
আলী কদর পলাশ
পুলক চ্যাটার্জি আর কোনোদিন অফিসে ফিরবেন না। কোনো সংবাদ পাঠাবেন না। কোনো সহকর্মীকে ফোন করে বলবেন না, খবরটা একটু দেখে দিও। তাঁর জন্য অপেক্ষা করে থাকবে না বরিশালের কোনো সংবাদ সম্মেলন কিংবা প্রেসক্লাবের আড্ডা।
কিন্তু তাঁর একটি পাওনা ছিল।
১০ লাখ টাকা।
জীবিত পুলক সেই টাকা হাতে পাননি। মৃত্যুর তিন দিন পর তাঁর স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা চ্যাটার্জির ব্যাংক হিসাবে সেই টাকা পৌঁছে গেছে।
এই জায়গাটিতেই এসে মনটা ভারী হয়ে যায়।
যে টাকা একজন মানুষের প্রাপ্য ছিল, সেই টাকা তাঁর হাতে পৌঁছানোর জন্য তাঁর মৃত্যুর পর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলো কেন?
পুলক চ্যাটার্জি সমকালের বরিশাল ব্যুরোর প্রধান ছিলেন। দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করেছেন। বরিশাল প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন। ২০২৩ সালের মে মাসে সমকাল থেকে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এরপর দীর্ঘ সময় তিনি কর্মহীন ছিলেন। তাঁর ভাই সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, চাকরি হারানোর পর তিনি মানসিক কষ্টে ছিলেন।
শেষ পর্যন্ত সমকাল কার্যালয়ের ভেতরেই পাওয়া গেল তাঁর নিথর দেহ।
শার্টের বুকপকেটে ছিল পাঁচটি চিরকুট। স্ত্রী, সন্তান, ছোট ভাইয়ের জন্য কথা রেখে গেছেন। আর একটি চিরকুটে দীর্ঘদিনের সহকর্মীর কাছে অনুরোধ করেছেন, সমকালের কাছে তাঁর যে পাওনা রয়েছে, সেটি যেন উদ্ধার করে পরিবারের হাতে দেওয়া হয়।
ভাবতে কষ্ট হয়। একজন মানুষ পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার প্রস্তুতির মধ্যেও তাঁর পরিবারের ভবিষ্যতের কথা ভাবছেন। নিজের পাওনা টাকার কথা লিখে যেতে হচ্ছে। যেন মৃত্যুর দুয়ারেও তাঁর দায়িত্ব শেষ হয়নি।
তারপর যা ঘটল, সেটিই আমাদের আরও বেশি বিচলিত করে।
তাঁর মৃত্যুর তিন দিন পর সমকাল কর্তৃপক্ষ ১০ লাখ টাকা তাঁর স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবে জমা দিয়েছে।
অর্থাৎ পাওনাটি ছিল।
আমরা এখানে কোনো মানুষের মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করতে চাই না। আত্মহত্যা অত্যন্ত জটিল বিষয়। একটি মাত্র ঘটনা, একটি পাওনা কিংবা একটি কষ্ট দিয়ে তার ব্যাখ্যা করা দায়িত্বশীলতা নয়। পুলকের চিরকুটে অসুস্থতা, চিকিৎসা, কর্মহীনতা ও ব্যক্তিগত যন্ত্রণার কথাও পাওয়া গেছে। পুলিশও বলেছে, চিরকুটের সত্যতা এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনসহ সবকিছু যাচাইয়ের পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
কিন্তু একটি প্রশ্ন করার অধিকার আমাদের নিশ্চয়ই আছে।
যে ১০ লাখ টাকা মৃত্যুর তিন দিন পর দেওয়া সম্ভব হলো, সেই টাকা জীবিত পুলককে দেওয়া সম্ভব হলো না কেন?
এই প্রশ্ন শুধু পুলকের জন্য নয়।
আমাদের চারপাশে কত পুলক ঘুরে বেড়াচ্ছেন, আমরা কি তাঁদের খবর রাখি?
কেউ মাসের পর মাস বেতন পান না। কেউ চাকরি হারিয়ে বছরের পর বছর পাওনার জন্য ঘোরেন। কারও নিয়োগপত্র নেই। জেলা ও উপজেলায় এমন সাংবাদিকও আছেন, যাঁদের কাছে প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন সংবাদ চায়, ছবি চায়, ভিডিও চায়, কিন্তু মাস শেষে তাঁর ঘরে বাজার আছে কি না, অসুস্থ হলে ওষুধ কেনার টাকা আছে কি না, সন্তানের স্কুলের বেতন দিতে পারছেন কি না, তার খোঁজ খুব কম প্রতিষ্ঠানই রাখে।
অথচ একজন সাংবাদিকও মানুষ।
তাঁরও সংসার আছে। সন্তান আছে। অসুখ হয়। বাড়িভাড়া দিতে হয়। বাজার করতে হয়। সন্তানের মুখের দিকে তাকাতে হয়।
এই কথাটি আমরা যেন মাঝেমধ্যে ভুলে যাই।
পুলকের আগেও আমরা সাংবাদিকের আত্মহত্যার সংবাদ লিখেছি। ২০২৫ সালে প্রবীণ সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারের মরদেহ মেঘনা নদী থেকে উদ্ধার হয়েছিল। মৃত্যুর আগে লেখা তাঁর ‘খোলা চিঠি’তে পরিবার, অসুস্থতা, সন্তানের কর্মসংস্থান ও আর্থিক অসহায়তার কথা উঠে এসেছিল।
২০২২ সালে সাংবাদিক সোহানা পারভীন তুলির মৃত্যুর পর স্বজনেরা বলেছিলেন, কয়েক মাস ধরে কর্মহীন থাকায় তিনি হতাশায় ছিলেন। একই বছর সাংবাদিক শবনম শারমিনের মৃত্যু নিয়ে তাঁর পরিবার আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ তুলেছিল। ২০২৩ সালে তরুণ সাংবাদিক কুদরত ই খুদা হৃদয়, ২০২৪ সালে এনটিভির বার্তা সম্পাদক সীমান্ত খোকন, ২০২৫ সালে সাংবাদিক নেতা শাওন চক্রবর্তীসহ বিভিন্ন সময়ে আরও সাংবাদিকের আত্মহত্যা বা সন্দেহজনক আত্মহত্যার সংবাদ আমরা প্রকাশ করেছি।
প্রতিটি মানুষের গল্প আলাদা। প্রতিটি মৃত্যুর কারণও আলাদা। তাই তাঁদের সবাইকে একই বন্ধনীতে রাখা অন্যায় হবে।
কিন্তু মৃত্যুগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে আমরা একটি মিল দেখতে পাই। আমাদের পেশার অনেক মানুষের জীবন ভীষণ অনিরাপদ।
যে মানুষটি সারাদিন অন্য মানুষের দুঃখের সংবাদ লেখেন, কখনো কখনো তাঁর নিজের দুঃখের সংবাদ লেখার কেউ থাকে না।
এটাই বোধ হয় সবচেয়ে নির্মম সত্য।
আমরা সহকর্মীর মৃত্যু হলে শোকসভা করি। কালো ব্যাজ পরি। স্মৃতিচারণ করি। তাঁর সততা, নিষ্ঠা ও সাংবাদিকতার কথা বলি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরোনো ছবি দিয়ে লিখি, ‘ভালো থাকবেন ওপারে।’
কিন্তু মানুষটি যখন বেঁচে ছিলেন?
তখন কি একবার ফোন করেছিলাম?
জিজ্ঞেস করেছিলাম, ভাই, কেমন আছেন?
বেতন পেয়েছেন?
চিকিৎসাটা হচ্ছে?
সংসার চলছে?
পাওনাটা পেয়েছেন?
এই প্রশ্নগুলো মৃত্যুর পরে আর কোনো কাজে আসে না।
সংবাদপত্রের মালিক ও কর্তৃপক্ষের কাছেও তাই আমাদের আবেদন খুব সাধারণ। সাংবাদিকের পাওনা আটকে রাখবেন না। চাকরি শেষ হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাঁর বেতন, গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং চুক্তি অনুযায়ী সব পাওনা বুঝিয়ে দিন। এগুলো কোনো দয়া নয়। তাঁর শ্রমের মূল্য।
সাংবাদিক ইউনিয়ন ও প্রেসক্লাবগুলোর দায়িত্বও নতুন করে ভাবতে হবে। শুধু মৃত্যুর পরে শোকসভা নয়, জীবিত সহকর্মীর দুর্দিনে পাশে দাঁড়ানোর একটি ব্যবস্থা প্রয়োজন। কর্মহীন সাংবাদিক, অসুস্থ সাংবাদিক কিংবা গভীর মানসিক সংকটে থাকা সহকর্মী যেন অন্তত একটি দরজায় গিয়ে বলতে পারেন, আমি ভালো নেই।
পুলক চ্যাটার্জি আর ফিরবেন না।
তাঁর পাওনা ১০ লাখ টাকা পরিবারের কাছে পৌঁছেছে। হয়তো সেই টাকা এখন তাঁর স্ত্রী ও সন্তানের কোনো প্রয়োজন মেটাবে। কিন্তু যে মানুষটির শ্রমে সেই টাকা অর্জিত হয়েছিল, তিনি নিজের হাতে একটি টাকাও নিতে পারলেন না।
এই বেদনার সামনে বড় বড় কথা খুব অসহায় লাগে।
শুধু একটি প্রশ্ন থেকে যায়।
মৃত্যুর পরে যদি পাওনা দেওয়া যায়, জীবিত মানুষটির হাতে তা দেওয়া গেল না কেন?
আর একটি অনুরোধ।
আমাদের চারপাশে যে পুলকেরা এখনো বেঁচে আছেন, তাঁদের খোঁজটা অন্তত আজই নিই।





