চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি
ঐতিহ্যবাহী কেরু এন্ড কোম্পানী দেশের সবক'টি চিনিকলের মধ্যে একমাত্র লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসাবে স্বীকৃত। নিয়মিত ভাবে লাভের ধারাবাহিকতায় এবার ইতিহাসের সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করেছে মিলটি। আর ধারাবাহিক লাভের মূল কারিগর হচ্ছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাব্বিক হাসান। তিনি যোগদানের পর থেকেই লাভ বা মূনাফার গ্ৰাফ উর্দ্ধমুখী। তার সূদক্ষ পরিচালনায় এবং অতি কর্মতৎপরতার ফলে মিলের শ্রমিক ও কর্মচারীদের ঐক্যবদ্ধ ও নিষ্ঠার সাথে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের কারণে মিল জোনে আখ চাষ যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনি মানসম্পন্ন আখের উৎপাদন ও ফলন বেড়েছে। এছাড়াও মানসম্পন্ন আখ উৎপাদনের কারনে আখ মাড়াইয়ে চিনির রিকভারিও বেড়েছে। এসব কারণে প্রতিষ্ঠানে লাভের তুলনামূলক রেকর্ডে আগের বছরকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে পরের বছর। ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে মিল প্রদত্ত হিসাব অনুযায়ী চিনিকলটি প্রতিষ্ঠাকালের সকল রেকর্ড ভেঙে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করেছে। সরকারের রাজস্ব খাতে ১৫৩ কোটি টাকা ভ্যাট ও আয়কর জমা দিয়ে চিনি কারখানার ৬০ কোটি ১৯ লাখ ৭৩ হাজার টাকার বিদ্যমান লোকসান পুষিয়েও মুনাফা অর্জিত হয়েছে ১৬৫ কোটি ২৪ লাখ ৩১ হাজার টাকা। দেশে বিদেশী মদের আমদানি কমে যাওয়ায় কেরুজ ডিষ্ট্রিলারীর উৎপাদিত মদের চাহিদা বেড়েছে অনেক। আর এ কারণে ৯০ বছর পুরনো প্রতিষ্ঠান হওয়ার পরও কেরু এন্ড কোম্পানী সর্বকালের সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করেতে পেরেছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে চিনিকলের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাব্বিক হাসান জানান, দেশের বৃহত্তম এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত্ব চিনিকলটি ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠা পর যাত্রা শুরু করে সেই থেকে এত পরিমাণ লাভের মুখ দেখেনি কেরু। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় শিল্পমন্ত্রী, শিল্প সচিব ও বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান এর দিকনির্দেশনায় সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন সম্ভব হয়েছে। এসময় তিনি আরও বলেন ৮৯ বছর পেরিয়েছে চিনিকলটি। পুরোনো আমলের যন্ত্র দিয়ে কোনোরকমে চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে মিলটিকে। চিনি উৎপাদনের সময় মাঝেমধ্যেই যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। এসব কারণে চিনিখাতে লাভ করা সম্ভব হয়নি। তার পরও চিনিতে ৬০ কোটি ১৯ লাখ ৭৩ হাজার টাকা লোকসান (যা আগের বছরের তুলনায় ২ কোটি টাকা কম) পুষিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১৬৫ কোটি ২৪ লাখ ৩১ হাজার। সরকারের রাজস্ব খাতে ১৫৩ কোটি টাকা ভ্যাট ও আয়কর জমা দেওয়া হয়েছে।
ঐতিহ্যবাহী কেরু চিনি শিল্পের প্রধান কাঁচামাল আখ। চিনি শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে আখ চাষের কোন বিকল্প নেই। আগামীতে লাভের এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯৩৮ সালে চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় প্রতিষ্ঠিত হয় কেরু অ্যান্ড কোম্পানি। বর্তমানে ছয়টি ইউনিটে চিনি, ডিস্টিলারি, ফার্মাসিউটিক্যালস, বাণিজ্যিক খামার, আকন্দবাড়িয়া খামার (পরীক্ষামূলক) এবং জৈব সার উৎপাদন করছে প্রতিষ্ঠানটি। এরমধ্যে শুধু চিনি কারখানা ছাড়া সবক'টি ইউনিট লাভজনক। ২০২৫-২৬ অর্থ বছর লাভ-ক্ষতির হিসাব অনুযায়ী, সব ইউনিট মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সম্ভাব্য নিট মুনাফা দাড়িয়েছে ১৬৫ কোটি ২৪ লাখ ৩১ হাজার টাকা। এই হিসাব ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে করা প্রতিষ্ঠার পর সর্বোচ্চ ১২৯ কোটি ৪৪ লাখ ৭৪ হাজার টাকার নিট মুনাফার রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এক কথায় গত বছরের তুলনায় এবার লাভের পরিমাণ ৩৬ কোটি টাকা বেশি।
২০২৫-২৬ অর্থ বছরের ছয় টির মধ্যে পাঁচটি ইউনিটে লাভ দেখানো হয়েছে ২২৩ কোটি ৭৯ লাখ ৩২ হাজার টাকা। এর মধ্যে বায়ো-ফার্টিলাইজার ইউনিটে লাভ ১ কোটি ৪৭ লাখ ৮৪ হাজার টাকা, বাণিজ্যিক খামারে ১ কোটি ৪৮ লাখ ৪ হাজার টাকা, আকন্দবাড়ীয়া ইউনিটে ৭ লাখ ৬২ হাজার টাকা এবং ফার্মাসিউটিক্যালস ইউনিটে ৩ লাখ ৭৯ হাজার টাকা।
কেরু অ্যান্ড কোম্পানির ডিস্টিলারি ইউনিট নয়টি ব্র্যান্ডের মদ তৈরি করে। এরমধ্যে- ইয়েলো লেভেল মল্টেড হুইস্কি, গোল্ড রিবন জিন, ফাইন ব্র্যান্ডি, চেরি ব্র্যান্ডি, ইম্পেরিয়াল হুইস্কি, অরেঞ্জ কুরাসাও, জারিনা ভদকা, রোজা রাম এবং ওল্ড রাম। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় কেরু অ্যান্ড কোম্পানির তিনটি বিক্রয় কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়া সারাদেশে কেরুর ১৩টি ওয়্যারহাউস রয়েছে। কেরুজ ডিষ্ট্রিলারী আরও বেশি উৎপাদনে সক্ষম। এখানে অ্যালকোহলের পাশাপাশি ভিনেগার, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, সার, চিনি ও গুড়ের মতো অন্যান্য পণ্যও উৎপাদন করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি।
১৮০৩ সালে ব্রিটিশ ব্যবসায়ী জন ম্যাক্সওয়েল ভারতের বিহার রাজ্যের আসানসোলে চোলাই মদের কারখানা (ডিস্টিলারি) প্রতিষ্ঠা করেন। এটিই উপমহাদেশের প্রথম ডিস্টিলারি। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর এটি পূর্ব পাকিস্তানের দর্শনার কেরু চিনিকলের সাথে একীভূত করা হয়। ১৯৭৩ সালে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার ডিস্টিলারি সহ কেরু চিনিকল জাতীয়করণ করে। সেই থেকে কেরু এন্ড কোম্পানী (বাংলাদেশ) লিমিটেড হিসাবে নামকরণের মাধ্যমে রাষ্ট্রায়াত্ত প্রতিষ্ঠান হিসাবে পরিচালিত হয়ে আসছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬