
রংপুর ব্যুরো
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় ৭৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৫টিতেই দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। ফলে এসব বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিয়েছে। প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে কাউকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দিয়ে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজেদের নির্ধারিত শ্রেণিতে পাঠদান করতে গিয়ে ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকদের ওপর বাড়তি কাজের চাপ তৈরি হয়েছে। এতে একদিকে যেমন তাঁদের নিয়মিত পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক বিভিন্ন দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীদের পাঠদান, উপস্থিতি তদারকি, শিক্ষক-কর্মচারীদের কাজের সমন্বয় এবং দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনায় নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, তারাগঞ্জ উপজেলায় পাঁচটি ইউনিয়নে মোট ৭৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৩৫টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। এসব বিদ্যালয়ে বর্তমানে দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকরাই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা জানান, একটি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক শুধু প্রশাসনিক দায়িত্বই পালন করেন না, একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের সার্বিক শিক্ষা কার্যক্রমের সমন্বয়, শিক্ষক-কর্মচারীদের দায়িত্ব বণ্টন, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও শৃঙ্খলা তদারকি, অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ, বিভিন্ন সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন, সভা-সমাবেশ আয়োজন এবং দাপ্তরিক নথিপত্র সংরক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেন। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে প্রধান শিক্ষক না থাকলে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রমে চাপ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
একাধিক শিক্ষক বলেন, সহকারী শিক্ষক হিসেবে তাঁদের মূল দায়িত্ব শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করা। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পাওয়ার পর একই সঙ্গে প্রশাসনিক বিভিন্ন কাজও সামলাতে হয়। কোনো কোনো সময় দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত থাকলে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত তদারকি করা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চালিয়ে গেলে প্রশাসনিক কাজ পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
শিক্ষকদের মতে, ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী সহকারী শিক্ষকরা আন্তরিকতার সঙ্গে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা করছেন। তবে দীর্ঘদিন ধরে এভাবে দায়িত্ব পালন করতে হলে তাঁদের ওপর অতিরিক্ত মানসিক ও কর্মঘণ্টার চাপ পড়ে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও স্থায়ী প্রধান শিক্ষকের অভাব অনুভূত হয়। অভিভাবকরাও দ্রুত এ সমস্যার সমাধান দাবি করেছেন। তাঁদের ভাষ্য, একটি বিদ্যালয়ে নিয়মিত প্রধান শিক্ষক থাকলে শিক্ষকদের মধ্যে কাজের সমন্বয়, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও পড়াশোনার তদারকি এবং বিদ্যালয়ের সার্বিক ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।
দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাও কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ছে।অভিভাবকদের দাবি, শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি শক্তিশালী করতে বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক থাকার পাশাপাশি কার্যকর প্রশাসনিক নেতৃত্বও প্রয়োজন। তাই যেসব বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে, সেসব পদে দ্রুত নিয়োগ দেওয়া জরুরি।
তারাগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাগমা শিলভিয়া খান বলেন, “প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। অনেক সময় তাঁদের নির্দেশনা বাস্তবায়নেও জটিলতা তৈরি হয়।” তিনি আরও বলেন, “শিগগিরই তারাগঞ্জের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ৩৬ জন সহকারী শিক্ষক যোগদান করবেন। এতে শিক্ষক সংকট কিছুটা কমবে এবং শিক্ষা কার্যক্রমে গতি ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।”
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, সহকারী শিক্ষক যোগদান করলেও প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ পূরণ না হলে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সংকট পুরোপুরি কাটবে না। কারণ সহকারী শিক্ষক সংখ্যা বাড়লে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক সংকট কিছুটা কমতে পারে, কিন্তু বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নেতৃত্বের জন্য প্রয়োজন একজন নিয়মিত প্রধান শিক্ষক। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের ভিত্তি গড়ে ওঠে এই স্তরেই। তাই শিক্ষক সংকট ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে যাতে শিক্ষার্থীদের পাঠদানে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সে বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও সচেতন মহল। তাঁদের প্রত্যাশা, তারাগঞ্জ উপজেলার ৩৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শূন্য প্রধান শিক্ষকের পদ দ্রুত পূরণ করা হবে। এতে ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অতিরিক্ত দায়িত্বের চাপ কমবে, বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে এবং শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদানের পরিবেশ পাবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬