
বিশেষ প্রতিবেদক
একজন কর্মকর্তার ৩৫ বছরের চাকরিজীবন কতটা সফল, কতটা বিতর্কিত, তার বিচার একটি বা দুটি ছবিতে হয় না। কিন্তু সেই কর্মকর্তার অতীতের হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশন কমিটি গঠন করলে, বর্তমান কর্মস্থলে তাঁর উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে, মন্ত্রণালয় ব্যাখ্যা চাইলে, টিএ ডিএ, সরকারি গাড়ি, ক্রয়প্রক্রিয়া ও সম্ভাব্য ভেন্ডরদের সঙ্গে যোগাযোগ নিয়ে নতুন অভিযোগ সামনে এলে, গুরুত্বপূর্ণ দুটি সভায় চোখ বন্ধ অবস্থায় তাঁর ছবি আর নিছক ছবি থাকে না। তা বৃহত্তর প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে।
নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসির, সংক্ষেপে নেসকোর, বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মশিউর রহমান এখন এমনই একগুচ্ছ প্রশ্নের কেন্দ্রে।
[caption id="attachment_12800" align="alignnone" width="212"]
নেসকোর চেয়ারম্যানের সঙ্গে মতবিনিময় সভা, উপরে, এবং কর্মকর্তাদের সমন্বয় সভা, নিচে, দুই ক্ষেত্রেই ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মশিউর রহমানকে চোখ বন্ধ অবস্থায় দেখা যায়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তিনি সভা চলাকালে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।[/caption]
তিনি বলেছেন, “৩৫ বছরের চাকরিজীবনে আমি কোনো অনিয়ম করিনি।” তাঁর এই দাবি যাচাই করতে গেলে ফিরে তাকাতে হয় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে কর্মজীবনের শুরু, খুলনা ২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র, রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট প্রকল্প, নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির শীর্ষ পদে যাওয়ার চেষ্টা এবং শেষ পর্যন্ত নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত পুরো পথের দিকে।
আর সেই পথ মোটেই প্রশ্নহীন নয়।
প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার অভিযোগ, দুদকের তিন সদস্যের কমিটি
মশিউর রহমানের আগের কর্মজীবনের সবচেয়ে গুরুতর অধ্যায় খুলনা ও রূপসার দুটি বিদ্যুৎ প্রকল্প।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির খুলনা ২২৫ মেগাওয়াট এবং রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ অনুসন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক মো. আবুল হাসনাতকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে প্রকল্প দুটির বিভিন্ন নথিও চেয়েছিল।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন। প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা লুট হয়েছে, এমন কোনো চূড়ান্ত দুদক সিদ্ধান্ত বা আদালতের রায় এখনো সামনে নেই। এটি ছিল অনুসন্ধানের আওতায় থাকা অভিযোগ।
তবে অভিযোগের ব্যাপ্তি ছিল গুরুতর। দুই প্রকল্পে ঠিকাদার নিয়োগে অনিয়ম, প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের আপত্তি উপেক্ষা করে ইপিসি ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়া, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠদের নির্মাণকাজ দেওয়া, সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে বেশি দরদাতাকে কাজ দেওয়া এবং চুক্তি অনুযায়ী প্রত্যাশিত আউটপুট না পাওয়া সত্ত্বেও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।
মশিউর রহমান রূপসা প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ছিলেন। এর আগে খুলনা ২২৫ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পেও তিনি প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন বলে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়।
ফলে প্রশ্নটি সরাসরি। দুদকের সেই অনুসন্ধান কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছিল?
তাঁকে কি জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল? তাঁর দপ্তর থেকে কোন নথি নেওয়া হয়েছিল? অভিযোগের কোনো অংশের সত্যতা পাওয়া গিয়েছিল কি? অনুসন্ধান নিষ্পত্তি হয়ে থাকলে তার সিদ্ধান্ত কী ছিল? আর নেসকোর মতো গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদে তাঁকে নিয়োগ দেওয়ার আগে সেই অনুসন্ধানের অবস্থা যাচাই করা হয়েছিল কি?
এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো প্রকাশ্যে স্পষ্ট নয়।
সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার কেন্দ্র, গ্যাসের নিশ্চয়তা কোথায় ছিল
রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের বড় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর একটি।
২০১৮ সালের ২২ মে একনেকে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ছিল প্রায় ২ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ প্রায় ৫ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা। একই বছর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক প্রকল্পটির জন্য ৫০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ অনুমোদন করে।
কিন্তু প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় জ্বালানি।
৮০০ মেগাওয়াটের গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র নির্মাণ করা হলেও প্রয়োজনীয় গ্যাসের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি। ২০২৫ সালের শুরুতে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায় যে যন্ত্রপাতি সচল রাখতে কেন্দ্রটি মাসে এক বা দুই দিন আংশিক লোডে চালানোর পরিকল্পনার কথাও সামনে আসে। বিদ্যুৎ বিভাগের নথিতে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহের ঘাটতির বিষয়ও উঠে আসে।
প্রকল্পটির প্রাথমিক পরিকল্পনায় ভারতের একটি প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য রিগ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহের বিষয় ছিল। পরে সেই ব্যবস্থাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
তাই প্রশ্ন কেবল বর্তমান গ্যাস সংকট নিয়ে নয়। যে প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে, সেই কেন্দ্রের জ্বালানি নিশ্চয়তা প্রকল্প অনুমোদনের সময় কতটা শক্ত ছিল? গ্যাস সরবরাহের ঝুঁকি শুরু থেকেই জানা থাকলে প্রকল্প পরিচালক, কোম্পানি, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সেই ঝুঁকি কীভাবে মূল্যায়ন করেছিল?
এ দায় কোনো একজন কর্মকর্তার একক নয়। তবে দীর্ঘ সময় প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে থাকা মশিউর রহমানের প্রশাসনিক ভূমিকা কী ছিল, সেটিও ব্যাখ্যার দাবি রাখে।
একই রূপসা প্রকল্প নিয়ে তাঁর পক্ষে বিপরীত দাবিও রয়েছে। তাঁর সমর্থনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৭০২ দশমিক ১১ মিলিয়ন ডলারের অনুমোদিত প্রকল্প ৪১৪ দশমিক ২৬ মিলিয়ন ডলারে বাস্তবায়ন করে প্রায় ৪১ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা হয়েছে।
দাবিটি সত্য হলে তা নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ৪১ শতাংশ সাশ্রয় কি চূড়ান্ত সরকারি অডিট, প্রকল্প সমাপ্তি প্রতিবেদন কিংবা উন্নয়ন সহযোগীর হিসাবেও একইভাবে স্বীকৃত?
একই প্রকল্পে একদিকে সাফল্যের দাবি, অন্যদিকে দুদকের অনুসন্ধান। এই দুই বিপরীত চিত্রের নিষ্পত্তি হওয়া উচিত নথির ভিত্তিতে।
নওপাজেকোর এমডি হওয়ার দৌড়, পরে নেসকোয় শীর্ষ পদ
২০২৫ সালে নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হওয়ার প্রতিযোগিতায়ও মশিউর রহমানের নাম ছিল। তখন তাঁকে সাবেক ব্যবস্থাপনার একটি প্রভাবশালী বলয়ের ঘনিষ্ঠ বলে অভিযোগ করা হয়। একই সময়ে তাঁর নেতৃত্বে থাকা প্রকল্পগুলোর অনিয়মের প্রসঙ্গও সামনে আসে।
তাঁর পক্ষ থেকে বলা হয়, ব্যক্তিগত ও পেশাগত বিরোধ থেকেই এসব অভিযোগ ছড়ানো হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত তিনি নওপাজেকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হননি। তবে ২০২৫ সালের ২২ ডিসেম্বর নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন।
মাত্র চার মাসের মধ্যেই সেখানে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়।
চার মাসে চার দিন অফিসের অভিযোগ
৩০ এপ্রিল ২০২৬ দৈনিক কালবেলা “চার মাসে ৪ দিন অফিস করেছেন নেসকোর এমডি” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে অভিযোগ করা হয়, রাজশাহীতে নেসকোর প্রধান কার্যালয় হলেও দায়িত্ব নেওয়ার পর চার মাসে মশিউর রহমান সেখানে মাত্র চার দিন অফিস করেছেন।
প্রতিবেদনে নেসকোর কর্মকর্তা নজরুল ইসলামের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, রাজশাহীতে নিয়মিত উপস্থিত না থেকে তিনি ঢাকার বিজয়নগরের লিয়াজোঁ অফিস থেকে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন। এতে ফাইল নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, মাঠপর্যায়ের সিদ্ধান্তে বিলম্ব, রক্ষণাবেক্ষণে ধীরগতি এবং কর্মকর্তা কর্মচারীদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ ওঠে।
এর আগে ১৫ এপ্রিল বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তা কর্মচারীদের নিজ নিজ কর্মস্থলে অবস্থান করে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
বিষয়টি শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভাগ পর্যন্ত গড়ায় এবং তাঁর কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। সেই ব্যাখ্যার পরিণতি কী, তা এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুত্তরিত প্রশ্ন।
ঢাকার লিয়াজোঁ অফিস, মাসে ১২ লাখ টাকার অভিযোগ
ঢাকার লিয়াজোঁ অফিসের ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, অফিস ভাড়া প্রায় ২ লাখ টাকা। ১০ জন কর্মচারীর বেতন, আউটসোর্সিং চালক এবং অন্যান্য ব্যয়সহ মাসিক খরচ প্রায় ১২ লাখ টাকা।
জাতীয় প্রেস ক্লাবসংলগ্ন এলাকায় দুটি ফ্ল্যাট রেস্ট হাউস হিসেবে ব্যবহারে মাসে আরও প্রায় ২ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকায় প্রতি মাসে ১৫ থেকে ২০টি সভা আয়োজন, কর্মকর্তা কর্মচারীদের প্রতি সভায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকের প্রতি সভায় প্রায় ১২ হাজার টাকা সম্মানী পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এসব অভিযোগের প্রকৃত হিসাব নেসকোর আর্থিক নথি ও সরকারি অডিটের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।
রাজশাহীতে কর্মস্থল, ঢাকায় টিএ ডিএর অভিযোগ
এবার সামনে এসেছে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ।
নেসকোর সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মশিউর রহমানের নির্ধারিত কর্মস্থল রাজশাহী হলেও তিনি বেশিরভাগ সময় ঢাকায় অবস্থান করেন এবং সেই অবস্থানের বিপরীতে নিয়মিত টিএ ডিএ দাবি করেন।
আরও অভিযোগ, ঢাকা থেকে রাজশাহী কিংবা রাজশাহী থেকে ঢাকায় যাতায়াতের সময় তিনি নেসকোর অফিসিয়াল গাড়ি ব্যবহার করলেও একই সফরের জন্য ভ্রমণ সংশ্লিষ্ট অর্থও উত্তোলন করেন।
এই অভিযোগের পূর্ণ বিল ভাউচার এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে এখনই একে প্রমাণিত আর্থিক অনিয়ম বলা যাচ্ছে না।
তবে সত্যতা যাচাই কঠিন নয়। গত কয়েক মাসের সফর আদেশ, টিএ ডিএ বিল, অফিসিয়াল গাড়ির লগবই, জ্বালানি বিল, টোল রসিদ এবং উপস্থিতির রেকর্ড তারিখ ধরে পাশাপাশি রাখলেই বোঝা যাবে সরকারি গাড়ির ব্যয় বহনের পরও বিধিতে অনুমোদিত নয় এমন কোনো পরিবহন ব্যয় নেওয়া হয়েছে কি না।
যদি হয়ে থাকে, তা আর শুধু কর্মস্থলে অনুপস্থিতির অভিযোগ থাকবে না। সরাসরি আর্থিক জবাবদিহির প্রশ্ন হয়ে উঠবে।
ঢাকায় ভেন্ডরদের সঙ্গে বৈঠকের গুরুতর অভিযোগ
ক্রয়প্রক্রিয়া নিয়েও নতুন অভিযোগ সামনে এসেছে।
নেসকোর একাধিক সূত্রের দাবি, রাজশাহীর প্রধান কার্যালয়ে অনিয়মিত থাকলেও ঢাকায় অবস্থানকালে ভবিষ্যৎ ক্রয় ও প্রকল্পকে সামনে রেখে কয়েকজন সম্ভাব্য সরবরাহকারী ও ভেন্ডরের প্রতিনিধির সঙ্গে মশিউর রহমান অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন।
অভিযোগকারীদের সন্দেহ, ভবিষ্যৎ কোনো দরপত্রে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখার উদ্দেশ্য এসব যোগাযোগের পেছনে থাকতে পারে।
এই অভিযোগ এখনো প্রমাণিত নয়। কিন্তু অভিযোগটির গুরুত্বও কম নয়।
সরকারি ক্রয়ের মৌলিক শর্ত হলো সমান প্রতিযোগিতা। কোনো দরপত্র প্রকাশের আগেই সম্ভাব্য কোনো ভেন্ডর যদি এমন কারিগরি স্পেসিফিকেশন, শর্ত বা অভ্যন্তরীণ তথ্য পেয়ে থাকে, যা অন্য প্রতিযোগীদের জন্য উন্মুক্ত ছিল না, তাহলে পুরো ক্রয়প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
তাই ঢাকার লিয়াজোঁ অফিসের ভিজিটর রেজিস্টার, সংশ্লিষ্ট বৈঠকের তালিকা, আসন্ন দরপত্রের খসড়া স্পেসিফিকেশন এবং পরবর্তী সময়ে দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এইচটি মিটার ও সিটিপিটি সংকট, সংযোগে ভোগান্তির অভিযোগ
নেসকোর গ্রাহকসেবা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
বিভিন্ন এলাকার সূত্রের অভিযোগ, এইচটি সংযোগের জন্য প্রয়োজনীয় সিটিপিটি ও এইচটি মিটার পর্যাপ্ত নেই। ফলে বড় ভবন, শিল্প ও বাণিজ্যিক গ্রাহকের নতুন সংযোগ বিলম্বিত হচ্ছে। কিছু গ্রাহককে কয়েক মাস অপেক্ষা করতে বলা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অথচ ২০২৬ সালের জানুয়ারিতেই নেসকো এইচটি মিটার কেনার দরপত্র প্রকাশ করেছিল।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, কার্যাদেশ হয়েছিল কি না, কতটি মিটার কেনা হয়েছে, কতটি সরবরাহ হয়েছে, কতটি বিতরণ হয়েছে, বর্তমানে স্টোরে কত মিটার রয়েছে এবং কতটি আবেদন অপেক্ষমাণ।
রাষ্ট্রীয় একটি বিতরণ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা দক্ষতার সরাসরি পরীক্ষা এখানেই। গ্রাহক সংযোগ নিতে প্রস্তুত, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও আছে, তারপরও মিটারের অভাবে সংযোগ আটকে থাকবে কেন?
বছরে ৩৯ কোটি ২৫ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ সিস্টেম লসে
নেসকোর সাম্প্রতিক কার্যকারিতা নিয়ে আরও একটি বড় তথ্য উঠে এসেছে দৈনিক সমকালের ১৬ আগস্টের প্রতিবেদনে।
নেসকোর নিজস্ব বাণিজ্যিক হিসাব বিশ্লেষণ করে সেখানে বলা হয়, ২০২৪ থেকে ২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৩৯ কোটি ২৫ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ সিস্টেম লসে গেছে। প্রায় ৫০৮ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ গ্রহণের বিপরীতে বিক্রির হিসাবে এসেছে প্রায় ৪৬৯ কোটি ইউনিট। মোট সিস্টেম লস ছিল ৭ দশমিক ৭২ শতাংশ।
২০২৪ সালের প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ৪ পয়সা পাইকারি দর ধরে ওই বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২৭৬ কোটি টাকা।
তবে পুরো সিস্টেম লসকে দুর্নীতি বা আর্থিক অপচয় বলা যাবে না। বিদ্যুৎ বিতরণে কারিগরি ক্ষতি থাকে। পাশাপাশি মিটারিং, বিলিং, অবৈধ সংযোগ এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক কারণেও বিদ্যুৎ বিক্রির হিসাবে না আসতে পারে।
প্রশ্ন হচ্ছে, নেসকোর প্রতিবেদনে কারিগরি ও বাণিজ্যিক ক্ষতির পৃথক হিসাব নেই।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, সাত বছর ধরেই রংপুর অঞ্চলে সিস্টেম লস রাজশাহীর তুলনায় বেশি।
২০১৮ থেকে ১৯ অর্থবছরে রাজশাহীতে সিস্টেম লস ছিল ১০ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং রংপুরে ১৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ। ২০২৪ থেকে ২৫ অর্থবছরে তা কমে যথাক্রমে ৬ দশমিক ৯৯ এবং ৮ দশমিক ৭৯ শতাংশে এসেছে।
অর্থাৎ সাত বছরে সিস্টেম লস কমেছে। এটি নেসকোর একটি ইতিবাচক অর্জন।
তবে একই সময়ে রংপুর অঞ্চলে গ্রাহকের বকেয়াও রাজশাহীর তুলনায় বেশি। ২০২৪ থেকে ২৫ অর্থবছরে রাজশাহীতে গড় বকেয়া ছিল ১ দশমিক ৬৭ মাসের বিল, রংপুরে ৩ দশমিক ৫১ মাস।
নেসকোর প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনেও রংপুর অঞ্চলে বেশি সিস্টেম লস ও বকেয়ার কথা উঠে এসেছে এবং সেখানে আরও নিবিড় তদারকির প্রয়োজন বলা হয়েছে।
মশিউর রহমানও বলেছেন, রাজশাহী অঞ্চলে নিয়মিত ও নিবিড় তদারকির কারণে সিস্টেম লস নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে।
এই বক্তব্যই একটি মৌলিক প্রশ্ন তৈরি করে। নিবিড় তদারকি যদি সিস্টেম লস কমানোর অন্যতম উপায় হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ নির্বাহীর প্রধান কার্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি কতটা জরুরি?
গুরুত্বপূর্ণ দুই সভায় একই দৃশ্য
এরই মধ্যে নেসকোর দুটি গুরুত্বপূর্ণ সভার ছবি সামনে এসেছে।
একটি নতুন চেয়ারম্যানের সঙ্গে মতবিনিময় সভার, অন্যটি কর্মকর্তাদের সমন্বয় সভার।
দুটি ছবিতেই ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমানকে চোখ বন্ধ অবস্থায় বসে থাকতে দেখা যায়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, দুই সভাতেই তিনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।
একটি স্থিরচিত্র দিয়ে কাউকে ঘুমন্ত প্রমাণ করা যায় না। কিন্তু একই ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সভায় একই অবস্থায় দেখা গেলে এবং তাঁর বিরুদ্ধে প্রধান কার্যালয়ে অনিয়মিত উপস্থিতি, ফাইল নিষ্পত্তিতে বিলম্ব ও প্রশাসনিক স্থবিরতার অভিযোগ আগে থেকেই থাকলে ছবিগুলোকে একেবারে বিচ্ছিন্ন ঘটনাও বলা যায় না।
একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব শুধু সভায় উপস্থিত থাকা নয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়ায় সক্রিয় থাকাও তাঁর দায়িত্ব।
এবার উত্তর দিতে হবে নথিতে
মশিউর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা কোনো অভিযোগই প্রমাণিত হওয়ার আগে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। একইভাবে অভিযোগগুলো এত গুরুতর ও বহুমাত্রিক যে শুধু উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে সেগুলো এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই।
খুলনা প্রকল্পের অডিট কী বলছে?
রূপসা প্রকল্পের চূড়ান্ত হিসাব কী?
প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান কোথায় শেষ হয়েছে?
৪১ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের দাবি সরকারি অডিটে স্বীকৃত কি?
নেসকোর এমডি নিয়োগের আগে এসব বিষয় যাচাই করা হয়েছিল কি?
৩০ এপ্রিলের ব্যাখ্যা তলবের জবাব কী ছিল?
টিএ ডিএ এবং অফিসিয়াল গাড়ি ব্যবহারের হিসাব কী বলছে?
ঢাকায় সম্ভাব্য ভেন্ডরদের সঙ্গে বৈঠকের অভিযোগের সত্যতা কী?
এইচটি ও সিটিপিটি মিটারের বাস্তব মজুত কত?
আর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দপ্তরে কতটি ফাইল কত দিন ধরে অপেক্ষায় রয়েছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর অনুমান করতে হবে না। উত্তর রয়েছে রাষ্ট্রের নিজের নথিতেই।
কাঠগড়ায় শুধু একজন কর্মকর্তা নন
রূপসার হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ, দুদকের অনুসন্ধান, রাজশাহীতে অনিয়মিত উপস্থিতির অভিযোগ, ঢাকার লিয়াজোঁ অফিসের ব্যয়, টিএ ডিএ, সরকারি গাড়ি, সম্ভাব্য ভেন্ডরদের সঙ্গে যোগাযোগ, মিটার সংকট এবং বছরে ৩৯ কোটি ইউনিটের বেশি সিস্টেম লস, এসব প্রশ্ন শুধু একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির প্রশ্ন নয়।
এগুলো রাষ্ট্রীয় কোম্পানির শাসনব্যবস্থার প্রশ্ন।
হাজার হাজার কোটি টাকার সরকারি বিনিয়োগের প্রশ্ন।
সরকারি ক্রয়ের স্বচ্ছতার প্রশ্ন।
রাষ্ট্রীয় অর্থের হিসাবের প্রশ্ন।
এবং সর্বোপরি ২১ লাখের বেশি গ্রাহকের বিদ্যুৎ সেবার প্রশ্ন।
তাই এখন প্রয়োজন বক্তব্যের চেয়ে নথির।
খুলতে হবে অডিট। দেখতে হবে দুদকের অনুসন্ধানের পরিণতি। মেলাতে হবে টিএ ডিএর বিল ও গাড়ির লগবই। পরীক্ষা করতে হবে দরপত্রের ফাইল ও ভেন্ডর যোগাযোগ। হিসাব নিতে হবে মিটার স্টোরের। দেখতে হবে ফাইল নিষ্পত্তির গতি।
অভিযোগ মিথ্যা হলে নথিই মশিউর রহমানকে অভিযোগমুক্ত করবে। আর অভিযোগের কোনোটি সত্য হলে দীর্ঘ চাকরিজীবন তার দায় থেকে রেহাই দেওয়ার যুক্তি হতে পারে না।
কারণ একজন কর্মকর্তার চাকরির মেয়াদ নয়, শেষ পর্যন্ত বিচার্য তাঁর দায়িত্ব পালনের রেকর্ড।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬