আলী কদর পলাশ
আমাদের দেশে শিক্ষককে সম্মান করার একটি চমৎকার রেওয়াজ আছে। শিক্ষক দিবসে ফুল দিই, সভায় দাঁড়িয়ে বলি; তাঁরাই মানুষ গড়ার কারিগর। বক্তৃতা শেষ হলে আমরা বাড়ি ফিরি। শিক্ষকটি তখন নিজের অবসর ভাতার কাগজ হাতে নিয়ে আরেকটি সরকারি অফিসের সিঁড়ি ভাঙেন।
এটাই আমাদের সম্মানের একটি অদ্ভুত রূপ।
সারা জীবন যিনি ছাত্রদের শিখিয়েছেন, অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়া অন্যায়, ঘুষ নেওয়া পাপ, সত্য কথা বলতে হয় অথচ অবসরে গিয়ে কখনো কখনো তাঁকেই নিজের ন্যায্য টাকা পেতে তদবিরের মানুষ খুঁজতে হয়েছে। কোথায় ফাইল, কার টেবিলে, কবে ছাড় হবে। এসব জানতে জানতে একজন বৃদ্ধ শিক্ষকের জুতার তলা ক্ষয় হয়েছে, অথচ তাঁর পাওনার হিসাব শেষ হয়নি।
এই জায়গায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষণা আশার কথা শোনায়। তিনি বলেছেন, বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর ও কল্যাণ সুবিধার টাকা পেতে আর অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না। কোনো মধ্যস্বত্বভোগী নয়, কোনো অকারণ ভোগান্তি নয়; টাকা সরাসরি যাবে ব্যাংক হিসাবে।
কথাটি খুব ছোট। এর অর্থ অনেক বড়।
গত ১৫ আগস্ট চার বছর পর ৭০ হাজার ১১৯ জন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারী তাঁদের পাওনার একটি অংশ পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী সরাসরি এই চেক হস্তান্তর করেছেনা। সরকারি হিসাবে তাঁরা ৭০ হাজার ১১৯ জন। কিন্তু জীবনের হিসাবে তাঁরা ৭০ হাজার ১১৯টি পরিবার।
কারও হয়তো ওষুধ কেনার টাকা দরকার ছিল। কেউ স্ত্রীর চিকিৎসার বিল হাতে বসে ছিলেন। কারও মেয়ের বিয়ের সময় চলে গেছে। কেউ হয়তো প্রতিদিন ব্যাংকের খাতা খুলে দেখেছেন—টাকাটা এলো কি না।
এমন মানুষের কাছে অবসর সুবিধা কোনো ‘সুবিধা’ নয়। এটি তাঁর নিজের টাকা। তাঁর কর্মজীবনের হিস্যা। রাষ্ট্র এখানে দাতা নয়, কেবল পাওনা মেটানোর দায়িত্বে থাকা পক্ষ।
এই পার্থক্যটি আমাদের প্রশাসন অনেক সময় ভুলে যায়।
প্রধানমন্ত্রী অতীতে শিক্ষক-কর্মচারীদের দুটি তহবিলের অব্যবস্থাপনা, দুর্বল ব্যাংকে অর্থ সরিয়ে নেওয়া, জাল সূচক তৈরি এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা নষ্ট করার অভিযোগ তুলেছেন। অভিযোগ গুরুতর। সত্য-মিথ্যা নির্ধারণ হবে নথি, তদন্ত ও প্রমাণে। কোনো সরকারের অভিযোগই তদন্তের বিকল্প হতে পারে না।
কিন্তু অতীতের দায় খুঁজে বের করাই শেষ কথা নয়। আরও জরুরি হলো এমন ব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে ভবিষ্যতে কোনো শিক্ষককে আবার একই দুর্ভোগের গল্প বলতে না হয়।
একজন শিক্ষক অবসরের দিনেই জানবেন তিনি কত টাকা পাবেন। কবে পাবেন, সেটিও জানবেন। টাকা কোথায় আটকে আছে তা জানতে কোনো পরিচিত কর্মকর্তাকে ফোন করতে হবে না। কোনো দালালের নম্বর পকেটে রাখতে হবে না। সরকারি অফিসে গিয়ে ছলছল চোখে কাঁপা কাঁপা হাতে ‘স্যার একটু দেখবেন’ বলতে হবে না।
এতটুকু ব্যবস্থা করা কোনো আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য বড় কৃতিত্ব হওয়ার কথা নয়।
দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশে স্বাভাবিক কাজ ঠিকমতো হলে আমরা সেটিকেই অসাধারণ ঘটনা বলে উদ্যাপন করি। রাস্তা সময়মতো মেরামত হলে খুশি হই, ট্রেন সময়মতো এলে অবাক হই, আর একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নিজের টাকা সময়মতো পেলে তাকে সরকারের বিশেষ সাফল্য বলে মনে হয়।
এটি আমাদের প্রত্যাশার দারিদ্র্য।
বর্তমান উদ্যোগ সেই দারিদ্র্য থেকে বের হওয়ার একটি সুযোগ তৈরি করেছে। সরাসরি ব্যাংক হিসাবে টাকা দেওয়া ভালো ব্যবস্থা। কিন্তু এটি কোনো এক দিনের অনুষ্ঠান হয়ে থাকলে চলবে না। এটিকে নিয়মে পরিণত করতে হবে, প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। সরকার বদলাবে, মন্ত্রী বদলাবেন, প্রধানমন্ত্রীও একদিন বদলাবেন। কিন্তু একজন শিক্ষকের পাওনা পাওয়ার নিয়ম বদলাবে কেন?
শিক্ষকের মর্যাদা নিয়ে আমাদের বক্তৃতার অভাব নেই। অভাব রয়েছে সেই মর্যাদাকে দৈনন্দিন জীবনে বাস্তব করার।
একজন বৃদ্ধ শিক্ষক রাষ্ট্রের কাছে খুব বেশি কিছু চান না। তিনি চান না লাল গালিচা। চান না মঞ্চে ফুল। তাঁর জীবনের শেষ দিকে নিজের পাওনা টাকার জন্য যেন কাউকে ধরতে না হয়। এইটুকুই যথেষ্ট।
ফুল শুকিয়ে যায়।
বক্তৃতা মানুষ ভুলে যায়।
কিন্তু সময়মতো পাওয়া নিজের টাকায় কেনা ওষুধটি একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের কাছে রাষ্ট্রের সবচেয়ে সত্যিকারের সম্মান।

লেখক : প্রধান সম্পাদক, দৈনিক মুখপাত্র
এবং
THE BUSINESS insight Magazine.
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬