আলী কদর পলাশ
কূটনীতিতে নাকি মুখের ভাষার চেয়ে নীরবতার দাম বেশি। শুক্রবার দিল্লি সেই পুরোনো কথাটাই নতুন করে প্রমাণ করল। তবে একটু অভিনব পদ্ধতিতে।
প্রথমে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন জানাল, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানোর মহড়া হবে। তাই নিয়মিত Change of Guard অনুষ্ঠান থাকবে না। এমন বিজ্ঞপ্তি সাধারণত কবিতা নয়, কল্পকাহিনিও নয়। রাষ্ট্রপতি ভবন যা লিখে, মানুষ ধরে নেয় কিছু একটা জেনে-শুনেই লিখেছে।
তারপর এক ঘণ্টার মধ্যেই সেই জ্ঞান উধাও।
নতুন বিজ্ঞপ্তি এলো। আগেরটি প্রত্যাহার করা হয়েছে। কেন? বলা হলো না।
দিল্লি বিজ্ঞপ্তি দিল, দিল্লিই তুলে নিল। ঢাকা meantime রয়টার্সকে বলল, সিদ্ধান্তই হয়নি।

এবার সাধারণ মানুষ কী ভাববে?
সে কি রাষ্ট্রপতি ভবনকে বিশ্বাস করবে, না বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিবকে? নাকি দুজনকেই বিশ্বাস করে ধরে নেবে, সফর একই সঙ্গে হচ্ছে এবং হচ্ছে না?
কূটনীতির সৌন্দর্য সম্ভবত এখানেই।
সাধারণ জীবনে এমন হলে স্ত্রী স্বামীকে জিজ্ঞেস করতেন, “তুমি আসছ তো?” স্বামী বলতেন, “এখনো ঠিক করিনি।” কিন্তু শ্বশুরবাড়ি যদি এরই মধ্যে গেট সাজিয়ে, চেয়ার পেতে, ব্যান্ড পার্টির মহড়া শুরু করে দেয়, তখন পাড়ার লোক একটু কৌতূহলী হবেই।
তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়েও এখন সেই দশা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম কয়েক দিন ধরে তারিখ জানাচ্ছে। কখনো ২১ আগস্ট, কখনো ২৩ থেকে ২৫ আগস্ট। রাষ্ট্রপতি ভবন আরও এক ধাপ এগিয়ে অভ্যর্থনার মহড়ার কথাই লিখে ফেলল। অথচ ঢাকা বলছে, “না ভাই, এখনো কিছু ঠিক হয়নি।”
এটাকে চাইলে কূটনৈতিক সমন্বয়ের ঘাটতি বলা যায়। চাইলে যোগাযোগের ভুল বলা যায়। চাইলে বলা যায়, কোনো এক দপ্তর একটু বেশি উৎসাহী হয়ে পড়েছিল।
কিন্তু সাধারণ পাঠক এত ভদ্র ভাষায় ভাবেন না।
তিনি বলবেন, ব্যাপারটা কী?
বাংলাদেশ কি যাচ্ছে, ভারত কি ডাকছে, নাকি দুই দেশই একে অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে কে আগে ‘হ্যাঁ’ বলবে?
সমস্যা হলো, এর পেছনে শুধু সফরের তারিখ নেই। আছে শেখ হাসিনা। আছে প্রত্যর্পণের প্রশ্ন। আছে দিল্লিতে তাঁর অবস্থান ও রাজনৈতিক তৎপরতা। আছে ঢাকার বলা “অনুকূল পরিবেশ”। আছে ভারতের বলা “পারস্পরিকতা”।
অর্থাৎ একটি সফরের বিমান এখনো রানওয়েতে ওঠেনি, কিন্তু কূটনীতির লাগেজ অনেক আগেই চেক-ইন হয়ে গেছে।
ঢাকার অবস্থানও মোটামুটি পরিষ্কার। তারা বলছে, কয়েকটি প্রশ্নের জবাব দরকার। বিশেষ করে শেখ হাসিনা ও অন্য পলাতকদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের অবস্থান কী, সেটি জানতে চায় বাংলাদেশ।
ভারত বলছে, বিষয়টি তাদের প্রক্রিয়ায় আছে।
‘প্রক্রিয়ায় আছে’ কূটনীতির খুব সুন্দর একটি বাক্য। এর সুবিধা হলো, এতে কিছুই না বলেও অনেক কিছু বলা যায়। ফাইল নড়ছে কি না, কেউ জানে না। কিন্তু শুনতে মনে হয় রাষ্ট্রযন্ত্র গভীর মনোযোগ দিয়ে কাজ করছে।
এই অবস্থায় রাষ্ট্রপতি ভবনের বিজ্ঞপ্তি ঘটনাটিকে আরও মজার করেছে।
কারণ সংবাদমাধ্যম ভুল করতে পারে। কোনো প্রতিবেদক সূত্রের কথা ভুল বুঝতে পারেন। কোনো ডেস্ক তাড়াহুড়োয় শিরোনাম এগিয়ে দিতে পারে।
কিন্তু রাষ্ট্রপতি ভবন যখন বিদেশি সরকারপ্রধানের অভ্যর্থনার মহড়ার বিজ্ঞপ্তি দেয়, তখন সেটিকে নিছক ‘গুজব’ বলা একটু কঠিন।
আবার সেই রাষ্ট্রপতি ভবনই যখন এক ঘণ্টার মধ্যে বিজ্ঞপ্তি গুটিয়ে নেয়, তখন ধরে নেওয়ারও সুযোগ থাকে না যে সবকিছু ঠিকঠাক চূড়ান্ত হয়ে গেছে।
ফলে আমরা এমন এক কূটনৈতিক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি যেখানে সবাই কিছু জানে, কিন্তু কেউ পুরোটা বলছে না।
হয়তো এটাই স্বাভাবিক। রাষ্ট্রের সম্পর্ক তো পাড়ার চায়ের দোকানের আলোচনা নয়। সব কথা প্রকাশ্যে বলা যায় না। দর-কষাকষি থাকে, শর্ত থাকে, সম্মান থাকে, মুখরক্ষা থাকে।
কিন্তু একটি জিনিস মনে রাখা ভালো।
কূটনীতি যত গোপনই হোক, রাষ্ট্রের আচরণ শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্যেই দেখা যায়।
একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা আচরণ।
এক ঘণ্টার মধ্যে সেটি প্রত্যাহার করাও আচরণ।
আর ঢাকা থেকে বলা, “সিদ্ধান্ত হয়নি” সেটিও আচরণ।
এই তিনটি আচরণ একসঙ্গে রাখলে যে ছবিটি পাওয়া যায়, সেটি খুব জটিল নয়।
দুই দেশ কথা বলছে। সফর নিয়ে প্রস্তুতিও হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক সমঝোতার শেষ বাক্যটি এখনো লেখা হয়নি।
তাহলে এত লুকোচুরি কেন?
সম্ভবত কারণ দুই পক্ষই চায় সফরটি হোক, কিন্তু কেউই এমন অবস্থায় যেতে চায় না যেখানে তাকে মনে হয় সে বেশি ছাড় দিয়েছে।
ভারত চায় তারেক রহমান দিল্লি যান। বাংলাদেশও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক অচল রাখতে চায় না। কিন্তু ঢাকা চায় সফরের আগে কিছু প্রশ্নের উত্তর। দিল্লি হয়তো চায় প্রশ্নগুলো থাক, সফরও হোক।
কূটনীতিতে একে বলে ‘ম্যানেজমেন্ট’।
বাংলায় একে আরেকটু সহজ করে বলা যায়, দুপক্ষই দরজা খোলা রেখেছে, কিন্তু কেউ এখনো ভেতরে ঢুকছে না।
তারেক রহমান শেষ পর্যন্ত দিল্লি গেলে সবাই বলবে, আলোচনার মাধ্যমে ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয়েছে।
না গেলে বলা হবে, সুবিধাজনক সময়ে সফরটি পুনর্নির্ধারণ করা হবে।
রাষ্ট্রের অভিধানে ‘বাতিল’ শব্দটি খুব কমই থাকে। সেখানে ‘পুনর্নির্ধারণ’ আছে, ‘পর্যালোচনা’ আছে, ‘উপযুক্ত সময়’ আছে।
আর আছে বিজ্ঞপ্তি।
যা কখনো প্রকাশিত হয়।
কখনো এক ঘণ্টা পর আর থাকে না।
কিন্তু মানুষের স্মৃতি থেকে এত সহজে প্রত্যাহার করা যায় না।
ছবি ছোট করে দিও।
লেখক : প্রধান সম্পাদক, দৈনিক মুখপাত্র
এবং
THE BUSINESS insight Magazine.
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬