নিজস্ব প্রতিবেদক : মুসলিম পারিবারিক আইন ও বাংলাদেশের প্রচলিত সামাজিক ধারণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত মোড় নিয়েছে সাম্প্রতিক এক হাইকোর্টের রায়। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ছিল—প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া মুসলিম পুরুষ দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবেন না। তবে হাইকোর্টের সাম্প্রতিক রায়ে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে স্ত্রীর অনুমতি বাধ্যতামূলক নয়; বরং বিষয়টি নির্ভর করবে আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতির ওপর।
এই রায়ের ফলে মুসলিম পারিবারিক আইন ব্যাখ্যায় একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত হলো, যা সামাজিক ও আইনি অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
কী বলেছেন হাইকোর্ট
মুসলিম পারিবারিক আইন সংক্রান্ত একটি রিট আবেদনের শুনানি শেষে হাইকোর্ট তার ২৪ পাতার পূর্ণাঙ্গ রায়ে উল্লেখ করেন—
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১–এ কোথাও স্পষ্টভাবে বলা নেই যে দ্বিতীয় বিয়ের জন্য প্রথম স্ত্রীর লিখিত বা মৌখিক অনুমতি আবশ্যক। বরং আইন অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতিই চূড়ান্ত ও আইনসম্মত ভিত্তি।
আদালত আরও বলেন, সামাজিকভাবে প্রচলিত অনেক ধারণা আইন হিসেবে বিবেচ্য নয়। আইনের স্পষ্ট ভাষ্য ও বিধানই বিচারিক সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি।
প্রচলিত ধারণা বনাম আইনি বাস্তবতা
এতদিন সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন ধারণা প্রচলিত ছিল যে, প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে তা সরাসরি অবৈধ এবং গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। অনেক ক্ষেত্রে এই ধারণা থেকেই সামাজিকভাবে পুরুষদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হতো।
তবে হাইকোর্টের মতে, মুসলিম পারিবারিক আইনে স্ত্রীর অনুমতিকে শর্ত হিসেবে আরোপ করা হয়নি। বরং স্ত্রীর মতামত আরবিট্রেশন কাউন্সিল বিবেচনায় নিতে পারে—কিন্তু সেটি বাধ্যতামূলক অনুমতির পর্যায়ে পড়ে না।
দণ্ডবিধি ও মুসলিম পারিবারিক আইনের ব্যাখ্যা
বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪৯৪ ধারা অনুযায়ী, জীবিত স্বামী বা স্ত্রী থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করলে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে মুসলিমদের ক্ষেত্রে এই ধারার প্রয়োগ পরবর্তীতে সীমিত করা হয়।
১৯৬১ সালে প্রণীত মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ কার্যকর হওয়ার পর পুরুষের দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ না রেখে আরবিট্রেশন কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণে দেওয়া হয়।
এই আইনের ৬(৫) ধারায় বলা হয়েছে—
আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড অথবা ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
অর্থাৎ, অনুমতি না থাকলে শাস্তি রয়েছে, কিন্তু সেই অনুমতির উৎস স্ত্রী নন—আইন অনুযায়ী তা আরবিট্রেশন কাউন্সিল।
রিটকারীদের আপত্তি ও আপিলের ঘোষণা
এই রায়ের বিরুদ্ধে রিটকারীরা আপিলের ঘোষণা দিয়েছেন। তাদের বক্তব্য,
এই সিদ্ধান্তের ফলে বহু বিবাহের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ ও নৈতিক ভারসাম্য দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। নারী অধিকার ও পারিবারিক সুরক্ষার প্রশ্নে এটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
রিটকারীদের দাবি, মুসলিম পারিবারিক আইন ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ উভয়ের সমান অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য।
সমাজবিজ্ঞানী ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, আর্থিক সক্ষমতা, সামাজিক প্রভাব ও মানসিক প্রলোভনের কারণে বহু পুরুষ দ্বিতীয় বিয়ের সুযোগ অপব্যবহার করতে পারেন। এতে পারিবারিক অস্থিরতা, নারী ও শিশুর মানসিক ক্ষতি এবং সামাজিক বৈষম্য বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অন্যদিকে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রায় আইনগত দিক থেকে ব্যাখ্যামূলক হলেও এর সামাজিক প্রভাব গভীর। বিষয়টি চূড়ান্তভাবে স্পষ্ট করতে আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সামনে কী হতে পারে
আইন অঙ্গনের অনেকেই মনে করছেন, বিষয়টি আপিল বিভাগে গেলে মুসলিম পারিবারিক আইনের একটি চূড়ান্ত ও যুগোপযোগী ব্যাখ্যা আসবে, যা ভবিষ্যতে বহু মামলার দৃষ্টান্ত হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬