
আলী কদর পলাশ
গ্রিনল্যান্ড—তুষারের নীরব প্রান্তর, যেখানে শব্দের চেয়ে দীর্ঘতর নীরবতা; যেখানে হিমবায়ুর গতি আছে, অথচ কূটনীতির গতি স্বভাবত ধীর। সেই প্রান্তরেই হঠাৎ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল শুল্কের অনল—বরফের দেশে আগুন, আর আগুনের উষ্ণতায় যে ধোঁয়া ওঠে, তাহা ছড়িয়ে পড়ে হাজার মাইল দূরের বাজারে, ঘরের হেঁশেলে, সাধারণ জনের দীর্ঘশ্বাসে। অতএব গ্রিনল্যান্ডের প্রসঙ্গ আর কেবল মানচিত্রের প্রান্তভূমি নহে; ইহা এখন বিশ্ব রাজনীতির এক নূতন মঞ্চ, যেখানে সংলাপের বদলে রসিদ, যুক্তির বদলে শতাংশ, আর মিত্রতার বদলে ট্যারিফ তালিকা প্রদর্শিত হয়।
এই মঞ্চের প্রধান অভিনেতা ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁহার কণ্ঠে কূটনীতির নরম স্বর কম, ঘোষণার তেজ অধিক। তিনি যেন বিশ্বকে বুঝাইতেছেন—আর্কটিকের ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা-ভাবনা যাহা দাবি করে, ইউরোপীয় মিত্রেরা তাহাতে ‘সহায়ক’ নহে; সুতরাং সহায়তার অভাব পূরণ করিবার উত্তম পন্থা—শুল্ক। যে কথা আগে রাষ্ট্রদূতের কক্ষে চায়ের পেয়ালায় মীমাংসিত হইত, তাহা এখন বন্দরের কাস্টমস কাউন্টারে সিলমোহরে নির্ধারিত হইবে। কূটনীতি—এখন যেন শব্দের শিল্প নহে; ইহা সংখ্যার কৌশল।
কূটনীতির দরবারে ‘শুল্ক’—নবতর ভাষার আবির্ভাব
বিশ্ব রাজনীতিতে চাপ প্রয়োগ নূতন নহে। কিন্তু চাপ প্রয়োগের ভাষা বদলাইতেছে—ইহাই নূতন। আগে ছিল: “আমরা উদ্বিগ্ন”, “আমরা নিন্দা করি”, “আমরা আলোচনা চাই”। এখন নূতন শব্দমালা: “কার্যকর হইবে অমুক তারিখে”, “হার হইবে দশ শতাংশ”, “পরবর্তী ধাপে পঁচিশ শতাংশ।” ভাষার এই পরিবর্তন নিছক শৈলী নয়; ইহা ক্ষমতার প্রদর্শন। কারণ, যখন রাষ্ট্র যুক্তি দিয়ে না—অঙ্ক দিয়ে কথা বলে, তখন তর্কের সুযোগ কমে; দরকষাকষি থাকে, কিন্তু তা নীতির নয়—দামের।
এই প্রহসনের এক আশ্চর্য বৈশিষ্ট্য আছে। “বৈশ্বিক নিরাপত্তা” শব্দটি শুনিতে মহৎ; কিন্তু তাহার প্রয়োগ যদি এমন হয় যে মিত্রদের উপর আর্থিক দণ্ড আরোপ করিয়াই নিরাপত্তার পথ প্রশস্ত করিতে হইবে—তবে নিরাপত্তা শব্দটি ক্রমে একখানা বহুব্যবহৃত সাইনবোর্ডে পরিণত হয়, যাহা যেকোনো দোকানের সামনে ঝুলাইলে দোকানদার লাভবান। অর্থাৎ, নিরাপত্তা তখন আর নীতির শুদ্ধ ধারণা নহে; ইহা হইয়া ওঠে সিদ্ধান্ত চাপাইবার এক সুবিধাজনক মোড়ক।
তুষার প্রান্তরের মালিকানা—মানচিত্র না বাণিজ্য?
গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গে বিশ্ব বহুদিন ধরিয়াই একপ্রকার অস্বস্তি বহন করিতেছে। বরফের দেশে সম্পদ আছে; ভূরাজনীতিতে অবস্থান আছে; ভবিষ্যতের নৌপথ ও সামরিক কৌশলে তাহার গুরুত্ব আছে। এইসব কথা সত্য হইলেও প্রশ্ন উঠিতেই পারে—এই গুরুত্বের নিষ্পত্তি কি কূটনীতির টেবিলে হইবে, না শুল্কের হাতুড়িতে? যাহা ক্রয়-বিক্রয়ের সামগ্রীর মতো উচ্চারিত হয়, তাহা রাষ্ট্রীয় মর্যাদার সাথে খাপ খায় কি না—ইহাই তো আধুনিক প্রহসনের সারকথা।
ধরা যাক, ইউরোপের কয়েকটি রাষ্ট্র এই ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছানুরূপ পথে হাঁটে না। তাহা হইলে কূটনীতি কি বলিত? “আসুন, আলোচনা করি; যৌথ নিরাপত্তার কাঠামো মজবুত করি।” কিন্তু শুল্কনীতি বলিতেছে: “আসুন, প্রথমে শাস্তি দিই; পরে আলোচনা করিব।” এইখানেই প্রহসনের হাস্যরস: আলোচনা হইবে শাস্তির পরে, অর্থাৎ তর্কের আগে রায়। ন্যায়ালয়ের ভাষায় ইহা এক প্রকার ‘পূর্বনির্ধারিত’ বিচার; আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ইহা এক প্রকার ‘দামি’ বন্ধুত্ব।
শুল্কের ধোঁয়া কার ঘরে ঢোকে
শুল্ক আরোপের সময় সাধারণভাবে বলা হয়—এটি বিদেশি উৎপাদককে আঘাত করিবে, বিদেশি সরকারকে চাপ দিবে। কিন্তু শুল্কের বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন—অধিকাংশ সময় ধাক্কাটি সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে আমদানিকারক, খুচরা বিক্রেতা, এবং শেষতঃ ভোক্তার উপর। অর্থাৎ, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক খেসারত দেয় জনসাধারণ; আর জনসাধারণের হাতে থাকে কেবল ব্যাখ্যা—“বৈশ্বিক নিরাপত্তা।” নিরাপত্তা তখন বাড়ির দরজায় তালা নয়; নিরাপত্তা হয়ে দাঁড়ায় বাজারের দামে অস্থিরতা সহ্য করিবার এক নৈতিক উপদেশ।
বিশ্ব রাজনীতি এই কারণে এক ‘নবতর প্রহসন’—কারণ, নীতির মঞ্চে ঘোষণা আসে উচ্চস্বরে, কিন্তু পরিণতির মঞ্চে হাঁপানি হয় নীরবে। রাষ্ট্রদূতের মুখে বাক্য জ্বলে, অথচ বাজারের মানুষ জ্বলে নীরবে—মূল্যস্ফীতির ধোঁয়ায়, অনিশ্চয়তার তাপে।
ইউরোপ-আমেরিকা টানাপোড়েন—বন্ধুত্বের রসিদ
ইউরোপ ও আমেরিকার সম্পর্ক ইতিহাসে বহু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ—যুদ্ধ, মন্দা, স্নায়ুযুদ্ধ, জোট, বাণিজ্য—সবকিছুর ভিতর দিয়াই এই সম্পর্ক চলিয়াছে। কিন্তু শুল্ককে যদি কূটনীতির প্রধান হাতিয়ার করা হয়, তবে সম্পর্কের ভাষা বদলায়। বন্ধুত্ব আর নীতিতে দাঁড়ায় না; দাঁড়ায় শর্তে। শর্তের ভাষা আবার সংক্ষিপ্ত—দশ শতাংশ, পঁচিশ শতাংশ। এমন সম্পর্ক ক্রমে নীতির বন্ধন কমাইয়া দেয়, হিসাবের বন্ধন বাড়াইয়া দেয়। হিসাবের বন্ধন শক্ত হলেও উষ্ণ নহে; উষ্ণতা ছাড়া বন্ধন টেকসই হয় কি না, ইতিহাসই সাক্ষ্য দিবে।
আরও একখানা আশঙ্কা এই যে, একবার এই পথটি প্রশস্ত হইলে, ভবিষ্যতে যেকোনো রাজনৈতিক মতানৈক্য শুল্কের ভাষায় অনুবাদ হইতে শুরু করিবে। আজ গ্রিনল্যান্ড, কাল অন্য কোনো অঞ্চল; আজ ইউরোপ, কাল অন্য কোনো মিত্র। পররাষ্ট্রনীতি তখন নীতির ধারাবাহিকতা হারাইয়া প্রতিশোধের ধারাবাহিকতায় পরিণত হয়। প্রতিশোধের সমস্যা এই—ইহার শেষ নেই; কেবল পালা বদলায়।
দক্ষিণ এশিয়ার পুরাতন অভিজ্ঞতা—নাম বদলায়, চাপ থাকে
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা স্মরণযোগ্য। বিশ্ব বাণিজ্যের খেলায় দক্ষিণ এশিয়া প্রায়ই দেখিয়াছে—বাজারে প্রবেশাধিকারের কাঁটাতার, শুল্ক-অশুল্ক বাধা, নিয়মের পুনর্বিন্যাস, আর বড় শক্তির “ফেয়ার” শব্দটির ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা। কখনো ইহা নিরাপত্তা, কখনো ইহা শৃঙ্খলা, কখনো ইহা পারস্পরিকতা—কিন্তু সারাংশ বহু সময় এক: চাপ। অতএব ইউরোপ আজ যে কৃশ ছায়া দেখিতেছে, দক্ষিণ এশিয়া তাহার ছায়া আগেও দেখিয়াছে—শুধু আলোর উৎস বদলাইয়াছে, ছায়া একই রকম দীর্ঘ।
এই তুলনা টানিবার অর্থ ইউরোপের দুর্ভোগকে ছোট করা নহে; বরং বিশ্ব রাজনীতির একটি কাঠামোগত সত্য দেখানো—ক্ষমতার ভাষা যখন “ট্যারিফ” হয়, তখন ভূগোল আলাদা থাকিলেও অভিজ্ঞতা মিলিত হয়। বিশ্বের দক্ষিণ ও উত্তরের ফারাক কিছুটা গলিতে শুরু করে, ঠিক তুষার প্রান্তরে আগুন লাগিলে যেমন বরফের চরিত্র বদলায়।
শেষ কথা—বরফের দেশে আগুন লাগাইয়া লাভ কার?
উপসংহার টানিতে গেলে বলা যায়: গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে শুল্ক-নীতির প্রয়োগ একদিকে যেমন শক্তির প্রদর্শন, অন্যদিকে তেমনি বিশ্ব রাজনীতির নৈতিকতার ক্ষয়। শক্তি দেখাইলে শাসন সহজ হয়, কিন্তু আস্থা কমে। আস্থা কমিলে জোট দুর্বল হয়, এবং জোট দুর্বল হইলে সেই ‘বৈশ্বিক নিরাপত্তা’—যাহার নামে শুল্ক বসানো—তাহাই দীর্ঘমেয়াদে অনিরাপদ হইতে পারে। এ যেন আগুন দিয়া বরফ গলানোর তাড়াহুড়া—বরফ গলিবে, কিন্তু তৎসঙ্গে জল বাড়িবে; জল বাড়িলে নৌকা ভাসিবে বটে, তবে ঢেউও বাড়িবে।
বিশ্ব রাজনীতির এই নবতর প্রহসনে হাস্যরস আছে—কারণ, বরফের দেশকে কেন্দ্র করিয়া করের ঝড় ওঠে; মিত্রতা পরীক্ষিত হয় শতাংশে; আর নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয় পণ্যের দামে। কিন্তু এই হাসির ভিতরে একখানা কঠিন সত্যও আছে—রাষ্ট্রের উচ্চারণ যতই গম্ভীর হউক, শুল্কের ফলাফল শেষতঃ জনজীবনে গিয়া পড়ে। অতএব তুষার প্রান্তরে শুল্কের অনল কেবল দূরের খবর নহে; ইহা আমাদের সময়ের এক দুঃসাহসী বাস্তবতা—যেখানে কূটনীতি হাসে কম, হিসাব হাসে বেশি; আর মানুষ হাসিতে ভুলে যায় যে, এই হাসির পিছনে আগুনের তাপ লুকায়িত।
১৯ জানুয়ারি, ২০২৬
ধানমন্ডি, ঢাকা
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬