রংপুর ব্যুরো
তিস্তা নদীর ওপর নির্মিত কাঠের সেতু। দীর্ঘদিনের জীর্ণতা, ভাঙাচোরা কাঠ আর ঝুঁকিপূর্ণ চলাচলের মধ্যেই কোনোভাবে পারাপার করছিলেন মানুষ। শেষ পর্যন্ত সেতুটির একটি বড় অংশ ভেঙে নদীতে পড়ে যাওয়ায় এখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে পুরো যোগাযোগব্যবস্থা। বাধ্য হয়ে ডিঙি নৌকায় নদী পারাপার করতে হচ্ছে হাজারো মানুষকে।
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার শহীদবাগ ইউনিয়নের প্রাণনাথ চর এলাকার এই সেতু ভেঙে পড়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন আশপাশের অন্তত ১০ গ্রামের মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে সেতুটি জরাজীর্ণ থাকলেও কার্যকর সংস্কার বা স্থায়ী সেতু নির্মাণ না হওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। বর্ষা মৌসুমে তিস্তা নদীতে পানির প্রবাহ ও স্রোত বাড়ায় ডিঙি নৌকায় পারাপারও হয়ে উঠেছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে স্কুলগামী শিশু, গর্ভবতী নারী, বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীদের নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন স্বজনরা। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা করা না হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
#স্কুলে যেতে নদী পার, শিক্ষার্থীদের মনে আতঙ্ক
প্রাণনাথ চর ও আশপাশের এলাকার অনেক শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন নদী পার হয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। সেতুটি ভেঙে যাওয়ার পর তাদের অনেকেই বাধ্য হয়ে ডিঙি নৌকায় নদী পার হচ্ছে। কেউ কেউ আবার সেতুর অবশিষ্ট অংশ ব্যবহার করে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। এতে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাতায়াতও ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে ছোট শিক্ষার্থীদের নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক। শিক্ষার্থী মিজানুর রহমান বলেন, “কাঠের সেতুটি ভেঙে যাওয়ার পর প্রতিদিন স্কুলে যেতে অনেক সমস্যা হচ্ছে। নদী পার হতে ভয় লাগে। দ্রুত সেতুটি ঠিক করা হলে আমাদের পড়াশোনায় আর সমস্যা থাকবে না। শিক্ষার্থী সাইমুন বলেন, “বর্ষার সময় নদীতে পানি বেশি থাকায় ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। ডিঙি নৌকায় নদী পার হয়ে স্কুলে যেতে হয়। আমরা চাই দ্রুত নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হোক।”
#জরুরি রোগী ও গর্ভবতীদের নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা
সেতুটি ভেঙে যাওয়ার ফলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন জরুরি রোগী, গর্ভবতী নারী ও বয়স্করা। কারও হঠাৎ অসুস্থতা দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নদী পারাপার। স্থানীয়রা জানান, আগে কাঠের সেতু দিয়ে কোনোভাবে রোগী ও স্বজনদের পারাপার করা সম্ভব হলেও এখন সেই সুযোগও সীমিত। ফলে অনেক সময় বাধ্য হয়ে ডিঙি নৌকায় রোগী পারাপার করতে হচ্ছে। বর্ষার স্রোতের মধ্যে এ ধরনের পারাপার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা।
#কৃষকের মাঠের ফসলও আটকে যাচ্ছে পথে
শুধু মানুষের চলাচল নয়, সেতুটি ভেঙে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে কৃষি ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও। প্রাণনাথ চর ও আশপাশের এলাকাগুলো কৃষিনির্ভর হওয়ায় এখানকার মানুষের জীবিকার বড় অংশ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষকরা ধান, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদন করে স্থানীয় হাট-বাজারে বিক্রি করেন। কিন্তু সেতু ভেঙে যাওয়ায় পণ্য পরিবহনে বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নদী পারাপারের জটিলতার কারণে সময়মতো বাজারে পণ্য পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। স্থানীয় বাসিন্দা জসিম সরকার বলেন, “এই সেতু শুধু মানুষের চলাচলের জন্য নয়, কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্যও খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেতুটি ভেঙে যাওয়ায় কৃষকদেরও বড় সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। দ্রুত সেতুটি সংস্কার অথবা নতুন করে নির্মাণ করা হলে ১০ গ্রামের মানুষের দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে।”
#‘ভাঙা সেতু নয়, চাই স্থায়ী সমাধান’
স্থানীয় বাসিন্দা সামিমুল বলেন, “সেতুটি ভেঙে যাওয়ায় এলাকার মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। শিক্ষার্থী, নারী, শিশু ও অসুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন। আমরা চাই দ্রুত নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা করা হোক। পাশাপাশি স্থায়ী সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সেতুটি জরাজীর্ণ অবস্থায় থাকলেও স্থায়ী সমাধানের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কাঠের সেতুটির বিভিন্ন অংশ নষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও ঝুঁকি নিয়ে মানুষ চলাচল করে আসছিল। শেষ পর্যন্ত সেতুর একাংশ নদীতে পড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। তাদের দাবি, স্থায়ী সেতু নির্মাণের আগ পর্যন্ত অন্তত নিরাপদ নৌকা পারাপারের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে দ্রুত প্রকল্প গ্রহণ করে প্রাণনাথ চর এলাকায় একটি টেকসই পাকা সেতু নির্মাণ করতে হবে।
#প্রশাসনের নজরে বিষয়টি
কাউনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পাপিয়া সুলতানা বলেন, “সেতুটি ভেঙে যাওয়ার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এলাকাবাসীর দুর্ভোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। দ্রুত সরেজমিনে পরিস্থিতি পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা এবং স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, “শিক্ষার্থী, নারী, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষের চলাচলে যেন কোনো ধরনের ঝুঁকি না থাকে, সে বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। জনদুর্ভোগ কমাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।”
#দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান চান স্থানীয়রা
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বিষয়টি শুধু সাময়িকভাবে দেখলে হবে না; দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সংকট নিরসনে নিতে হবে স্থায়ী উদ্যোগ। তাদের মতে, একটি নিরাপদ সেতু নির্মিত হলে ১০ গ্রামের মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিপণ্য পরিবহন ও দৈনন্দিন যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। তাই ভাঙা কাঠের সেতুর জায়গায় দ্রুত একটি টেকসই পাকা সেতু নির্মাণ এবং তার আগ পর্যন্ত নিরাপদ বিকল্প পারাপারের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। এখন তাদের অপেক্ষা কবে শেষ হবে ঝুঁকিপূর্ণ ডিঙি নৌকার যাত্রা, আর কবে মিলবে নিরাপদ সেতুর নিশ্চয়তা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬