আলী কদর পলাশ
যে হাসি কেবল মুখের সীমায় থাকে, তাহা হাসি। আর যে হাসি মানচিত্রের সীমা বদলাইতে চায়, তাহা রাজনীতি। আজ আমরা সেই হাসিই দেখিলাম। দাঁতের প্রদর্শনী নয়, ক্ষমতার প্রদর্শনী। আনন্দের উচ্ছ্বাস নয়, আধিপত্যের উল্লাস। ভেনেজুয়েলার রাজধানীতে সরাসরি আঘাত। রাষ্ট্রপ্রধান লইয়া যাত্রা এবং তাহার পর সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানের হাসিয়া হাসিয়া উচ্চারণ—“আমার পেছনে যাঁহারা আছে, তাহারাই ভেনেজুয়েলা চালাইবে”—ইহা কেবল দম্ভ নহে, ইহা বিশ্ব-নীতির নগ্ন ঘোষণা।
এই দৃশ্য দেখিয়া আমাদের মনে পড়িল, সাম্রাজ্যবাদ কখনও রক্তচক্ষু দেখায় না বলিয়া যে সভ্যতার মুখোশ তার হাতে চিরস্থায়ী থাকিবে, সে ধারণা বিভ্রমমাত্র। আজ সাম্রাজ্যবাদ হাসিয়া হাসিয়া বলিয়াছে, “আমি আঘাত করিব, আমি নির্ধারণ করিব, আমি শাসন সাজাইব।” আর বিশ্বসভ্যতা দেখিতেছে—নিঃশব্দে, নির্বিকারভাবে, যেন কিছুই ঘটে নাই। কারণ আজকের বিশ্বে নীতি একটি কাগজ, আর ক্ষমতা একটি বর্ম। কাগজে শব্দ থাকে, বর্মে শাসন।
এইখানে হাসির অর্থ অত্যন্ত গভীর। যে হাসি সংবাদ সম্মেলনের মঞ্চে ফুটিয়া ওঠে, তাহা আর ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি থাকে না। তাহা একখানা রাষ্ট্রযন্ত্রের গতি-পরিচয়। আজ সেই হাসির মধ্য দিয়া আমাদের বুঝিতে হইল- ভোট, সংসদ, সংবিধান, অধিকার—ইহারা কেবল তখনই পবিত্র, যখন তাহারা শক্তিমানদের স্বার্থের সহিত বিরোধ করে না। স্বার্থের সঙ্গে বিরোধ ঘটিলেই ইহারা “অকার্যকর কাঠামো” বলিয়া চিহ্নিত হয় আর সেই কাঠামো ভাঙিয়া “ট্রানজিশন” নাম দিয়া নতুন কাঠামো দাঁড় করাইয়া দেওয়া হয়।
প্রশ্ন করা হইল, ভেনেজুয়েলা কে চালাইবে? উত্তর দেওয়া হইল—“আমার পেছনে যাঁহারা আছে।” ইহাই আধুনিক সাম্রাজ্যবাদের তত্ত্ব। রাষ্ট্র চলিবে জনগণের ম্যান্ডেট দ্বারা নহে। রাষ্ট্র চলিবে সেই অদৃশ্য পরিচালকদের নির্দেশে, যাঁহারা নির্বাচনের ময়দানে দাঁড়ায় না অথচ শাসনের ফল নির্ধারণ করে। রাষ্ট্র এখন সংসদের বিতর্কে গঠিত হয় না। রাষ্ট্র গঠিত হয় লবির দরজার আড়ালে। যে দেশে তেল আছে, সে দেশে কেবল ভূখণ্ড থাকে না- সে দেশে ব্যবস্থাপনা থাকে। রাষ্ট্রপতি থাকে না—থাকে ম্যানেজার, যাঁহাকে বদলাইয়া দেওয়া যায়।
তারপর বলা হইল—“তেলের খনি আছে, আমেরিকান কোম্পানি যাবে, ব্যবসা করবে, উপকার হবে।” আহা! “উপকার" কি মধুর শব্দ! কিন্তু ইহা সেই উপকার, যাহার প্রথম শর্ত স্বাধীনতার ক্ষয়। এমন উপকার যেন সেই চিকিৎসা, যাহাতে রোগী বাঁচে বটে কিন্তু নিজের জীবন আর নিজের হাতে থাকে না। যে দেশ নিজের সম্পদের উপর নিজের অধিকার হারায়, সে দেশ উপকৃত হয় না। সে দেশ ক্রমে স্বত্বহীন হয়। যেই মুহূর্তে একটি বিদেশি শক্তি ঘোষণা করে, “আমার কোম্পানি তোমাদের দেশে কাজ করিবে,” সেই মুহূর্তে সেই দেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হইতে ধীরে ধীরে একটি ব্যবসায়িক খতিয়ান হইয়া দাঁড়ায়।
এইখানেই প্রশ্ন উঠিবার কথা ছিল—বিশ্ব কোথায়? মানবাধিকারের কণ্ঠ কোথায়? গণতন্ত্রের ধ্বনি কোথায়? কিন্তু পৃথিবী আজ এমন এক জায়গায় উপনীত, যেখানে অপরাধের প্রকৃতি নহে- অপরাধীর পরিচয়ই বিচার নির্ধারণ করে। অপরাধী যদি “বন্ধু" হয়, তবে অপরাধও “কৌশল” হয়। অপরাধী যদি “প্রতিদ্বন্দ্বী” হয়, তবে অপরাধ হয় “সভ্যতার বিরুদ্ধে হুমকি।” এই দ্বৈত নীতিই আজকের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মূল প্রাণ। আইন এখানে ন্যায়ের জন্য নহে—আধিপত্য রক্ষার জন্য।
ধরা যাক, রাশিয়া বলিত—“আমরা ক্রোয়েশিয়া আক্রমণ করিলাম; আমাদের কোম্পানিগুলো খনি পরিচালনা করিবে, এই দেশের মানুষের উন্নতি হইবে।” অথবা চীন বলিত—“আমরা অমুক রাষ্ট্রে ঢুকিলাম, স্থিতিশীলতা আনিব।” তখন গণতন্ত্রের হাহাকার উঠিত, মানবাধিকারের কান্না ঝরিত, ইউরোপ-আমেরিকার সভা বসিত, নিষেধাজ্ঞার খড়্গ নামিয়া আসিত। কিন্তু আজ যেহেতু দখলদারির পতাকা আমেরিকার হাতে, সেহেতু বিশ্ব যেন বলিতেছে—“এ তো স্বাভাবিক।” ইহাই আজকের পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ট্র্যাজেডি। যে নীতি অন্যের ক্ষেত্রে অপরাধ, তাহাই নিজের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রনীতি।
আরও করুণ হইল এইখানে যে, প্রথমে কোনো ব্যক্তিকে বৈধতার চিহ্ন দেওয়া, তারপর সরকার পরিবর্তনের পথ প্রস্তুত করা, অতঃপর পছন্দের সরকার বসানো—ইহা কোনো আকস্মিক ঘটনা নহে, ইহা একটি পরীক্ষিত পদ্ধতি। সাম্রাজ্যবাদ বন্দুক হাতে আসে না বলিয়া ভাবিলে ভুল হয়। সাম্রাজ্যবাদ প্রথমে পুরস্কার, প্রশংসা ও প্রচারের পাথেয় লইয়া আসে- তারপর সুযোগের ক্ষণে শাসনের রাশ টানিয়া নেয়। একটি দেশ যখন নিজের ভাগ্য নিজের হাতে রাখিতে পারে না, তখন তাহার জনগণকে কেবল “উন্নতির প্রতিশ্রুতি” খাওয়ানো হয়। প্রতিশ্রুতি থাকে, বাস্তবতা থাকে না।
যে মানুষ নিজের জমি, নিজের নদী, নিজের তেল, নিজের সিদ্ধান্ত সবকিছু নিজে নির্ধারণ করিতে পারে না, সে মানুষ কতই বা উন্নতি করিবে? উন্নতির নামে যদি স্বাধীনতাই হারায়, তবে সেই উন্নতি কেবল একটি কৌশলী শব্দ; ইহার ভিতর থাকে দখলদারির গন্ধ। অতএব আজকের এই হাসির অর্থ হাসি নয়, ইহা অনিবার্য বার্তা। বার্তা এই যে, পৃথিবীতে এখন দুটি ধরণের রাষ্ট্র আছে। একদল রাষ্ট্র আদেশ করে, অন্যদল রাষ্ট্র পালন করে। আর যাহারা আদেশ করে, তাহারা আদেশের ভাষাকে “গণতন্ত্র” বলিয়া সাজায়।
শেষ কথা এই যে, সাম্রাজ্যবাদ কখনও বলে না—“আমি লুণ্ঠন করিতে আসিয়াছি।” সে বলে,
“আমি উন্নতি করিতে আসিয়াছি।” কখনও বলে না—“আমি দেশ দখল করিব।” সে বলে—“আমি স্থিতিশীলতা আনিব।” কিন্তু যে স্থিতিশীলতা বন্দুকের ছায়ায় আসে, তাহা স্থিতিশীলতা নহে—তাহা দাসত্বের পূর্বাভাস।
আজ ভেনেজুয়েলায় যা ঘটিল, তাহা একখানা ঘটনার নাম নহে; তাহা একখানা সতর্কতা। যে রাষ্ট্র আজ হাসিয়া হাসিয়া দখলদারির ঘোষণা দিতেছে, সে রাষ্ট্র আগামীকাল আরো হাসিবে—আর পৃথিবী যদি আজও চুপ থাকে, তবে সে হাসি একদিন সকলের দরজায় পৌঁছাইবে। কারণ, সাম্রাজ্যবাদের ধর্ম একটাই- অর্থ ও ক্ষমতা। আর সেই ধর্মের উপাসনা চলে রাষ্ট্রভাগ্যকে পণ্য করিয়া।
অতএব, যাহারা এখনো মনে করেন—বন্ধুত্বে নিরাপত্তা, শক্তির ছায়ায় মুক্তি—তাহারা স্মরণ রাখুন। সাম্রাজ্য যার বন্ধু হয়, তার শত্রুর অভাব হয় না। কারণ, সাম্রাজ্য বন্ধুত্ব করে না—সে বিনিয়োগ করে। বিনিয়োগের শেষে লাভ থাকে, বন্ধু থাকে না।
০৪ জানুয়ারি, ২০২৬
ধানমন্ডি, ঢাকা।
লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক দৈনিক এই আমার দেশ, THE BUSINESS in Magazine, প্রধান সম্পাদক দৈনিক মুখপাত্র
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬