আলী কদর পলাশ
রাষ্ট্রের প্রয়োজনে অবকাঠামো নির্মিত হয়, সেতু হয়—ইহা ইতিহাসের স্বাভাবিক পরিক্রমা। কিন্তু সেই অবকাঠামোর নির্মাণ-ব্যয়কে সরাসরি তণ্ডুলমূল্যের (চালের দাম) সহিত যুক্ত করিয়া যে গাণিতিক ব্যাখ্যা অতিসম্প্রতি বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দীনের কণ্ঠে ধ্বনিত হইল, তাহা কেবল বিস্ময়করই নহে বরং অর্থনীতির প্রচলিত সংজ্ঞার বাহিরে এক নতুন ঘরানার 'যুক্তি' বলিয়া প্রতীয়মান হয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদানুসারে, তিনি নেত্রকোণায় এক মতবিনিময় সভায় বলিয়াছেন—পদ্মা সেতু নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয়ের কারণেই চালের দাম কেজিতে ২০ টাকা বৃদ্ধি পাইয়াছে। অধিকন্তু, সেতু না বানাইয়া সেচখাতে বিনিয়োগ করিলে নাকি দাম ৫ টাকা কমিত।
বাজারের অস্থিরতাকে একটি নির্দিষ্ট প্রকল্পের ঋণের ওপর আরোপ করিয়া 'কার্য-কারণ' সম্পর্ক স্থাপন করিবার এই যে প্রবণতা, ইহাকে অর্থনীতির নির্মোহ বিশ্লেষণ অপেক্ষা দায় এড়াইবার কৌশল বলিলে অত্যুক্তি হইবে না। চালের বাজার মূলত বহুমাত্রিক উপাদানের সমষ্টি। উৎপাদন খরচ, সার ও জ্বালানি তেলের মূল্য, পরিবহন ব্যবস্থা, বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি এবং সর্বোপরি অসাধু সিন্ডিকেটের কারসাজি—এইসবই দাম নির্ধারণের মূল নিয়ামক। এই সকল বাস্তবতাকে একপাশে সরাইয়া কেবল 'সেতু নির্মাণ = ২০ টাকা বৃদ্ধি'—এমন সরলীকরণ জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করিতে পারে। ইহা অনেকটা ব্যাধির মূল চিকিৎসা না করিয়া ভিন্ন অঙ্গে প্রলেপ দেওয়ার শামিল।
দ্বিতীয়ত, সেচখাতে বিনিয়োগ করিলে চালের দাম ৫ টাকা কমিত বলিয়া যে দাবিটি করা হইয়াছে, তাহার স্বপক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত বা অর্থনৈতিক কাঠামো উপস্থাপিত হয় নাই। ফলে ইহাকে অর্থনীতির অকাট্য সিদ্ধান্ত অপেক্ষা একটি 'বিকল্প-ইতিহাসের কল্পনা' বলিয়াই মনে হয়। নীতিনির্ধারক যখন অনুমানের ওপর ভিত্তি করিয়া জনজীবনের মৌলিক চাহিদার হিসাব কষেন, তখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমীকরণটি আরও জটিল হইয়া পড়ে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ আছে, বাণিজ্য উপদেষ্টা নাগরিকদের দাবির বিষয়ে রাষ্ট্রের উদ্বৃত্তের কথা স্মরণে রাখিতে বলিয়াছেন এবং উদ্বৃত্ত না থাকিলে তাহাকে 'টিউমারের মতো সমস্যা' বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। রাষ্ট্রের আর্থিক শৃঙ্খলা রক্ষা করা নিঃসন্দেহে জরুরি। কিন্তু যখন সাধারণ মানুষের চাল কিনিতে হিমশিম খাইতে হয়, তখন ভীতিপ্রদ উপমা না দিয়া বরং বাজার তদারকি, সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি বিচ্যুতি দূর করা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য থামানোই কি অধিকতর শ্রেয় ছিল না? শৃঙ্খলা মানে কেবল নাগরিককে সংযত হওয়ার নসিহত দেওয়া নহে, শৃঙ্খলা মানে বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের সক্ষমতা প্রদর্শনও বটে।
পরিশেষে বক্তব্য এই যে, রাষ্ট্রের বৃহৎ প্রকল্পের দায় কিংবা আর্থিক সীমাবদ্ধতা অনস্বীকার্য হইতে পারে, কিন্তু তাহার ব্যাখ্যায় সাধারণের পাত থেকে ভাতের নিশ্চয়তাকে খাটো করিয়া দেখার সুযোগ নাই। পদ্মা সেতু আজ এক দৃশ্যমান বাস্তবতা। কিন্তু চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করিতে হইবে বাজারেই—সেতুর পিলারে বা বক্তৃতার মঞ্চে নহে। জনগণের কষ্টের লাঘব ঘটিতে পারে বাস্তবমুখী ও সাহসী পদক্ষেপের মাধ্যমে, রূপকথার মতো সরল কোনো গাণিতিক ছকে নহে।
২০ জানুয়ারি, ২০২৬
ধানমন্ডি, ঢাকা
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬