আলী কদর পলাশ
দেশের রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারে এখন একই সঙ্গে দুটি বড় ঘটনা সামনে। একদিকে ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন, অন্যদিকে গণভোটকে ঘিরে রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি ও প্রচারণা। এমন সংবেদনশীল সময়ে জনসচেতনতা তৈরি করা যেমন জরুরি, তেমনি সেই সচেতনতা তৈরির পদ্ধতি, ভাষা এবং আচরণবিধির নিরপেক্ষতা আরও বেশি জরুরি। কারণ ভোট কিংবা গণভোট—উভয় ক্ষেত্রেই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় পুঁজি জনগণের আস্থা।
সরকারের পক্ষ থেকে গণভোট বিষয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক কর্মসূচি চলমান থাকার তথ্য এসেছে। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ এবং বেসরকারি সংগঠনের প্রতিনিধিদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে; বিভাগীয় কর্মকর্তা সম্মেলন ও ইমাম সম্মেলনের মতো আয়োজনও করা হচ্ছে। বিভাগভিত্তিক মতবিনিময় ও ইমাম সম্মেলনের তারিখও নির্ধারিত হয়েছে। এ ধরনের কাঠামোবদ্ধ উদ্যোগ গণভোট সম্পর্কে তৃণমূলে অস্পষ্টতা দূর করতে সহায়ক হতে পারে, বিশেষত যখন অনেক ভোটার নতুন প্রক্রিয়া, প্রশ্নের ভাষা, ভোটদানের নিয়ম এবং ফলাফলের তাৎপর্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পান না।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে: সচেতনতা তৈরি আর পক্ষভিত্তিক আহ্বানের সীমারেখা কোথায়। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ফটোকার্ড প্রকাশের খবরও রয়েছে। রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক প্রচারণা যখন একই সময়-পরিসরে চলতে থাকে, তখন প্রশাসনের দায়িত্ব আরও সূক্ষ্ম হয়ে যায়। জনসচেতনতা কার্যক্রম যদি নিরপেক্ষ তথ্যভিত্তিক না হয়ে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে প্রভাবিত করার ভাষা নেয়, তাহলে তা নাগরিকদের আস্থা ক্ষুণ্ন করতে পারে এবং পুরো প্রক্রিয়াকেই বিতর্কিত করে তুলতে পারে। গণভোটের প্রশ্ন, প্রাসঙ্গিক প্রেক্ষাপট, সম্ভাব্য প্রভাব, ভোটদানের নিয়ম—এসব তথ্য জনগণকে জানানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু কোন উত্তরকে ‘সঠিক’ বা ‘গ্রহণযোগ্য’ হিসেবে প্রচার করা গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বিশেষ করে ধর্মীয় নেতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এনজিও বা প্রশাসনিক কাঠামোকে যদি প্রচারণার বাহক হিসেবে দেখা যায়, তাহলে ভিন্নমতাবলম্বীদের মধ্যে ভয়, চাপ কিংবা প্রান্তিকতার অনুভূতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
নির্বাচন কমিশনে মনোনয়ন গ্রহণ ও বাতিলের বিরুদ্ধে টানা তৃতীয় দিনের মতো আপিল শুনানি চলা এই মুহূর্তের আরেকটি বড় ইঙ্গিত। নির্বাচনকে প্রতিযোগিতামূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাখতে মনোনয়ন যাচাই, আপিল গ্রহণ, শুনানি, সিদ্ধান্ত—সব ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান ন্যায্যতা দরকার। কাগজে-কলমে আইন মানার চেয়েও বড় হলো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, সময়ানুবর্তিতা এবং সিদ্ধান্তের যুক্তি জনসমক্ষে বোধগম্য হওয়া। প্রার্থী, দল, সমর্থক—সবার জন্য একই মানদণ্ড প্রয়োগ না হলে নির্বাচনের মাঠ আগেভাগেই অসম হয়ে পড়ে। তাই আপিল শুনানি যেভাবে চলছে, তার প্রতিটি ধাপে তথ্যপ্রবাহ উন্মুক্ত রাখা, সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা স্পষ্ট করা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তিতে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা নির্বাচন কমিশনের জন্য অপরিহার্য দায়িত্ব।
এই সময়ে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা টানা কয়েক দিন পঞ্চগড়ে থাকার সংবাদ আমাদের আরেকটি বাস্তবতার দিকে নজর দেয়। নির্বাচন ও গণভোটের উত্তাপে জনজীবনের মৌলিক সংকট যেন আড়ালে না যায়। শীতপ্রবাহে শ্রমজীবী মানুষ, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থরা সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েন। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন—সবাইকে নিয়ে শীতবস্ত্র, আশ্রয়, চিকিৎসা সহায়তা, ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যসেবা এবং রাতের জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। গণতন্ত্রের শক্তি কেবল ব্যালটে নয়, দুর্যোগ ও কষ্টের সময় রাষ্ট্র-সমাজ কতটা পাশে দাঁড়াতে পারে তাতেও মাপা হয়।
একই সঙ্গে ঢাকায় মালদ্বীপের প্রতিনিধি দল আসার খবর শিক্ষা কূটনীতির সম্ভাবনার কথাও মনে করিয়ে দেয়। দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সম্পর্কের ভাষা এখন কেবল নিরাপত্তা বা বাণিজ্যে সীমিত নয়; শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা সহযোগিতা, জলবায়ু অভিযোজন, পর্যটন ব্যবস্থাপনা—এসব ক্ষেত্রও কূটনীতির কার্যকর সেতু। এ ধরনের সফর যদি কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষার্থী বিনিময়, যৌথ প্রশিক্ষণ, স্কলারশিপ, কারিগরি শিক্ষা ও সামুদ্রিক-বিষয়ক গবেষণায় বাস্তব চুক্তিতে রূপ নেয়, তবে তা দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে দেশ এখন এমন এক মোড়ের সামনে দাঁড়িয়ে, যেখানে একটি প্রক্রিয়ার সাফল্য অন্যটির ওপরও প্রভাব ফেলবে। গণভোট ও নির্বাচন—দু’টিই যদি বিশ্বাসযোগ্য হতে হয়, তবে রাষ্ট্রের সব পক্ষকে কয়েকটি নীতি মানতে হবে। জনসচেতনতা হবে তথ্যভিত্তিক, ভয় দেখানো বা প্রলোভনমুখী নয়। প্রচারণা হবে আচরণবিধি-সম্মত, প্রশাসনের ভূমিকা হবে কঠোরভাবে নিরপেক্ষ। নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম হবে স্বচ্ছ, ব্যাখ্যাযোগ্য এবং সময়মতো। আর জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে মানুষের জীবন-জীবিকা ও নিরাপত্তা, যাতে রাজনৈতিক কর্মসূচির ভিড়ে শীতার্ত পঞ্চগড়ের মানুষ কিংবা শিক্ষা-উন্নয়নের সুযোগ হারিয়ে না যায়।
রাষ্ট্রের শক্তি শেষ পর্যন্ত ভোটাধিকারকে সম্মান করার মধ্যেই। নাগরিকের সিদ্ধান্ত যেন মুক্ত, তথ্যসমৃদ্ধ ও ভয়ের বাইরে থাকে—এই নিশ্চয়তা দিতে পারলেই গণভোট ও নির্বাচন দুটোই সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক উৎসবে পরিণত হবে।
১২ জানুয়ারি, ২০২৬
ধানমন্ডি, ঢাকা।
লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক দৈনিক এই আমার দেশ, THE BUSINESS in Magazine, প্রধান সম্পাদক দৈনিক মুখপাত্র
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬