মনিরামপুরে থমকে গেছে একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কার্যক্রম, উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়েও প্রশ্ন

Date:

spot_img

সুমন চক্রবর্তী, বিশেষ প্রতিনিধি

একসময় সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে সরব ছিল যশোরের মনিরামপুর উপজেলা। রক্ত সংগ্রহ ও সরবরাহ, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, দুর্যোগে ত্রাণ বিতরণসহ নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিল বেশ কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। তরুণদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এসব সংগঠন বিপদের সময়ে মানুষের ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছিল।

তবে সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। একের পর এক সংগঠনের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে যুবদূত, ফ্রেন্ড সাকেল ব্লাড ফাউন্ডেশন, আলো ছায়া উন্নয়ন সংস্থা, ঐক্যবদ্ধনসহ হাতে গোনা কয়েকটি সংগঠন সক্রিয় থাকলেও রক্ত নিয়ে নিয়মিত কাজ করছে না কোনো সংগঠনই।

এর আগে মনিরামপুরে অভেদ রক্ত দান সংস্থা, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা,কলম কথা ফাউন্ডেশন, প্রত্যয়, মাতৃবন্ধন, দয়িতা ফাউন্ডেশনসহ একাধিক সংগঠন বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিল। সময়ের সঙ্গে এসব সংগঠনের অধিকাংশই কার্যক্রম হারিয়ে বিলুপ্ত বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে।

ফলে জরুরি প্রয়োজনে রক্তের জন্য এখন মানুষকে ছুটতে হচ্ছে ব্যক্তিগত পরিচিতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা বিচ্ছিন্ন স্বেচ্ছাসেবকদের কাছে। একসময় যে কাজটি সংগঠিতভাবে করা হতো, সেটিই এখন অনেকটা ব্যক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সংগঠনগুলোর কার্যক্রম কমে যাওয়ার পেছনে রয়েছে নানা কারণ। সাধারণ মানুষের অসচেতনতা, স্বেচ্ছাসেবকদের অবমূল্যায়ন, রক্তদাতাদের যথাযথ মূল্যায়ন না করা, সাংগঠনিক ও আর্থিক সহযোগিতার অভাব এবং বিভিন্ন সময়ে সামাজিক সংগঠনকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের অভিযোগ এর মধ্যে অন্যতম।

রক্ত নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা স্বেচ্ছাসেবকদের অভিজ্ঞতায় সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে মানুষের সহযোগিতার অভাবে। যুবদূতের প্রতিষ্ঠাতা কাজী শরিফ মাহমুদ প্রায় চার বছর রক্তসেবার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এ সময়ে শত শত মানুষকে রক্ত পেতে সহযোগিতা করেছেন তিনি। তাদের বড় একটি অংশ ছিলেন প্রসূতি রোগী।

কাজী শরিফ মাহমুদ বলেন, জরুরি সময়ে স্বজনরা ফোন করে দ্রুত রক্তের ব্যবস্থা করে দিতে অনুরোধ করেন। এরপর একজন স্বেচ্ছাসেবককে একাধিক সম্ভাব্য রক্তদাতার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়, হাসপাতালে পাঠাতে হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে নিজের অর্থ ও সময় ব্যয় করতে হয়।
তার প্রশ্ন, গর্ভাবস্থার নয় মাসে পরিবার যদি রক্তের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন থাকে, তাহলে শেষ মুহূর্তে কেন পুরো দায়িত্ব একজন স্বেচ্ছাসেবকের ওপর এসে পড়ে?
শরিফ মাহমুদের অভিজ্ঞতায়, এক ব্যাগ রক্তের জন্য কখনো ১০ থেকে ১৫ জন পর্যন্ত ডোনারকে ফোন করতে হয়েছে। অথচ রক্তদাতার যাতায়াত খরচ, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা কিংবা সামান্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ক্ষেত্রেও অনেক পরিবার অনাগ্রহ দেখিয়েছে।
তার ভাষায়, “একজন মানুষ আপনার আপনজনের জন্য নিজের শরীরের রক্ত দিল, তার প্রতি ন্যূনতম কৃতজ্ঞতাটুকুও কি আপনার নেই?”

তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের এমন অভিজ্ঞতায় অনেক নিয়মিত রক্তদাতাও এখন আগ্রহ হারিয়েছেন। অন্যদিকে যারা নিজের অর্থ, সময় ও শ্রম দিয়ে সংগঠন পরিচালনা করেন, তাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো সামাজিক উদ্যোগও খুব সীমিত।
শরিফ মাহমুদের বক্তব্য, বিপদের সময় মানুষ স্বেচ্ছাসেবকদের কাছে রক্ত চাইলেও সংগঠনগুলোকে নিয়মিতভাবে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব নিতে চান না অনেকেই। অথচ কোনো সংগঠনকে ৫০০ বা ১ হাজার টাকা সহায়তা করে ‘কাজটা চালিয়ে যান’ এমন উদ্যোগও খুব কম দেখা যায়।

তার এই অভিজ্ঞতা মূলত একটি বড় বাস্তবতাকেই সামনে আনে, রক্তসেবা শুধু ডোনার খুঁজে দেওয়ার কাজ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সময়, শ্রম, যোগাযোগ, যাতায়াত ও অর্থনৈতিক ব্যয়। এসবের ধারাবাহিক চাপ একজন ব্যক্তির পক্ষে দীর্ঘদিন বহন করা কঠিন।

ফ্রেন্ড সার্কেল ব্লাড ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সোহেল হোসেনও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। একসময় সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবকেরা নিয়মিত ডোনার নিয়ে যশোরসহ বিভিন্ন স্থানে ছুটেছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন কাজ করতে গিয়ে সহযোগিতার চেয়ে উপহাস ও অবমূল্যায়নের অভিজ্ঞতাই বেশি হয়েছে বলে তার দাবি।

এ কারণে তারা এখন নিয়মিতভাবে রক্তসেবায় যুক্ত হন না। কারও প্রয়োজন হলে তাকে নিজেকেই রক্তদাতা খুঁজে নেওয়ার পরামর্শ দেন। তবে বিবেকের তাড়নায় জরুরি কিছু ক্ষেত্রে এখনো রক্তের ব্যবস্থা করেন তারা।

এই হতাশা শুধু দুটি সংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অতীতে মনিরামপুরে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন স্বেচ্ছাশ্রমে রক্তসেবা, ত্রাণ, চিকিৎসা সহায়তা, শিক্ষা ও মানবিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করলেও ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি।

সামাজিক সংগঠনগুলোর নিষ্ক্রিয়তার পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টিও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অতীতে কিছু সংগঠন সরাসরি রাজনৈতিক নেতাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সামাজিক কর্মকাণ্ডের ব্যানারে আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচিতে কখনো কখনো সংগঠনের কার্যক্রমের চেয়ে রাজনৈতিক নেতাদের ছবি ও পরিচয় বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

এর ফলে সংগঠনগুলোর নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছু সংগঠন তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি ধরে রাখতে পারেনি বলেও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।

বিশেষ করে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর যেসব সংগঠন দীর্ঘদিন রাজনৈতিক পরিচয় বা পৃষ্ঠপোষকতার ওপর নির্ভরশীল ছিল, তাদের একটি অংশ নতুন বাস্তবতায় নিজেদের পুনর্গঠন করতে পারেনি। ফলে সংগঠনগুলোর কার্যক্রমও ধীরে ধীরে থমকে গেছে।

সামাজিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রম কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, মনিরামপুর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব ও সহযোগিতা দেওয়া হয় না।

কলম কথা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সুমন চক্রবর্তী বলেন, একটি উপজেলায় দুর্যোগ, অগ্নিকাণ্ড, দুর্ঘটনা, রক্তের প্রয়োজন কিংবা অসহায় মানুষের সহায়তায় স্থানীয় সংগঠনগুলো দ্রুত কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় থাকলে এই সক্ষমতা আরও বাড়ানো সম্ভব।
তবে উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতার পাশাপাশি সংগঠনগুলোর নিজেদের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ আস্থা তৈরি না হলে প্রশাসন, সাধারণ মানুষ কিংবা অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি সাপোর্ট পাওয়া সম্ভব নয়।

এব্যাপারে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ সম্রাট হোসেন বলেন, আমরা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের গঠনমূলক, সমাজ সচেতনতামূলক ও অন্যান্য ভালো কাজকে উৎসাহিত করি। ভালো কাজের পাশে সবাইকে দাড়ানো উচিত, সহযোগিতা করা উচিত যার যার অবস্থান থেকে।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

কমেছে সোনার দাম, ভরিতে ২ হাজার ২১৬ টাকা

দেশের বাজারে সোনার দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স...

ফুলবাড়ি ব্যাটালিয়ন কর্তৃক নেশা জাতীয় ট্যাবলেট আটক

ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি ফুলবাড়ী ব্যাটালিয়ন (২৯ বিজিবি) কর্তৃক ৪০,০০০/টাকা...

কোটচাঁদপুরে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বর্ণাঢ্য র‍্যালি ও শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত

​কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ৪৮তম...

গৌরনদীতে বাস ও লরির মুখোমুখি সংঘর্ষ: নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাস খাদে, উদ্ধার ৫

​গৌরনদী (বরিশাল) প্রতিনিধি বরিশালের গৌরনদী উপজেলার খাঞ্জাপুর এলাকায় যাত্রীবাহী বাস...