আঃ রাজ্জাক (রিয়াদ), রংপুর ব্যুরো
ভোটের সময় জনপ্রতিনিধিদের প্রতিশ্রুতির শেষ থাকে না। উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিরাপদ চলাচল এসব প্রতিশ্রুতি শুনে আশায় বুক বাঁধেন সাধারণ মানুষ। কিন্তু নির্বাচন শেষ হওয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন আর দেখা যায় না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের গোপিডাঙ্গা মৌলভীবাজার এলাকার মানুষ এমনই এক বাস্তবতার সাক্ষী। প্রায় এক দশক আগে নির্মিত একটি সেতু আজ সংযোগ সড়ক হারিয়ে কার্যত অচল। সেতুতে উঠতে হচ্ছে বাঁশের সাঁকো দিয়ে, আর প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করছেন প্রায় ১০ গ্রামের হাজারো মানুষ। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ১০ বছর ধরে একই দুর্ভোগ চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল না পেয়ে উল্টো আতঙ্ক আর দুর্ভোগ নিয়েই দিন কাটাচ্ছেন এলাকাবাসী।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বালাপাড়া ইউনিয়নের গোপিডাঙ্গা মৌলভীবাজার এলাকায় নির্মিত সেতুটির দুই পাশের সংযোগ সড়ক সম্পূর্ণ ধসে গেছে। সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় স্থানীয়রা নিজেরাই বাঁশ ও কাঠ দিয়ে অস্থায়ী সাঁকো তৈরি করেছেন। সেই নড়বড়ে সাঁকো দিয়েই প্রতিদিন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমিক, নারী-শিশুসহ হাজারো মানুষ পারাপার করছেন। সামান্য অসাবধানতা হলেই বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, সেতুটির মূল কাঠামোও এখন ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় এক পাশ মারাত্মকভাবে হেলে পড়েছে। সেতুর সংযোগস্থলে বড় বড় ফাটল সৃষ্টি হয়েছে এবং দুই পাশের মাটি ধসে যাওয়ায় কাঠের পাটাতন বসিয়ে অস্থায়ীভাবে চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিদিন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ভ্যান, ঘোড়ার গাড়ি এবং মোটরসাইকেল সেই নড়বড়ে কাঠের ওপর দিয়ে চলাচল করছে। এতে যেকোনো সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ষাটোর্ধ্ব কৃষক বিনয় চন্দ্র বর্মন। তিনি বলেন, "ভোটের সময় সবাই প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু ভোট শেষে কেউ আর খোঁজ নেয় না। ১০ বছর ধরে আমরা কষ্ট করতেছি। যদি নতুন করে সেতু নির্মাণ না করা হয়, তাহলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। মাটি সরে যাওয়ায় নড়বড়ে সেতুতে উঠতে এখন ভয় লাগে। সংযোগ সড়কও নেই। এখন সেতুর দুইপাশে বাঁশের সাঁকো দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেটাও ঝুঁকিপূর্ণ।"
জানা যায়, ২০১৪ সালে ইউএসএআইডি ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে, কেয়ার বাংলাদেশের সহযোগিতায় এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর বাস্তবায়নে ৩৭ লাখ ২৪ হাজার ১৮৩ টাকা ব্যয়ে সেতুটি নির্মাণ করা হয়। স্থানীয়রা আশা করেছিলেন, এই সেতু তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত খুলে দেবে। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই সেতুর দুই পাশের মাটি ধসে পড়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর থেকে কার্যকর কোনো স্থায়ী সংস্কার হয়নি।
এলাকাবাসীর দাবি, সেতুটি শুধু একটি গ্রামের নয়; এটি অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষের প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই পথ ব্যবহার করেন। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা এই পথেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যায়। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ধান, পাট, ভুট্টা, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য স্থানীয় হাট-বাজারে পরিবহন করেন এই সেতু দিয়ে। ফলে সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় পুরো এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী বলেন, "বন্যার সময় আমাদের দুর্ভোগের শেষ থাকে না। প্রতিবছর সেতুর দুই পাশের মাটি সরে গিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সেতুর ওপর উঠলেই বোঝা যায় কতটা নড়বড়ে। কিন্তু প্রশাসনের কেউ যেন এসব দেখতে পায় না।"
স্থানীয়রা আরও জানান, বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। প্রবল বৃষ্টিপাত ও বন্যার কারণে সংযোগ সড়কের অবশিষ্ট অংশও ভেঙে যায়। ফলে অনেক সময় শিশু, বৃদ্ধ ও নারীদের পারাপার করানোই কঠিন হয়ে পড়ে। রাতের বেলায় পর্যাপ্ত আলো না থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, এ বিষয়ে রংপুর-৪ (কাউনিয়া-পীরগাছা) আসনের সংসদ সদস্য, উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদ এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল দপ্তরসহ বিভিন্ন দপ্তরে একাধিকবার লিখিত আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু বছরের পর বছর কেটে গেলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
স্থানীয় ইউপি সদস্য হাফিজার রহমান বলেন,"চেয়ারম্যান সাহেবকে বহুবার বিষয়টি জানিয়েছি। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষে এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তাই উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে।"
বালাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনছার আলী বলেন, "গত বছর আমরা সেতুর দুই পাশে মাটি ভরাট করেছিলাম। কিন্তু ভারী বৃষ্টিপাত ও বন্যার কারণে আবারও ধসে গেছে। এখন নতুন করে সেতু নির্মাণ ছাড়া স্থায়ী সমাধান নেই। আমরা প্রকৌশল দপ্তরে একাধিকবার আবেদন করেছি। শুনেছি ঢাকায় প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তবে কাজ কবে শুরু হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না।"
এ বিষয়ে কাউনিয়া উপজেলা প্রকৌশলী মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, "মৌলভীবাজার এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ সেতুটি পুনর্নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটির অনুমোদনও পাওয়া গেছে। ফিজিবিলিটি স্টাডি ও টোপোগ্রাফিক সার্ভে সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে নকশা প্রণয়নের কাজ চলছে। আশা করছি, খুব দ্রুত দরপত্র অনুমোদন হবে। এরপরই নতুন সেতু নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে।"
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, কাগজে-কলমে প্রকল্পের অগ্রগতির কথা বহু বছর ধরেই শুনছেন তারা। কিন্তু বাস্তবে কাজের কোনো চিহ্ন নেই। প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করতে করতে তারা এখন আশ্বাসের বদলে দ্রুত বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে চান। এলাকাবাসীর দাবি, নতুন সেতু নির্মাণের পাশাপাশি টেকসই সংযোগ সড়ক নির্মাণ, নদীভাঙন ও মাটি ধস রোধে স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নির্মাণকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিরাপদ বিকল্প চলাচলের ব্যবস্থা করা জরুরি। অন্যথায় যেকোনো সময় একটি বড় দুর্ঘটনা পুরো এলাকাকে শোকাহত করতে পারে। দীর্ঘ এক দশকের এই অব্যবস্থাপনা শুধু একটি সেতুর সংকট নয় এটি গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতা এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতারও একটি প্রতিচ্ছবি। স্থানীয়দের একটাই প্রত্যাশা আর কোনো প্রতিশ্রুতি নয়, দ্রুত বাস্তবায়ন হোক নতুন সেতু নির্মাণের কাজ, ফিরুক নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬