রেহানা ফেরদৌসী
রাত, মহাসাগর, জেট স্ট্রিম ও সময়ের হিসাব—একটি ট্রান্সআটলান্টিক ফ্লাইটের নেপথ্যে যেমন আছে আধুনিক বিজ্ঞানের বিস্ময়, তেমনি আছে সেই সৃষ্টিকর্তার ইশারা, যিনি মানুষকে জ্ঞান দিয়েছেন প্রকৃতির নিয়ম বুঝে তাকে কাজে লাগানোর সক্ষমতা।
মধ্য আটলান্টিক। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৫ হাজার ফুট ওপরে একটি যাত্রীবাহী বিমান ছুটে চলছে। জানালার বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। নিচে যতদূর চোখ যায় শুধু মহাসাগর—কোনো শহরের আলো নেই, নেই রাস্তার চিহ্ন। কেবিনের আলো মৃদু হয়ে এসেছে, শত শত যাত্রী ঘুমিয়ে পড়েছেন। অথচ সেই অন্ধকারের বুক চিরে বিমানটি নির্ভুলভাবে এগিয়ে যাচ্ছে এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশের দিকে।
এমন দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে একটি প্রশ্ন আসতেই পারে—আটলান্টিক পাড়ি দেওয়ার সময় এত বিমান রাতের আকাশে কেন থাকে?
প্রশ্নটি রহস্যময়, কিন্তু উত্তরটি বিজ্ঞানের। আর সেই বিজ্ঞানের গভীরে প্রবেশ করলে আরও বড় একটি বিস্ময় সামনে আসে—মানুষ প্রকৃতিকে জয় করেনি; বরং প্রকৃতির নিয়মকে বুঝে তার সঙ্গে চলতে শিখেছে।
ট্রান্সআটলান্টিক ফ্লাইট যে কেবল রাতেই চলে, তা অবশ্যই নয়। দিনের আলোতেও নিয়মিত বিমান আটলান্টিক অতিক্রম করে। তবে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মধ্যে অনেক ফ্লাইট এমনভাবে সময় নির্ধারণ করা হয় যে যাত্রার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রাতের মধ্যে পড়ে। এর পেছনে রয়েছে সময় অঞ্চলের পার্থক্য, যাত্রীদের সুবিধা, বিমানবন্দরের সময়সূচি এবং সংযোগকারী ফ্লাইটের সমন্বয়।
লন্ডন থেকে নিউইয়র্ক কিংবা ইউরোপের অন্য কোনো শহর থেকে উত্তর আমেরিকায় গেলে পশ্চিমমুখী যাত্রায় ঘড়ির সময় পিছিয়ে যায়। ফলে সন্ধ্যা বা রাতের একটি ফ্লাইটে উঠে কয়েক ঘণ্টা আকাশে কাটিয়েও একজন যাত্রী গন্তব্যে স্থানীয় সময় অনুযায়ী সকাল বা দিনের শুরুতে পৌঁছাতে পারেন। দীর্ঘ যাত্রার একটি বড় অংশ ঘুমিয়ে পার করার সুযোগও তৈরি হয়।
অর্থাৎ, রাত এখানে ভয়ের সময় নয়; এটি সময় ব্যবস্থাপনারও একটি অংশ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় আকাশের অদৃশ্য স্রোত—জেট স্ট্রিম। উচ্চ বায়ুমণ্ডলের দ্রুতগতির এই বায়ুপ্রবাহ দীর্ঘপথের বিমান চলাচলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পশ্চিম থেকে পূর্বমুখী যাত্রায় অনুকূল জেট স্ট্রিম বিমানের গতি বাড়াতে পারে এবং সময় ও জ্বালানি ব্যবহারে সুবিধা দিতে পারে। বিপরীতমুখী যাত্রায় একই বায়ুপ্রবাহ প্রতিকূল হলে তার প্রভাব পড়ে ফ্লাইট পরিকল্পনায়। NOAA-র তথ্যেও বিমান চলাচলের সঙ্গে জেট স্ট্রিমের এই সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
তাই বিমান আকাশে শুধু দূরত্ব মাপে না; বাতাসকেও হিসাব করে। কোন উচ্চতায় বাতাস অনুকূল, কোথায় গতি বেশি, কোথায় আবহাওয়া তুলনামূলক অনুকূল—এসবই ফ্লাইট পরিকল্পনার অংশ। প্রয়োজন হলে আবহাওয়া ও বাতাসের পরিস্থিতি অনুযায়ী রুটও পরিবর্তিত হয়।
আর পৃথিবী যেহেতু গোলাকার, দীর্ঘ দূরত্বের উড্ডয়নে মানচিত্রে চোখে দেখা সরল রেখাই সবসময় সবচেয়ে কার্যকর পথ নয়। পৃথিবীর পৃষ্ঠে দুই স্থানের মধ্যে স্বল্পতম পথের ধারণা, অর্থাৎ Great Circle Route, দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বাতাস, আবহাওয়া ও আকাশপথের বাস্তব পরিস্থিতি।
ফলে জানালার বাইরে যাত্রাপথ যতই অদৃশ্য মনে হোক, তার পেছনে কাজ করে অসংখ্য গাণিতিক হিসাব।
আটলান্টিকের আকাশে আরও একটি বিস্ময়কর ব্যবস্থা রয়েছে—North Atlantic Organized Track System বা NAT OTS। সমুদ্রের ওপর মাটির রাস্তার মতো কোনো দৃশ্যমান হাইওয়ে নেই। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট উচ্চতা ও রুটে বিমান পরিচালনার জন্য সংগঠিত ট্র্যাক ব্যবহৃত হয়। আবহাওয়া, বাতাস ও অন্যান্য অপারেশনাল পরিস্থিতি অনুযায়ী এসব ট্র্যাক পরিবর্তিত হতে পারে। উত্তর আটলান্টিকের বর্তমান বিমান চলাচলসংক্রান্ত FAA advisories-তেও NAT OTS-এর জন্য নির্দিষ্ট রুট ও ট্র্যাক ব্যবহারের নির্দেশনা দেখা যায়।
অর্থাৎ রাতের আকাশে যে অসংখ্য বিমানকে আমরা দেখতে পাই, তার পেছনে কোনো কাকতালীয় ঘটনা নেই; রয়েছে বিশাল এক আন্তর্জাতিক সমন্বয়।
তবে একটি ভুল ধারণা দূর করা দরকার—রাত হলেই আটলান্টিকের আকাশ শান্ত হয়ে যায়, টার্বুলেন্স কমে যায় বা ফ্লাইট স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেশি নিরাপদ হয়ে যায়—এমন সরল বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তের ভিত্তি নেই। ঝড়, বজ্রগর্ভ মেঘ, উচ্চস্তরের বায়ুপ্রবাহ ও টার্বুলেন্স রাতেও হতে পারে। আধুনিক বিমান তাই শুধু চোখের ওপর নির্ভর করে না; আবহাওয়ার পূর্বাভাস, স্যাটেলাইট তথ্য, অনবোর্ড আবহাওয়া রাডার এবং নিয়ন্ত্রিত ফ্লাইট পরিকল্পনার ওপরও নির্ভর করে।
এখানেই রাতের আটলান্টিকের আসল সৌন্দর্য।
যাত্রীর চোখে নিচে শুধু অন্ধকার। কিন্তু ককপিটে সেই অন্ধকার অজ্ঞাত নয়। সেখানে আছে অবস্থান নির্ণয়ের তথ্য, নির্ধারিত রুট, উচ্চতা, বাতাসের গতি, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, জ্বালানির হিসাব এবং সামনে থাকা আকাশপথের পরিকল্পনা।
অন্ধকার আছে চোখের সামনে, কিন্তু পথের অন্ধকার নেই।
মানুষের তৈরি বিমান আজ কয়েক ঘণ্টায় যে মহাসাগর পাড়ি দেয়, একসময় সেই সমুদ্রই ছিল মানুষের কাছে বিরাট এক অজানা বিস্তার। বিজ্ঞান সেই অজানাকে মুছে দেয়নি; বরং পর্যবেক্ষণ, গণনা ও গবেষণার মাধ্যমে তার নিয়মগুলো বুঝতে শিখেছে। তারপর সেই জ্ঞানকে প্রযুক্তিতে রূপ দিয়েছে মানুষ।
কিন্তু এখানেই কি গল্প শেষ?
না। এখানেই বরং আরেকটি প্রশ্ন শুরু হয়—এই জ্ঞান মানুষ পেল কোথা থেকে?
বিজ্ঞান মানুষের অর্জন, নিঃসন্দেহে। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করেছেন, প্রকৌশলীরা বিমান তৈরি করেছেন, পাইলটরা দক্ষতা অর্জন করেছেন, নেভিগেশন ও যোগাযোগ প্রযুক্তি তৈরি হয়েছে মানুষের দীর্ঘ সাধনায়। এসব মানবসভ্যতার অসাধারণ কৃতিত্ব।
কিন্তু মানুষের বুদ্ধি, পর্যবেক্ষণক্ষমতা, গণনা করার সামর্থ্য এবং প্রকৃতির নিয়ম আবিষ্কারের ক্ষমতাও তো সৃষ্টিরই অংশ।
চৌদ্দশ বছর আগে নাজিল হওয়া কোরআন মানুষকে বারবার প্রকৃতির নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করতে আহ্বান করেছে। সূরা আল-জাসিয়াহর ১২ নম্বর আয়াতে সমুদ্রকে মানুষের জন্য নিয়োজিত করার কথা এসেছে, যাতে আল্লাহর নির্দেশে নৌযান তাতে চলতে পারে এবং মানুষ তাঁর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করতে ও কৃতজ্ঞ হতে পারে। পরের আয়াতেও আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিসমূহ মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সূরা আন-নাহলের ১২ নম্বর আয়াতে রাত, দিন, সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্রের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে—এর মধ্যে চিন্তাশীল মানুষের জন্য নিদর্শন রয়েছে।
এই বক্তব্যকে আধুনিক বিমানের প্রযুক্তির সরাসরি ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। বরং এর গভীরতর শিক্ষা হলো—মানুষ যে পৃথিবী, সমুদ্র, আকাশ ও প্রাকৃতিক নিয়ম নিয়ে গবেষণা করে জ্ঞান অর্জন করছে, সেই সৃষ্টিজগতের মূল নিয়ন্তা আল্লাহ। মানুষ তাঁর দেওয়া বুদ্ধি ও সামর্থ্য কাজে লাগিয়ে প্রকৃতির নিয়মকে বুঝতে পারে; কিন্তু সেই নিয়মের স্রষ্টা মানুষ নয়।
তাই আটলান্টিকের ওপর দিয়ে রাতের অন্ধকারে একটি বিমান যখন ছুটে চলে, সেখানে একই সঙ্গে দুটি বিস্ময়কে দেখা যায়—মানুষের জ্ঞানচর্চার বিস্ময় এবং সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি করা জগতের বিস্ময়।
বিমানটি মানুষের তৈরি। তার ইঞ্জিন মানুষের তৈরি। তার নেভিগেশন ব্যবস্থা মানুষের জ্ঞানের ফসল। কিন্তু যে বায়ুমণ্ডল, যে মহাসাগর, যে মাধ্যাকর্ষণ, যে পৃথিবীর ঘূর্ণন, যে বাতাসের প্রবাহ—এসবের কোনোটি মানুষ সৃষ্টি করেনি। মানুষ শুধু তাদের নিয়ম আবিষ্কার করেছে এবং সেই নিয়মকে কাজে লাগাতে শিখেছে।
সুতরাং বিজ্ঞানকে সম্মান করার অর্থ সৃষ্টিকর্তাকে ভুলে যাওয়া নয়; বরং সৃষ্টির নিয়ম যত গভীরভাবে বোঝা যায়, স্রষ্টার সৃষ্টিশীলতার বিস্ময়ও তত গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়।
আটলান্টিকের রাত তাই শুধু একটি বিমানযাত্রার গল্প নয়। এটি সময় ও প্রযুক্তির গল্প, মানুষের মেধা ও অধ্যবসায়ের গল্প, প্রকৃতির নিয়মকে বোঝার গল্প। আর সবশেষে এটি কৃতজ্ঞতারও গল্প—কারণ মানুষ যতই দূর আকাশে উড়ুক, তার উড্ডয়নের প্রতিটি মুহূর্তই এমন এক সৃষ্টিজগতের নিয়মের ওপর নির্ভরশীল, যা তার নিজের সৃষ্টি নয়।
জানালার বাইরে তখন হয়তো শুধু কালো সমুদ্র। দূরে কোনো শহরের আলো নেই। তবু সেই অন্ধকারের বুকের ওপর দিয়ে একটি আলোকিত বিমান এগিয়ে যাচ্ছে নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে।
মানুষ পথ তৈরি করেছে, কিন্তু পথের নিয়ম সে তৈরি করেনি। মানুষ আকাশ জয় করার প্রযুক্তি বানিয়েছে, কিন্তু আকাশ বানায়নি। মানুষ বাতাসকে বুঝেছে, কিন্তু বাতাস সৃষ্টি করেনি।
আর এই উপলব্ধিতেই বিজ্ঞানের বিস্ময় পূর্ণতা পায়—যখন মানুষের কৃতিত্বের পাশে বিনয়ের সঙ্গে স্মরণ করা হয় সেই মহান স্রষ্টাকে, যিনি মানুষকে জ্ঞান দিয়েছেন, প্রকৃতিকে নিয়মে বেঁধেছেন এবং সেই নিয়ম বুঝে এগিয়ে যাওয়ার সামর্থ্যও দিয়েছেন।
আকাশের অন্ধকারে তাই শুধু বিমানের আলো জ্বলে না; জ্বলে মানুষের জ্ঞানের আলোও। আর সেই আলোর উৎসের দিকে তাকালে শেষ পর্যন্ত যে নামটিই ফিরে আসে—তিনি একমাত্র সৃষ্টিকর্তা।
তথ্যসূত্র
১. Federal Aviation Administration (FAA), North Atlantic Track Organized Track Structure (NAT OTS) ও North Atlantic air traffic advisories।
২. Federal Aviation Administration (FAA), Aeronautical Information Manual (AIM)—North Atlantic operations ও flight planning।
৩. National Oceanic and Atmospheric Administration (NOAA), Jet Stream—উচ্চ বায়ুমণ্ডলের বায়ুপ্রবাহ ও বিমান চলাচলে এর প্রভাব।
৪. আল-কুরআন, সূরা আল-জাসিয়াহ, আয়াত ১২–১৩।
৫. আল-কুরআন, সূরা আন-নাহল, আয়াত ১২।

লেখক পরিচিতি: রেহানা ফেরদৌসী
রেহানা ফেরদৌসী একজন কলামিস্ট ও ভয়েস আর্টিস্ট। তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা ও সাময়িকীতে নিয়মিত কলাম লিখেন, যেখানে সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবন নিয়ে সহজভাবে কথা বলেন।তিনি ইডেন মহিলা কলেজ থেকে অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন।তিনি বিশ্লেষণধর্মী লেখা,সমসাময়িক সমাজ, সংকট ও নানামুখী সমস্যাবলিকে গভীর পর্যবেক্ষণ ও যুক্তিনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরেন। তাঁর লেখায় বাস্তবতা, সচেতনতা ও চিন্তার গভীরতার সুষম প্রতিফলন লক্ষ করা যায়।
ভয়েস আর্টিস্ট হিসেবে আবৃত্তি ও তথ্যচিত্রে তাঁর কণ্ঠস্বর শ্রোতাদের কাছে পরিচিত ও সমাদৃত।
তিনি কেন্দ্রীয় পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক)-এর কার্যনির্বাহী কমিটির সমাজকল্যাণ বিভাগের সহসভানেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং নারীর কল্যাণে কাজ করছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। নিউজ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬