আঃ রাজ্জাক (রিয়াদ), রংপুর ব্যুরো
রংপুরের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার অন্যতম পরিচিত প্রতিষ্ঠান বইবাড়ি রংপুর নতুন ঠিকানায় আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে। বুধবার সন্ধ্যায় নতুন কার্যালয়ে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি পরিণত হয় লেখক, কবি, গবেষক, শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী ও পাঠকদের এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায়। নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে মুখর হয়ে ওঠে পুরো অনুষ্ঠানস্থল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিরা বলেন, একটি শহরের সাংস্কৃতিক পরিচয় কেবল তার স্থাপনা বা অবকাঠামো দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং বই, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার পরিবেশই একটি জনপদের প্রকৃত পরিচয় বহন করে। সেই বিবেচনায় দীর্ঘদিন ধরে রংপুরে বইবাড়ি যে ভূমিকা পালন করে আসছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। নতুন ঠিকানায় যাত্রার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি আরও বিস্তৃত পরিসরে লেখক-পাঠক ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের মিলনকেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিভাগীয় লেখক পরিষদ, রংপুরের সভাপতি আলহাজ কাজী মো. জুননুন। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, একটি সভ্য সমাজ গঠনের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো পাঠাভ্যাস। বই মানুষকে শুধু জ্ঞান দেয় না, মানবিকতা, মূল্যবোধ ও সৃজনশীল চিন্তারও বিকাশ ঘটায়। বইবাড়ি দীর্ঘদিন ধরে রংপুরে সেই আলোকিত সমাজ গঠনের নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছে। নতুন ঠিকানায় এ প্রতিষ্ঠান আরও বৃহৎ পরিসরে সাহিত্যচর্চা, বইপাঠ এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির মর্যাদায় বক্তব্য দেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, রংপুরের আঞ্চলিক পরিচালক ড. আহমেদ আব্দুল্লাহ। তিনি বলেন, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি একটি জাতির বৌদ্ধিক বিকাশে বইয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রযুক্তির এই যুগেও বই কখনো তার আবেদন হারায়নি। বরং তথ্যের ভিড়ে সত্য ও জ্ঞানকে আলাদা করে চেনার জন্য বইয়ের বিকল্প নেই। বইবাড়ির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন প্রজন্মকে বইয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও লেখক ডা. মফিজুল ইসলাম মান্টু বলেন, আজকের তরুণ সমাজকে যদি সৃজনশীল, মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তবে তাদের হাতে বই তুলে দিতে হবে। বইবাড়ি শুধু বই বিক্রির একটি প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অংশ। নতুন ঠিকানায় এর কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হবে এবং সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত করবে। সাংবাদিক ও কবি মাহবুবুল ইসলাম বলেন, বইকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে যে আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়, তা অন্য কোনো মাধ্যমে সম্ভব নয়। বইবাড়ি দীর্ঘদিন ধরে সেই সম্পর্ককে লালন করে আসছে। এখানে শুধু বই কেনাবেচা হয় না; গড়ে ওঠে নতুন লেখক, তৈরি হয় পাঠক, জন্ম নেয় নতুন চিন্তা ও সৃজনশীলতার চর্চা। সাংস্কৃতিক ঐক্য পরিষদ রংপুরের সভাপতি চৌধুরী মাহমুদুন্নবী ডলার বলেন, একটি শহরের সাংস্কৃতিক বিকাশে এমন উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বইবাড়ি রংপুরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বহুদিন ধরে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে। নতুন ঠিকানায় এর পরিসর আরও বিস্তৃত হওয়ায় সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চা নতুন গতি পাবে।
সুজন রংপুর জেলা সভাপতি অধ্যক্ষ খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, পাঠাভ্যাসের অবক্ষয় রোধে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনের পাশাপাশি বইবাড়ির মতো প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন প্রজন্মকে বইমুখী করতে এ ধরনের উদ্যোগকে সমাজের সর্বস্তর থেকে সহযোগিতা করা উচিত।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন কবি ও কথাসাহিত্যিক রানা মাসুদ, বিভাগীয় লেখক পরিষদ রংপুর জেলা সভাপতি এটিএম মোর্শেদ, ‘পাশে আছি’ সংগঠনের সংগঠক কবি হেলেন আরা সিডনী, লেখক ও গবেষক এম. এ. শোয়েব দুলাল, বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের গীতিকার বেলায়েত হোসেন, বাংলাদেশ বেতারের উপস্থাপক ও কণ্ঠশিল্পী সামিউল হাসান লিটন, গল্পকার নাহিদা ইয়াসমিন, কবি মাসুদ বশীর, কবি ও শিক্ষক আফজাল হোসেন, কবি ও শিক্ষক লিপিকা লিপি, শিক্ষক ও সাংস্কৃতিককর্মী ফারহানা বীথি, কবি নুর হোসেন, সরকার অভি, কবি ও শিক্ষক মোহিত মিঠু, কবি ও শিক্ষক দীপক সরকার তপু, কবি নুসরাত উপমা, কবি ও ছড়াকার হাফিজ রেদওয়ান, ডা. মুঈদ উল ইসলাম, কবি হাসনাইন রাব্বী, কবি ও সাংবাদিক শফিউজ্জামান আতা, সাংবাদিক মাহফুজ রহমান, সাংবাদিক আব্দুর রাজ্জাক রিয়াদ, কবি ও শিক্ষক মাসুম মোর্শেদ, কবি ফারুক রহিম, কবি হায়াত মাহমুদ মানিক, শ্রাবণ শান্তনু, শুভ অধিকারীসহ সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সাংবাদিকতা অঙ্গনের অসংখ্য বিশিষ্টজন।
বক্তারা বলেন, বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে বই পড়ার অভ্যাস অনেকাংশে কমে গেলেও বইয়ের গুরুত্ব কখনো কমে যায়নি। একটি সচেতন, মানবিক ও প্রগতিশীল সমাজ গঠনে নিয়মিত বইপাঠের বিকল্প নেই। তাই বইবাড়িকে ঘিরে নিয়মিত সাহিত্যসভা, পাঠচক্র, বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, কবিতা পাঠ, লেখক-পাঠক সংলাপ, শিশু-কিশোরদের জন্য পাঠাভ্যাস কর্মসূচি এবং সাংস্কৃতিক আয়োজনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা। অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া অতিথিরা আরও বলেন, রংপুরে সাহিত্য ও সংস্কৃতির যে ঐতিহ্য রয়েছে, তা আরও সমৃদ্ধ করতে বইবাড়ির মতো প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন। নতুন লেখকদের উৎসাহ দেওয়া, স্থানীয় লেখকদের বই পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তরুণ প্রজন্মকে সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে বইবাড়ি একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে পারে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বইবাড়ি রংপুরের পরিচালকবৃন্দ সেলিনা সাত্তার শেলী, শরিফুল আলম অপু, শামসুজ্জামান সোহাগ ও জাকির আহমদ। তারা অতিথিদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেন এবং নতুন ঠিকানায় বইবাড়ির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তারা জানান, ভবিষ্যতে বইবাড়িকে কেন্দ্র করে নিয়মিত সাহিত্য আড্ডা, নতুন বইয়ের প্রকাশনা উৎসব, লেখক-পাঠক মতবিনিময়, শিশু-কিশোরদের পাঠচর্চা কর্মসূচি, সাহিত্য কর্মশালা এবং সাংস্কৃতিক আয়োজনের সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে। অনুষ্ঠান শেষে অতিথিরা নতুন কার্যালারের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন, বই সংগ্রহ পরিদর্শন করেন এবং দর্শনার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। অনেকেই নতুন পরিবেশের প্রশংসা করে বলেন, এটি শুধু একটি বইয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; বরং রংপুরের সাহিত্য-সংস্কৃতির এক নতুন প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠবে।
সাহিত্যপ্রেমীদের মতে, বইবাড়ির নতুন ঠিকানায় এই যাত্রা কেবল স্থান পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি রংপুরে জ্ঞানচর্চা, পাঠাভ্যাস ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা। লেখক, পাঠক, গবেষক, শিক্ষার্থী ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের অবাধ মিলনস্থল হিসেবে বইবাড়ি আগামী দিনে উত্তরাঞ্চলের সাহিত্যচর্চায় আরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে এমন প্রত্যাশাই ব্যক্ত করেছেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলেই।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬