
বিশেষ প্রতিবেদক
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাস একই সঙ্গে তিনটি নেতৃত্বের ইতিহাস। জিয়াউর রহমানের হাতে দলের জন্ম, খালেদা জিয়ার হাতে তার গণভিত্তির বিস্তার এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ বিরোধী অধ্যায় পেরিয়ে আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন। তিনজনের সময়, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং নেতৃত্বের ধরন ভিন্ন। কিন্তু একটির সঙ্গে আরেকটির যোগসূত্রেই গড়ে উঠেছে আজকের বিএনপি।
জিয়া: একটি রাজনৈতিক ধারার নির্মাণ
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। স্বাধীনতার পর অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাঁর সামনে ছিল একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার চেষ্টা। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রে রেখে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক মত ও পেশার মানুষকে একটি দলের মধ্যে আনেন।
জিয়ার নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য ছিল রাষ্ট্রক্ষমতার ভেতর থেকে রাজনৈতিক সংগঠন নির্মাণ। তাঁর ১৯ দফায় উৎপাদন, স্বনির্ভরতা, কৃষি, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয় গুরুত্ব পায়। কিন্তু দল প্রতিষ্ঠার মাত্র তিন বছরের মধ্যে ১৯৮১ সালে তাঁর হত্যাকাণ্ড বিএনপিকে গভীর নেতৃত্ব সংকটে ফেলে দেয়।
সেখানেই শুরু হয় দ্বিতীয় অধ্যায়।
খালেদা: দল থেকে আন্দোলনের নেতৃত্ব
রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার আগমন পরিকল্পিত রাজনৈতিক জীবনের ধারাবাহিকতা ছিল না। স্বামীর মৃত্যুর পর প্রথমে তিনি দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৮৪ সালে বিএনপির চেয়ারপারসন হওয়ার পর তাঁর সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল দলকে টিকিয়ে রাখা এবং সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।
এই জায়গাতেই বিএনপির চরিত্রে বড় পরিবর্তন আসে। রাষ্ট্রক্ষমতার ভেতরে জন্ম নেওয়া দলটি খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে হয়ে ওঠে রাজপথের বিরোধী দল।
এরশাদবিরোধী আন্দোলন তাঁকে জাতীয় রাজনীতির সামনের সারিতে নিয়ে আসে। ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিজয় এবং খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রী হওয়া ছিল দলটির দ্বিতীয় বড় উত্থান। তাঁর সরকারের সময় বাংলাদেশ আবার সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় ফিরে যায়।
পরবর্তী দেড় দশকে ক্ষমতা এবং বিরোধী দল, দুই ভূমিকাতেই বিএনপির কেন্দ্র ছিলেন খালেদা জিয়া। ২০০১ সালে দল আবার ক্ষমতায় আসে। কিন্তু ২০০৬ সালের পর বিএনপির সামনে শুরু হয় দীর্ঘ ও কঠিন রাজনৈতিক অধ্যায়। মামলা, গ্রেপ্তার, নির্বাচন নিয়ে সংঘাত এবং সাংগঠনিক চাপের মধ্যেও খালেদা জিয়া দলের সবচেয়ে বড় ঐক্যের প্রতীক হয়ে থাকেন।
২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিদায় ছিল না, বিএনপির একটি দীর্ঘ যুগেরও সমাপ্তি ছিল।
তারেক: দূর থেকে নেতৃত্ব, পরে ক্ষমতার কেন্দ্রে
তারেক রহমানের রাজনৈতিক উত্থান অন্য দুই নেতৃত্বের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতিতে।
দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার পর ২০০৯ সালে তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দলের কার্যত নেতৃত্ব তাঁর হাতে আসে। কিন্তু তখন তিনি দেশে ছিলেন না। লন্ডন থেকে দীর্ঘ সময় একটি বড় রাজনৈতিক দল পরিচালনার বিরল বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে।
এই সময় বিএনপি ক্ষমতার বাইরে। দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী মামলা ও গ্রেপ্তারের মুখে। নির্বাচনী রাজনীতি নিয়েও গভীর সংকট। ফলে তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রথম পর্ব ছিল মূলত দলকে ধরে রাখা, সাংগঠনিক যোগাযোগ বজায় রাখা এবং সরকারবিরোধী আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণের সময়।
প্রায় ১৭ বছর পর ২০২৫ সালের শেষ দিকে দেশে ফেরেন তিনি। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন।
এরপর দ্রুত বদলে যায় তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা।
ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির বিপুল বিজয়ের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। যে নেতা দীর্ঘদিন বিদেশ থেকে বিরোধী দল পরিচালনা করেছেন, তিনিই এখন সরকার এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে।
তিন যুগের সবচেয়ে বড় পার্থক্য
জিয়াউর রহমানের পরীক্ষা ছিল দল তৈরি করা।
খালেদা জিয়ার পরীক্ষা ছিল সেই দলকে টিকিয়ে রাখা, আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া এবং নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় নেওয়া।
তারেক রহমানের পরীক্ষা আরও আলাদা। তাঁকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া একটি বড় রাজনৈতিক দলকে শুধু নির্বাচনে জেতালেই হবে না, আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনায় কার্যকরও প্রমাণ করতে হবে।
কারণ সময় বদলেছে। আজকের ভোটার শুধু রাজনৈতিক পরিচয় দেখে না। তরুণ প্রজন্ম কাজ চায়, উদ্যোক্তা ব্যবসার পরিবেশ চান, সাধারণ মানুষ দ্রব্যমূল্যে স্বস্তি চান, নাগরিক চান নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবের বাইরে রাখার দাবিও এখন অনেক বেশি জোরালো।
তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রকৃত মূল্যায়ন তাই বিএনপির অতীত দিয়ে হবে না। হবে তাঁর সরকারের ফল দিয়ে।
৪৮ বছরে বিএনপির নেতৃত্ব তিন প্রজন্ম অতিক্রম করেছে। প্রতিষ্ঠাতা জিয়ার রাজনৈতিক ধারণা, খালেদা জিয়ার আন্দোলননির্ভর গণভিত্তি এবং তারেক রহমানের বর্তমান ক্ষমতাসীন নেতৃত্ব মিলে দলটির দীর্ঘ ইতিহাস।
কিন্তু ইতিহাস উত্তরাধিকার দেওয়া যায়, সাফল্য নয়।
জিয়া একটি দল রেখে গেছেন, খালেদা সেই দলকে দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে বহন করেছেন। এখন তারেক রহমানের সামনে পরীক্ষা, সেই রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে রাষ্ট্র পরিচালনার সাফল্যে রূপ দেওয়া।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬