ইউনিফর্মের আড়ালে মানুষ

Date:

spot_img

আলী কদর পলাশ

একজন পুলিশ কর্মকর্তার পরিচয় কি শুধু তাঁর ইউনিফর্ম? দীর্ঘ চাকরিজীবনে তিনি রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু সেই পোশাকের আড়ালে তাঁরও একটি পরিবার আছে। সন্তান আছে। সংসারের খরচ আছে। সামাজিক পরিচয় আছে। আছে আত্মমর্যাদা। হঠাৎ একটি প্রজ্ঞাপনে চাকরি শেষ হয়ে গেলে তাই শুধু একটি পদ শূন্য হয় না, একজন মানুষের গোটা জীবনও বদলে যায়।

দেশ রূপান্তরের একটি প্রতিবেদনে সেই অদেখা জীবনের কথাই উঠে এসেছে। বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়া একজন পুলিশ কর্মকর্তা নিজের সন্তানদের এখনো জানাননি যে তাঁর চাকরি নেই। প্রতিদিন আগের মতো অফিসের সময়ে বাসা থেকে বের হন, ফেরেন রাতে। সংসার চালাতে অল্প বেতনে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। সন্তানদের চোখে বাবা এখনো পুলিশ কর্মকর্তা। অথচ বাস্তবে তিনি নিজের পরিচয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে লড়ছেন।

একটি মানুষের সংকট বোঝাতে কখনো কখনো একটি ঘটনাই যথেষ্ট।

গত দুই বছরে পুলিশের বিভিন্ন স্তরের ১৩৫ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর তথ্য দিয়েছে পত্রিকাটি। অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের অনেকেই এখনো পিআরএলসহ অবসরোত্তর প্রাপ্য সুবিধা পাননি। চাকরি নেই, হাতে পাওনা অর্থও নেই। ফলে কারও সন্তানদের পড়াশোনা, কারও চিকিৎসা, কারও বাসাভাড়া কিংবা দৈনন্দিন সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কেউ গাড়ি বিক্রি করছেন, কেউ কম ভাড়ার বাসা খুঁজছেন, কেউ আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করছেন।

বাধ্যতামূলক অবসর নতুন কোনো ঘটনা নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগ তুলে কর্মকর্তাদের অবসরে পাঠানো হয়েছে, ওএসডি করে রাখা হয়েছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও একই অভিযোগ উঠেছে। বর্তমান সরকারের সময়েও সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। সরকার বদলায়, রাজনৈতিক পরিচয়ের তকমা বদলায়, কিন্তু তকমার নিচে চাপা পড়া মানুষটির দুর্ভোগ যেন একই থেকে যায়।

রাষ্ট্রের প্রয়োজনে এবং আইন অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার সুযোগ সরকারের রয়েছে। আবার কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হত্যা, নির্যাতন, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা গুরুতর পেশাগত অপরাধের অভিযোগ থাকলে অবশ্যই তদন্ত ও বিচার হতে হবে। অপরাধ করলে ইউনিফর্ম কাউকে রক্ষা করতে পারে না।

কিন্তু অপরাধের দায় আর রাজনৈতিক পরিচয়ের অনুমান এক নয়। কোনো সরকারের সময় গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা, কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অধীনে কাজ করা কিংবা কারও সঙ্গে পেশাগত সম্পর্ক থাকার কারণে একজন কর্মকর্তাকে রাজনৈতিকভাবে চিহ্নিত করা ন্যায়সংগত হতে পারে না। বিচার হতে হবে কাজের, পরিচয়ের নয়।

আর রাষ্ট্র যখন কাউকে অবসরে পাঠায়, তখন তাঁর আইনসম্মত পাওনা আটকে থাকার কোনো যুক্তি নেই। পিআরএল, পেনশন, গ্র্যাচুইটি ও অন্যান্য প্রাপ্য অর্থ কোনো অনুগ্রহ নয়। দীর্ঘ কর্মজীবনের বিনিময়ে অর্জিত অধিকার। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মূল্য একজন কর্মকর্তার পরিবারকে দিতে বাধ্য করা উচিত নয়।

পুলিশকে পেশাদার করতে হলে এই জায়গাটিতেই পরিবর্তন প্রয়োজন। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক পরিচয় খোঁজার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। অপরাধী হলে বিচার হবে। অযোগ্য হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা হবে। কিন্তু শুধু রাজনৈতিক তকমায় একজন মানুষের দীর্ঘ কর্মজীবন এবং তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা অনিশ্চিত করা রাষ্ট্রের জন্যও ভালো নজির নয়।

ইউনিফর্ম একদিন খুলে রাখতে হয়। পদও একদিন থাকে না। কিন্তু ইউনিফর্মের আড়ালের মানুষটি থেকে যান। তাঁর পরিবার থাকে, মর্যাদা থাকে, অধিকার থাকে। রাষ্ট্রকে সেই মানুষটির কথাও মনে রাখতে হবে।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

কমিশনার মামুনের পিতার মৃত্যুতে দোয়া মাহফিল

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর ও বংশাল থানা...

আগামী তিন বছরে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে: ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার

বাগেরহাট প্রতিনিধি আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশে এক লাখ নতুন...

খুলনায় ফুটপাত দখলমুক্ত করতে কেসিসির অভিযান, ভাঙা হলো অবৈধ দোকানপাট

খুলনা প্রতিনিধি খুলনা নগরীর ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ...

হোমনায় কৃষিজমি থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন, দুই ড্রেজার মালিককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা!

বিশেষ প্রতিনিধি কুমিল্লার হোমনা উপজেলার মাথাভাঙ্গা ইউনিয়নের ছয়ফুল্লাকান্দি এলাকায়...