
বিশেষ প্রতিবেদক
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন এক ভারসাম্যের আভাস ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। নয়াদিল্লিতে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি, ভারতের সঙ্গে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্বাক্ষরিত ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত এবং একই সময়ে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ভারতকে পেছনে ফেলে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসা, সাম্প্রতিক এই তিন ঘটনাই ঢাকার আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে এটিকে ভারত থেকে সরে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে পড়া হিসেবে দেখার সময় এখনো আসেনি। বরং সরকারের ঘোষিত ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আলোকে পুরোনো সম্পর্কগুলো নতুন করে যাচাই এবং বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য পুনর্নির্ধারণের চেষ্টা হিসেবেই ঘটনাগুলোকে দেখা যায়।
[caption id="attachment_13776" align="alignnone" width="1600"]
ছবি: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।[/caption]
ব্রিকসে গেল না বাংলাদেশ
ভারতের আয়োজনে নয়াদিল্লিতে ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বরের ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যোগ দেননি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অন্য কোনো সরকারি প্রতিনিধিও পাঠানো হয়নি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, আমন্ত্রণটি তারেক রহমানকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। তিনি একই সঙ্গে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর একটি বহুপক্ষীয় সম্মেলনে অংশগ্রহণের সফর হতে পারে না।
এর আগে ঢাকা জানিয়েছিল, প্রধানমন্ত্রীর পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরের জন্য ‘অনুকূল পরিবেশ’ প্রয়োজন। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, ভারতে তাঁর রাজনৈতিক তৎপরতা, সীমান্ত, অভিন্ন নদীর পানি এবং পারস্পরিক আস্থার মতো বিষয় এখনো দুই দেশের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।
ভারতীয় বিশ্লেষকেরাও ব্রিকসে বাংলাদেশের অনুপস্থিতিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সঞ্জয় কে ভরদ্বাজ Times of India-তে লিখেছেন, ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের একটি সুযোগ হতে পারত। ফলে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক বার্তা থাকলেও তার অর্থনৈতিক মূল্য নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
এবার পুরোনো চুক্তির হিসাব
ব্রিকস ঘিরে আলোচনার মধ্যেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনা করছে সরকার। এর ফল শিগগিরই জানানো হবে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের ব্যবস্থা বাতিল হতে পারে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবেও তিনি বলেছেন, সব চুক্তিই পর্যালোচনার আওতায় রয়েছে।
তবে সরকার এখনো কোনো নির্দিষ্ট চুক্তি বাতিল বা সংশোধনের ঘোষণা দেয়নি। চিফ হুইপ বরং বলেছেন, ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেই বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
ফলে বিষয়টির তাৎপর্য শুধু ১০১টি চুক্তির ভবিষ্যতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গত দেড় দশকে ভারত বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি, ট্রানজিট, বন্দর, রেল ও সড়ক যোগাযোগসহ বিভিন্ন খাতে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠেছে। সেই সম্পর্কের কাঠামোর কোন অংশ বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, ঢাকা এখন সেটিও নতুন করে যাচাই করছে।
অন্যদিকে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়নের এই সময়েই অর্থনীতিতে ঘটছে আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুনে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। ভারত নেমেছে তৃতীয় স্থানে। চীন অবশ্য বড় ব্যবধানে প্রথম অবস্থানে রয়েছে।
জুনে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের মোট বাণিজ্য ছিল ৩৪ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১৬ হাজার ৬৫ কোটি এবং ভারতের সঙ্গে ১৫ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা। বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের ৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে, ভারতের অংশ ৯ দশমিক ০২ শতাংশ।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, এটি এক মাসের বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের মধ্যে জানুয়ারি, এপ্রিল, মে ও জুন, চার মাসেই যুক্তরাষ্ট্র ভারতের চেয়ে এগিয়ে ছিল। ভারত দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ফেব্রুয়ারি ও মার্চে।
সম্পর্কেও ইতিবাচক বার্তা
বাণিজ্যের এই পরিবর্তনের পাশাপাশি ঢাকা ও ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগও বেড়েছে।
গত জুলাইয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ‘খুব ইতিবাচক দিকে’ এগোচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূতের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি জানান, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, অভিবাসন ও আঞ্চলিক বিষয় নিয়ে দুই দেশ সহযোগিতা আরও গভীর করতে চায়।
এর আগে ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা ও ওয়াশিংটন পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতেও পৌঁছায়। ফলে যুক্তরাষ্ট্র এখন শুধু বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি বাজার নয়, দ্বিপক্ষীয় মোট বাণিজ্যেও তার গুরুত্ব বাড়ছে।
তবে এই সম্পর্কের চ্যালেঞ্জও আছে। জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। আবার জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি প্রায় ১১ শতাংশ কমেছে। ফলে বাণিজ্যের অঙ্ক বাড়লেও ওয়াশিংটনের নীতিগত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতিকে আগের চেয়ে বেশি প্রভাবিত করছে।
দিল্লি থেকে ওয়াশিংটন নয়
এই পরিবর্তনকে সরলভাবে ‘ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে যাত্রা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার এখনো চীন। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগোলিক, নিরাপত্তা, নদী, সীমান্ত, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগের সম্পর্ক এমন যে, দিল্লিকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার বাস্তব সুযোগ নেই। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।
তাই ঢাকার সামনে মূল চ্যালেঞ্জ কোনো একটি শক্তিকে বেছে নেওয়া নয়। বরং ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মধ্যপ্রাচ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের দরকষাকষির সক্ষমতা বাড়ানো।
ব্রিকসে অনুপস্থিত থেকে ঢাকা দিল্লিকে একটি রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে। ১০১ চুক্তি পর্যালোচনার মাধ্যমে পুরোনো সম্পর্কের লাভ ক্ষতির হিসাব খুলেছে। একই সময়ে বাণিজ্যের বাস্তবতায় ওয়াশিংটনের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
এই তিন প্রবণতা শেষ পর্যন্ত একটি জায়গাতেই এসে মিলছে, বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন ভারসাম্য খুঁজছে।
সেই ভারসাম্য কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে একটি মৌলিক প্রশ্নের ওপর। ঢাকা কি বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় কোনো এক পক্ষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, নাকি সবার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ আদায় করতে পারবে? বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রনীতির আসল পরীক্ষা সেখানেই।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। নিউজ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬