রংপুর ব্যুরো
রংপুরের বদরগঞ্জে মেলার নামে লটারির টিকিট বিক্রিকে কেন্দ্র করে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। মেলার নির্ধারিত সীমানার বাইরে লটারির টিকিট বিক্রির অভিযোগে এক যুবককে ৭ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনায় এসেছে এই লটারির আয়োজন, প্রচার ও বিস্তারের নেপথ্যে কারা রয়েছেন? স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, বদরগঞ্জে লটারির কার্যক্রম শুধু টিকিট বিক্রেতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় এর সঙ্গে উপজেলা প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতা ও পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) দুপুরে উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন ওসমানপুর রোডে লটারির টিকিট বিক্রির সময় জহুরুল ইসলাম নামে এক যুবককে আটক করে পুলিশ। পরে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ এস এম শাহাদাত হোসেন পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতে তাকে হাজির করা হলে জুয়া আইনে ৭ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সাজা ঘোষণার পর তাকে রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্ত জহুরুল ইসলাম বদরগঞ্জ উপজেলার জামুবাড়ী সরদারপাড়া এলাকার ফুল মিয়ার ছেলে।
# একজন বিক্রেতা কারাগারে, নেপথ্যের কারিগররা কোথায়?
পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, রামনাথপুর ইউনিয়নের হাসিনানগরে খোলহাটি ক্ষুদ্র কুটির শিল্প ও বাণিজ্য মেলা উপলক্ষে লটারির আয়োজন করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মেলার নির্ধারিত সীমানার বাইরে লটারির টিকিট বিক্রি না করার নির্দেশনা ছিল। কিন্তু সেই নির্দেশনা অমান্য করে জহুরুল ইসলাম ওসমানপুর রোডে প্রকাশ্যে টিকিট বিক্রি করছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ তাকে আটক করে এবং পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতে হাজির করা হয়। এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—মেলার বাইরে একজন টিকিট বিক্রি করায় যদি প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারে, তাহলে মেলার ভেতরে লটারির আয়োজন, টিকিট ছাপানো, প্রচার, বিক্রি ও অর্থের লেনদেনের বিষয়গুলো কতটা নিয়ম মেনে হচ্ছে?স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের দাবি, শুধু টিকিট বিক্রেতাকে শাস্তি না দিয়ে লটারির মূল আয়োজক, অনুমোদনদাতা, পৃষ্ঠপোষক, প্রচারকারী এবং অর্থনৈতিক লেনদেনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়েও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
# প্রশাসনের বিরুদ্ধে উঠছে প্রশ্ন
স্থানীয়দের অভিযোগ, বদরগঞ্জে লটারির কার্যক্রম নিয়ে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে। কেউ কেউ দাবি করছেন, প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট মহলের একটি অংশ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযোগ পাওয়ার পরও বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা অবৈধ লটারির সঙ্গে জড়িত—এমন অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত নয়। ফলে বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য বের করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। স্থানীয়দের প্রশ্ন, প্রশাসন যদি লটারির টিকিট মেলার বাইরে বিক্রি করাকে বেআইনি হিসেবে বিবেচনা করে থাকে, তাহলে মেলার সার্বিক লটারি কার্যক্রমের বৈধতা, অনুমোদন ও তদারকির বিষয়টিও প্রকাশ্যে আনা উচিত।
# রাজনৈতিক নেতাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
লটারির কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধেও পরোক্ষ সহযোগিতা, পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক নেতা লটারির সঙ্গে জড়িত—এমন তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সচেতন মহলের দাবি, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রশাসনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা বা প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের বক্তব্য, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রশাসনিক প্রভাব কোনোভাবেই আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাধা হওয়া উচিত নয়।
# রংপুরজুড়ে লটারি নিয়ে উদ্বেগ
বদরগঞ্জের পাশাপাশি রংপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলায়ও লটারির নামে টিকিট বিক্রির অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। জেলার গঙ্গাচড়া, বদরগঞ্জ-তারাগঞ্জ, রংপুর সদর, পীরগাছা-কাউনিয়া, মিঠাপুকুর ও পীরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় লটারির কার্যক্রম নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা চলছে। এ ছাড়াও রংপুর বিভাগের অন্যান্য জেলাতেও একই ধরনের কার্যক্রম রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, লটারিকে কেন্দ্র করে দ্রুত অর্থ পাওয়ার আশায় অনেকে এতে আকৃষ্ট হচ্ছেন। এতে পরিবারে আর্থিক চাপ, সামাজিক বিরোধ এবং জুয়াসংক্রান্ত নানা সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে লটারির কারণে রংপুরে চুরি, ছিনতাই সহ অন্যান্য অপরাধ বেড়েছে।
# ‘লটারি বন্ধ নয়, বরং বিক্রেতাকে ধরেই দায় শেষ?’
বদরগঞ্জের একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, লটারির টিকিট বিক্রি যদি আইনবহির্ভূত হয়, তাহলে শুধু একজন বিক্রেতাকে আটক করে দায় শেষ করা যাবে না। লটারির পেছনে কারা অর্থ দিচ্ছে, কারা আয়োজন করছে, কারা প্রচার করছে এবং কারা এর সুবিধা নিচ্ছে—এসব বিষয় তদন্ত করা জরুরি। তাদের দাবি, মেলার অনুমোদন, লটারি পরিচালনার বৈধতা, টিকিট বিক্রির অনুমতি এবং অর্থনৈতিক লেনদেন—সবকিছু খতিয়ে দেখা হোক।
# ‘প্রভাবশালীদের ছাড় নয়’
সচেতন নাগরিকরা বলছেন, আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। একজন সাধারণ টিকিট বিক্রেতা যদি আইন ভঙ্গের দায়ে কারাগারে যেতে পারেন, তাহলে লটারির নেপথ্যে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিক নেতা কিংবা প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধেও একইভাবে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তাদের মতে, প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে লটারি আয়োজনের অনুমোদন, সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা এবং অর্থের উৎস ও ব্যবহারের বিষয়ে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
## ওসির বক্তব্য
বদরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান জাহিদ সরকার বলেন, উপজেলা প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মেলার বাইরে অবৈধভাবে লটারির টিকিট বিক্রির সময় ওই যুবককে আটক করা হয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের দেওয়া সাজা অনুযায়ী তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
## তদন্তের দাবি
একজন টিকিট বিক্রেতার কারাদণ্ডের মধ্য দিয়ে বদরগঞ্জে লটারিকাণ্ডের একটি দৃশ্যমান অংশে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও স্থানীয়দের মূল প্রশ্ন এখন নেপথ্যের আয়োজকদের নিয়ে। প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা রাজনৈতিক দলের কোনো নেতা এই কার্যক্রমে জড়িত কি না, তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন তারা।স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে না দেখে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক। তদন্তে যারই সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, দল-মত ও পদ-পদবি নির্বিশেষে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কারণ, লটারির টিকিট বিক্রেতাকে শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি লটারির নেপথ্যের কারিগরদের শনাক্ত করা না গেলে বদরগঞ্জে অবৈধ লটারি বন্ধে অভিযান কতটা কার্যকর হবে সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬