
বিশেষ প্রতিবেদক
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শুধু প্রধানমন্ত্রী নন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিনিধিও সম্মেলনে পাঠানো হচ্ছে না। সম্মেলনের মাত্র দুই দিন আগে ঢাকা তার অবস্থান পরিষ্কার করল।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বৃহস্পতিবার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিতে ভারতে যাচ্ছেন না এবং তাঁর পরিবর্তে বাংলাদেশের অন্য কোনো প্রতিনিধিও সম্মেলনে অংশ নেবেন না।
বিবিসি বাংলার লাইভ প্রতিবেদনে হুমায়ুন কবিরের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ভারতের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণটি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে দেওয়া হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অন্য কাউকে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানোর প্রশ্নও ওঠে না।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রশ্ন তোলেন, আমন্ত্রণ যখন বিমসটেক চেয়ারম্যানের জন্য, তখন বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে কি বিমসটেকের সেক্রেটারি জেনারেলকে পাঠানো হবে?
ঢাকার সিদ্ধান্ত তাই শুধু তারেক রহমানের দিল্লি না যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। কোনো প্রতিনিধিও না পাঠানোর সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ব্রিকস সম্মেলন থেকে কার্যত পুরোপুরি দূরে থাকছে।
আগেই থেমেছিল দিল্লি সফর
ব্রিকসে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত হঠাৎ আসেনি। এর প্রায় এক মাস আগেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় দিল্লি সফর আপাতত স্থগিত করেছিল ঢাকা।
১৬ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছিল, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের জন্য একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি করা প্রয়োজন। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম বলেছিলেন, সম্ভাব্য সফর নিয়ে দুই দেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে যোগাযোগ রাখলেও ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলন সেই প্রক্রিয়ার পরিবেশ নষ্ট করেছে।
ঢাকা একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনা ও অন্য পলাতকদের দ্রুত ফেরত পাঠানো এবং শহীদ শরীফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের অনুরোধ জানায়। বাংলাদেশ এসব বিষয়ে ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে বলেও তখন জানানো হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেদিন আরও বলেছিল, সার্বভৌম সমতা, জাতীয় মর্যাদা, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে প্রতিবেশীসহ সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এগিয়ে নিতে সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি অনুসরণ করবে।
আমন্ত্রণ ছিল দুটি
তারেক রহমানের জন্য ভারতের আমন্ত্রণ ছিল দুটি এবং দুটির চরিত্রও আলাদা।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ঢাকায় আসা ভারতের লোকসভা স্পিকার ওম বিড়লা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরের আমন্ত্রণ পৌঁছে দেন।
দ্বিতীয় আমন্ত্রণটি ছিল ব্রিকস সম্মেলনের জন্য। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য নয়। তাই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানকে ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে আমন্ত্রণ জানায় ভারত।
এই দুই আমন্ত্রণের কথা জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান তখন বলেছিলেন, সরকার এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
এর মধ্যেই দুই দেশের সংবাদমাধ্যমে আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে তারেক রহমান দিল্লি যেতে পারেন বলে খবর প্রকাশিত হয়। ঢাকায়ও সফরের প্রস্তুতির আভাস পাওয়া যাচ্ছিল।
কিন্তু ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়।
ত্রিবেদীর ঢাকা থেকে দিল্লি
১০ আগস্ট ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ করেন ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। বৈঠকে বাংলাদেশ শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার প্রত্যাশার কথা জানায়।
বৈঠকের পর ত্রিবেদী বলেন, তারেক রহমানের ভারত সফরের আমন্ত্রণ আগে থেকেই রয়েছে। ভারতের জনগণ ও প্রধানমন্ত্রী তাঁর সফরের অপেক্ষায় আছেন। দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যু থাকলেও ভালো সম্পর্ক উভয়ের জন্যই লাভজনক হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তাৎপর্যপূর্ণভাবে, তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দিল্লি গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন দীনেশ ত্রিবেদী। এতে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর নিয়ে জল্পনা আরও বেড়ে যায়।
কিন্তু ছয় দিনের মাথায়, ১৬ আগস্ট ঢাকা জানিয়ে দেয়, সফরের জন্য আগে ‘অনুকূল পরিবেশ’ প্রয়োজন।
অপেক্ষায় ছিল দিল্লি
তারপরও ভারতের পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে দিল্লিতে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ পেতে থাকে।
৪ সেপ্টেম্বর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল জানান, ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যোগ দেবেন কি না কিংবা তাঁর পরিবর্তে অন্য কেউ বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন কি না, সে বিষয়ে দিল্লির কাছে তখনো কোনো তথ্য নেই।
৮ সেপ্টেম্বরও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একই অবস্থান জানায়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ নিয়ে জানানোর মতো নতুন কোনো তথ্য নেই বলে জানানো হয়।
ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীও তারেক রহমানের ভবিষ্যৎ ভারত সফর নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেন এবং দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ বহাল থাকার কথা জানান।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্রিকস সম্মেলন সেই সফরের উপলক্ষ হচ্ছে না।
সম্পর্কে বড় বাধা শেখ হাসিনা
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শেখ হাসিনা ভারতে চলে যাওয়ার পর থেকেই ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ তাঁর প্রত্যর্পণ চেয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে অনুরোধ জানায়।
ভারতে অবস্থান করে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য ও সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ নিয়েও ঢাকা অসন্তোষ জানিয়েছে। বিশেষ করে ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে তাঁর সংবাদ সম্মেলনের ঘটনায় বাংলাদেশ কড়া প্রতিক্রিয়া জানায়।
ঢাকার বক্তব্য, শেখ হাসিনা ও অন্য পলাতকদের বিষয়ে ভারতের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সাড়া এখনো পাওয়া যায়নি।
এর সঙ্গে সীমান্ত, অভিন্ন নদীর পানি এবং পারস্পরিক আস্থার প্রশ্নও রয়েছে। ফলে সম্পর্ক নতুন করে সাজানোর চেষ্টা চললেও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অমীমাংসিত বিষয় দুই দেশের মধ্যে রয়ে গেছে।
দিল্লিতে বড় জমায়েত
ভারতের আয়োজনে নয়াদিল্লিতে বসছে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বরের এই সম্মেলনে আন্তর্জাতিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের বড় জমায়েত হচ্ছে।
সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসাসহ ব্রিকসের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসেরও উপস্থিত থাকার কথা।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বিশ্ববাণিজ্য, নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি নিরাপত্তা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় সহযোগিতা এবারের সম্মেলনের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।
বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য নয়। বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ভারত।
এখন নজর দ্বিপক্ষীয় সফরে
ব্রিকস সম্মেলনে না যাওয়ার অর্থ অবশ্য তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যাওয়া নয়।
দিল্লির দেওয়া পৃথক দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ এখনো বহাল। ভারতের হাইকমিশনারও সেই আমন্ত্রণের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
ফলে ব্রিকসের বহুপক্ষীয় মঞ্চে দেখা না হলেও এখন নজর থাকবে তারেক রহমানের পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরের দিকে। সেই সফরের আগে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের হস্তান্তর, সীমান্ত, অভিন্ন নদীর পানি এবং পারস্পরিক আস্থার প্রশ্নে কতটা অগ্রগতি হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
আগস্টে ঢাকা বলেছিল, দিল্লি সফরের জন্য ‘অনুকূল পরিবেশ’ প্রয়োজন। প্রায় এক মাস পর সেপ্টেম্বরে ব্রিকস সম্মেলনেও না যাওয়ার সিদ্ধান্ত এলো।
দিল্লির আমন্ত্রণের পর দীর্ঘ অপেক্ষা ও জল্পনার আপাতত অবসান ঘটল ঢাকার স্পষ্ট সিদ্ধান্তে।
ব্রিকসে প্রধানমন্ত্রী যাচ্ছেন না। বাংলাদেশের কোনো প্রতিনিধিও যাচ্ছে না।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬