলের মানুষটির বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য হলে আইন অনুযায়ী তাঁর বিচার হবে। কিন্তু তাঁকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখার বিচারও এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। কারণ আইন শুধু অভিযুক্তের জন্য নয়, অভিযোগকারীর জন্যও সমান।

ছোট্ট মেয়েটি হয়তো এসবের কিছুই জানে না। সে শুধু বাবাকে রুটি খাইয়েছে। অথচ তার সেই সামান্য কাজ আমাদের বড় একটি শিক্ষা দিয়ে গেছে।

মানুষের বিচার করার আগে তাকে মানুষ হিসেবে দেখতে হয়।

আইনের শাসনের শুরু সেখানেই।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

কমিশনার মামুনের পিতার মৃত্যুতে দোয়া মাহফিল

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর ও বংশাল থানা...

আগামী তিন বছরে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে: ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার

বাগেরহাট প্রতিনিধি আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশে এক লাখ নতুন...

খুলনায় ফুটপাত দখলমুক্ত করতে কেসিসির অভিযান, ভাঙা হলো অবৈধ দোকানপাট

খুলনা প্রতিনিধি খুলনা নগরীর ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ...

হোমনায় কৃষিজমি থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন, দুই ড্রেজার মালিককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা!

বিশেষ প্রতিনিধি কুমিল্লার হোমনা উপজেলার মাথাভাঙ্গা ইউনিয়নের ছয়ফুল্লাকান্দি এলাকায়...