আলী কদর পলাশ
কুহেলি কহিল তীব্র বিষাদে-
“হায়! এই ভোট-নগরীর পথে পথে আজ এমন ঘন কুয়াশা, যে মানুষের মুখ দেখা যায় না, ভোটার তো দূরের কথা।”
এহেন সময়ে মহোদয় খাদ্য ও ভূমি উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার, যিনি একদা প্রশাসনের গম্ভীর ঋষি, আর আজ রাজনৈতিক আবহাওয়ার বায়ুচাপ মাপিবার জ্যোতির্বিদ। কাগজের পাতায় অতি প্রাঞ্জল ভাষায় বলিলেন,
“সাম্প্রতিক কালে যেসব নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হইয়াছে, তাতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভোট প্রায় সমান। এক-তৃতীয়াংশ বনাম এক-তৃতীয়াংশ। অবশিষ্ট এক-তৃতীয়াংশ নিরপেক্ষ।”
এ কথা শুনিয়া মনে হইল, বাংলার জনমত যেন শীতের রাত্রির পিঠা।
এক ভাগ গুড়, এক ভাগ নারিকেল, আর এক ভাগ ‘দেখি কী হয়’- এই লবণহীন সন্দেহের দল।
কিন্তু মহোদয় এখানেই থামিলেন না। তিনি আরও বলিলেন,
যদি এক পক্ষ খেলায় না নামে, তবে দর্শক-সমর্থকেরা মাঠে যায় না।
আর নিরপেক্ষ ভোটার তো মাঠের গ্যালারির সেই দর্শক
যাহার হাতে পতাকা নাই, কিন্তু মুখে বড়ই “উঁহু, দেখি!”।
অর্থাৎ রাজনীতির মাঠ যদি হইল ক্রীড়াঙ্গন, তবে নির্বাচন কমিশন হইল আম্পায়ার,
আর ভোটার হইল দর্শক।
কিন্তু দর্শক না গেলে খেলাটি কি খেলা থাকে?
থাকে, বটে-
তবে তাহা হইল সেই খেলা, যেখানে ব্যাটসম্যান একাই রান করে, ফিল্ডার একাই ক্যাচ ধরে, আর স্কোরবোর্ডে লেখা থাকে,
“হাজার হাজার হাততালি”-যদিও গ্যালারিতে কেবল বাতাসের হুইসেল!

এখানে মহোদয়ের কথাটি যেন সাহিত্যের সেই পুরাতন উপমা—
যখন নাটকের নায়ক-নায়িকা অনুপস্থিত,
তখন মঞ্চে কেবল আলোক-প্রক্ষেপক নাচে,
আর দর্শকখানা ফাঁকা থাকিলে নাট্য-সমাপ্তির পরও “স্ট্যান্ডিং ওভেশন” শোনা যায়
কারণ মাইকে সেট করা থাকে পূর্ব-রেকর্ডকৃত করতালি!
মহোদয় স্মরণ করাইলেন ১৯৭৯ ও ১৯৮৫ সালের গণভোট এবং ১৯৮৮ সালের নির্বাচনের কথা।
যেখানে ভোটকেন্দ্রে নগণ্য লোক গিয়াছে,
কিন্তু ফলাফলের কাগজে কাগজে হঠাৎ করিয়া ফুটিয়া উঠিয়াছিল লাখ লাখ ভোটের গোলাপ।
আহা!
ইহা যেন সেই বাগান, যেখানে গাছ লাগানো নাই,
কিন্তু বাগানের মালীর খাতায় লেখা,
“আজ শত শত আম ধরিয়াছে।”
আর যখন প্রশ্ন উঠে,
“ভোট দিতে ন্যূনতম কতজন ভোটার যাইবে?”
তখন সংবিধান ও জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশ কহে, “আমরা সংখ্যার দাস নই, আমরা নীতির প্রভু।”
অর্থাৎ ভোটার না গেলেও নির্বাচন চলে
কারণ নির্বাচন শব্দটির সঙ্গে ভোটারের উপস্থিতির নাকি বিশেষ সম্পর্ক নাই।
মনে হয়, নির্বাচন হইল এক প্রকার পবিত্র আচার।
লক্ষ্মীপূজা হইলে যেমন দেবী আসেন কি আসেন না,
তবু পূজা হয়ই—
ঠিক তেমনি ভোটার আসেন কি আসেন না,
তবু “ভোট” হয়ই।
এরপর মহোদয় ২০১৮ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে বলিলেন,
বিএনপি নাকি প্রস্তুত ছিল না,
প্রচার ছিল না, এজেন্ট ছিল না, কর্মীরা ছিলেন কারারুদ্ধ বা এলাকাছাড়া।
এমনকি প্রার্থীদের কেউ কেউ এলাকামুখী হন নাই।
সাহিত্যিক চোখে দেখিলে ইহা যেন যুদ্ধের উপাখ্যান।
সেনাপতি যুদ্ধে গিয়াছেন কিন্তু সৈন্যদের হাতে তরবারি নাই।
ঢাল নাই।
আর দুর্গরক্ষীরা ইতোমধ্যে দুর্গের বাইরে তালা লাগাইয়া বসিয়া আছেন।
তবু ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকে,
“যুদ্ধ হইল; দুই পক্ষ অংশ নিল। দশখানা দুর্গ প্রতিপক্ষ পাইয়া গেল।”
এমন ইতিহাস পাঠ করিয়া মানুষ শুধু মাথা চুলকায় না, প্রথমে হাসে, তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
এখন আসি বর্তমান সময়ের নাট্যমঞ্চে।
একদিকে পুরনো লেখাটি আবার নতুন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরিতেছে—
কপি, ফটোকার্ড, কৌতুক, ব্যাখ্যা, সমালোচনা।
যেন শীতের রাতে পুরনো কম্বল,
কেউ গায়ে দেয়, কেউ টান দেয়, কেউ আবার ছিঁড়ে তারই মধ্যে নতুন নকশা আঁকে।
অন্যদিকে, হইল সেই নতুন জরিপ-
“৭০ শতাংশ মানুষ বিএনপিকে ভোট দিবে, জামায়াত পাবে ১৯ শতাংশ।”
এখন এই সংখ্যার ওপর ভর করিয়া অনলাইন রাজনীতির ময়দানে কিছুমাত্র কাব্যিক ভূমিকম্প ঘটিল।
কারণ সংখ্যার জাদু বড়ই মধুর।
একটি জরিপ দেখাইলেই অনেকেই ভাবেন,
ভোটের বাক্স বুঝি আগেই ফলের টেবিলে পরিণত হইয়া গিয়াছে।
এখানে মহোদয়ের সেই পুরাতন উক্তি আবার তলোয়ারের মতো ঝলসিয়া উঠিল-
“আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভোট সমান সমান।”
কিন্তু বর্তমান দৃশ্যে আসিয়া দেখা যায়্,
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিতে পারিবে না বলিয়া রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় হইতে স্পষ্ট বার্তা।
অতএব, এখন যদি কেউ বলে “দুই পক্ষ সমান,”
তবে সেই বক্তব্য যেন নদীর দুই তীরে সমান স্রোত খুঁজিবার চেষ্টা।
যেখানে এক তীরেই নৌকা বাঁধা,
অন্য তীরে বাঁশই নাই।
এখন প্রশ্ন উঠিতেছে,
যাহাদের বয়স ৩০–৩৫, যাহারা বহুদিন ভোটের উৎসব দেখে নাই,
তাহারা কি সবাই কেন্দ্রে যাইবে?
যদি তাহাদের মধ্যেই থাকে বিভিন্ন মতের সমর্থক
এবং এক পক্ষ নিষিদ্ধ অবস্থায় থাকিলে,
তবে “অংশগ্রহণমূলক” শব্দটি কি কেবল উৎসবের ফুলঝুরি?
নাকি রাজনৈতিক বাস্তবতার কঠিন মাটি?
এ বিষয়ে মহোদয় নিজে বেশ চুপচাপ।
আর এই নীরবতা—
সাহিত্যে যাহাকে বলে “প্রধান চরিত্রের মুখে অনুচ্চারিত বাক্য”
ইহাই পাঠকের কৌতূহল বাড়ায়।
কারণ মানুষ জানিতে চায়,
যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকে,
দর্শক যদি না আসে,
নিরপেক্ষ ভোটার যদি ঘরে বসে থাকে,
তবে নির্বাচন কি হইবে?
মহোদয়ের ভাষ্যমতে,
“উপস্থিতির হার যা-ই হোক, যারা পরিচালনা করবেন,
তারা অতীতের ধারাবাহিকতায় প্রদত্ত ভোট ও ফলাফল নির্ধারণ করে দেবেন।”
এ কথাটি শুনিয়া মনে পড়ে সেই পুরাতন কবিতার লাইন—
“যেখানে রাজা ঘুমায়, সেখানে প্রজা জাগে না,
আর যেখানে প্রজা ঘুমায়, সেখানে রাজা গণনা করে।”
অতএব, এই বিশেষ সম্ভাজিকা শেষ করিবার পূর্বে কুহেলি আবার কহে,
“হে জনমত! তুমি কি সত্যই এক-তৃতীয়াংশ নিরপেক্ষ?
নাকি তুমি কেবল এক-তৃতীয়াংশ ক্লান্ত?”
কারণ নিরপেক্ষতা কখনও কখনও দর্শনের ফল নহে,
ইহা বহুবার হতাশার সন্তান।
আর হতাশ ভোটার,
সে কেবল কেন্দ্রে যায় না,
সে ইতিহাসকেও তির্যক হাসি দিয়ে বলে—
“তুমি তো আগেই লিখে রেখেছ, আমি আর কলম কেন ধরিব?”
এবং ঠিক এখানেই নির্বাচন নামক নাটকের সবচেয়ে রসালো ট্র্যাজেডি-
দর্শক-শূন্য গ্যালারিতে দাঁড়াইয়া একজন ঘোষক গলা ফাটাইয়া বলে—
“জনতার ঢল নেমেছে!”
আর দূরে কোথাও কুহেলি তীব্র বিষাদে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে—
“একি শুনি আজ মন্থরার মুখে”
৬ জানুয়ারি ২০২৬
ধানমন্ডি, ঢাকা।
লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক দৈনিক এই আমার দেশ, THE BUSINESS in Magazine, প্রধান সম্পাদক দৈনিক মুখপাত্র
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬