গতকাল দৈনিক মুখপাত্র পত্রিকায় প্রকাশিত
মুরাদনগরের ঘটনাটি আমাদের সমাজকে আবারও কঠিন এক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। পারিবারিক সম্পর্ক—যেখানে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও দায়বদ্ধতার বন্ধন থাকার কথা—সেখানে সম্পদ ও হিসাবের দ্বন্দ্ব এমন নৃশংস রূপ নেবে, তা ভাবতেই মন কেঁপে ওঠে। গরু ভাগাভাগি ও হজের টাকা পরিশোধকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনার সৃষ্টি হলো, তার শেষ পরিণতি বাবার মৃত্যু এবং ছেলের পলায়ন—এটি শুধু একটি পরিবারের বিপর্যয় নয়। এটি আমাদের সামষ্টিক নৈতিকতার অবক্ষয়েরও এক করুণ প্রতিচ্ছবি।
এই ঘটনা আরও যন্ত্রণাদায়ক, কারণ এখানে বিরোধের বিষয়টি তাত্ত্বিকভাবে মীমাংসাযোগ্য ছিল। পিতা জীবদ্দশায় সন্তানদের সম্পদ বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, কেবল একটি শর্ত রেখে—হজের জন্য নির্ধারিত টাকা পরিশোধের পর গরুগুলো ভাগ হবে। অর্থাৎ তিনি চেয়েছিলেন তার ধর্মীয় কর্তব্য পালনে সন্তানরা ন্যূনতম দায়িত্ব পালন করবে, তারপর ভাগাভাগি হবে। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের বদলে গরু বিক্রির উদ্যোগ এবং এর পরিণতিতে সহিংসতা দেখায়—পরিবারের ভেতরে আস্থা, সংযম ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত কতটা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
আমরা প্রায়ই দেখি, উত্তরাধিকার বা যৌথ সম্পত্তির প্রশ্নে পরিবারে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। কিন্তু দ্বন্দ্ব থাকা মানেই সহিংসতা অনিবার্য নয়। সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন কথা বলা বন্ধ হয়, যুক্তি হারিয়ে যায়, এবং মানুষ নিজের ক্ষোভকে “অধিকার আদায়” বলে মনে করতে শুরু করে। পারিবারিক বিরোধে যারা দ্রুত উত্তেজিত হয়ে পড়ে, তাদের কাছে সহিংসতা কখনও কখনও ‘সমাধান’ মনে হয়। বাস্তবে সহিংসতা সমাধান নয়; এটি সম্পর্কের শেষটুকু ধ্বংস করে, পরিবারকে আজীবন অপরাধবোধ ও শোকের মধ্যে ফেলে দেয়।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে আসে। সমাজে অর্থনৈতিক চাপ, নেশা, মানসিক অস্থিরতা, পারিবারিক যোগাযোগের ঘাটতি—এসব মিলিয়ে ছোট বিষয়ও বড় সংঘাতে রূপ নেয়। অনেক বাড়িতে সম্পত্তি ভাগাভাগি নিয়ে দীর্ঘদিন চাপা ক্ষোভ জমে থাকে, আলোচনার সংস্কৃতি না থাকায় তা একদিন বিস্ফোরিত হয়। এ ক্ষেত্রে পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় সমাজব্যবস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো মধ্যস্থতা, বড়দের উপস্থিতিতে লিখিত সমঝোতা, সম্পদের স্বচ্ছ হিসাব এবং নিয়মিত পারিবারিক আলোচনা—এগুলোকে আমরা অবহেলা করি বলেই এমন ট্র্যাজেডির সংখ্যা কমছে না।
আইনের দায়িত্ব অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনা। কিন্তু সমাজের দায়িত্ব আরও বিস্তৃত—এমন অপরাধের পরিবেশ তৈরি হওয়ার আগেই প্রতিরোধ গড়ে তোলা। পরিবারে সন্তানদের মূল্যবোধ শেখানো, রাগ নিয়ন্ত্রণের শিক্ষা, পারিবারিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা, এবং দ্বন্দ্বে শান্তিপূর্ণ সমাধানের চর্চা—এসবের কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে বাবা-মা ও সন্তানের সম্পর্ক যেন সম্পদের হিসাবের কাছে পরাজিত না হয়, সে ব্যাপারে সামাজিকভাবে সতর্কতা তৈরি করতে হবে।
মুরাদনগরের এই ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—সম্পদ মানুষের জন্য, মানুষ সম্পদের জন্য নয়। গরু, টাকা, জমি—কোনোটিই একটি প্রাণের মূল্য নয়, পিতার জীবনের তো নয়ই। পরিবারকে আবার মানবিকতার পাঠশালা হিসেবে দাঁড় করাতে না পারলে, আমাদের চারপাশে এমন হৃদয়বিদারক শোক আরও বাড়বে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬