আঃ রাজ্জাক (রিয়াদ), রংপুর ব্যুরো
লালমনিরহাট জেলা আইনজীবী সমিতির (বার অ্যাসোসিয়েশন) মাদক ও জুয়া সংক্রান্ত মামলায় গ্রেপ্তার আসামিদের পক্ষে এক মাসব্যাপী কোনো ধরনের আইনি সহায়তা প্রদান না করার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে এবার সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিতে রংপুর প্রেসক্লাব চত্বরে আমরণ অনশন শুরু করেছেন লালমনিরহাট সরকারি কলেজের ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী জাহিদ ইকবাল। তিনি লালমনিরহাট সদর উপজেলার ৭ নম্বর রাজপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর রাজপুর হদুর বাজার গ্রামের বাসিন্দা। তার পিতা মৃত আবু বক্কর। ১৫ জুলাই বুধবার সকাল থেকে রংপুর প্রেসক্লাবের সামনে ব্যানার টাঙিয়ে একাই অনশন কর্মসূচি শুরু করেন তিনি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অনশন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রয়োজন হলে উচ্চ আদালতে রিট দায়েরেরও ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
অনশনস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জাহিদ ইকবাল বলেন, "বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে আইনের আশ্রয় নেওয়ার এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার দিয়েছে। কোনো ব্যক্তি অপরাধে অভিযুক্ত হলেই তিনি তার সাংবিধানিক অধিকার হারান না। একজন মানুষ আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত আইনের দৃষ্টিতে নির্দোষ। তাই আইনজীবীরা সম্মিলিতভাবে কোনো শ্রেণির মানুষের পক্ষে আইনি সহায়তা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। তিনি বলেন, "বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ ও ৩৩ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের আইনের সমান আশ্রয় লাভ, ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ এবং গ্রেপ্তারের পর নিজের পছন্দের আইনজীবীর মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। লালমনিরহাট জেলা আইনজীবী সমিতির সিদ্ধান্ত সেই সাংবিধানিক অধিকারকে সীমিত করছে।"
তিনি আরও বলেন, "একজন আইনজীবীর দায়িত্ব হলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা। কোনো ব্যক্তি অপরাধী কি না, সেটি নির্ধারণ করবেন আদালত। কিন্তু আদালতে নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগই যদি না থাকে, তাহলে বিচারব্যবস্থার মৌলিক নীতিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।"
### 'দরিদ্র মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে'
জাহিদ ইকবালের দাবি, এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হবেন নিম্নআয়ের ও সাধারণ পরিবারের মানুষ। তিনি বলেন, যাদের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত, তারা গ্রেপ্তারের পর দ্রুত আইনি সহায়তা পাওয়ার জন্য স্থানীয় আইনজীবীদের ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু আইনজীবীরা যদি একযোগে মামলা পরিচালনা থেকে বিরত থাকেন, তাহলে দরিদ্র মানুষের জামিন আবেদন, আইনগত পরামর্শ এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। এতে বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।তিনি আরও বলেন, আমি ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থে আন্দোলন করছি না। লালমনিরহাটের সাধারণ মানুষের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার দাবিতেই এই আমরণ অনশন শুরু করেছি। যতক্ষণ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না হবে, ততক্ষণ আমার কর্মসূচি চলবে।"
## আগেও দিয়েছেন স্মারকলিপি
অনশনরত জাহিদ জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি ইতোমধ্যে লালমনিরহাটের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্মারকলিপি দিয়েছেন।তার ভাষায়, আমি শান্তিপূর্ণভাবে বিষয়টির সমাধান চেয়েছি। অনেক জায়গায় স্মারকলিপি দিয়েছি, অনুরোধ করেছি। কিন্তু কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তাই বাধ্য হয়ে বিভাগীয় শহর রংপুরে এসে আমরণ অনশন শুরু করেছি। যদি এখানেও কোনো সমাধান না হয়, তাহলে সংবিধানবহির্ভূত এই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করব।"
### কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে লালমনিরহাট জেলা আইনজীবী সমিতি
গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকালে লালমনিরহাট আদালত চত্বরে জেলা আইনজীবী সমিতির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মাদক ও জুয়া আইনে গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের পক্ষে এক মাস কোনো ধরনের আইনি সহায়তা না দেওয়ার ঘোষণা দেন জেলা আইনজীবী সমিতির নেতারা।সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট কেএম হুমায়ুন রেজা স্বপন। তিনি বলেন, সীমান্তবর্তী জেলা হিসেবে লালমনিরহাটে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে। এর ফলে সামাজিক অবক্ষয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ অবস্থা মোকাবিলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু 'আলোকিত লালমনিরহাট' নামে একটি সামাজিক আন্দোলনের সূচনা করেছেন। সেই আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে জেলা আইনজীবী সমিতির সকল সদস্য সর্বসম্মতিক্রমে আগামী এক মাস মাদক ও জুয়া আইনে গ্রেপ্তারকৃতদের পক্ষে কোনো ধরনের আইনি সহায়তা প্রদান করবেন না।তিনি আরও বলেন, এই সিদ্ধান্ত কেউ অমান্য করলে সমিতির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে এই সময়সীমা আরও বাড়ানো হতে পারে।"
### আইনজীবী সমিতির যুক্তি
জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম রফিক বলেন, "মাদক ও জুয়ার মামলার আসামিরা সহজে জামিন পেয়ে গেলে অনেক সময় অপরাধে ফিরে যায়। আইনজীবীরা কিছুদিন মামলা পরিচালনা থেকে বিরত থাকলে তারা হাজতবাস করবে, অপরাধবোধ সৃষ্টি হবে এবং মাদক থেকে দূরে থাকার মানসিকতা তৈরি হবে। সমাজকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করার দায়িত্ববোধ থেকেই আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তিনি আরও বলেন, আসামিরা চাইলে নিজেরাই আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে পারবেন। আইনজীবী সমিতি সেখানে কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না। সংবাদ সম্মেলনে জেলা আইনজীবী সমিতির নেতৃবৃন্দ ও সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।”
### আইন ও সংবিধান নিয়ে নতুন বিতর্ক
লালমনিরহাট জেলা আইনজীবী সমিতির এই সিদ্ধান্ত প্রকাশের পর থেকেই আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী, শিক্ষার্থী, সামাজিক সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। একপক্ষ মনে করছে, মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলনকে শক্তিশালী করতেই আইনজীবীরা এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আইনজীবীর সহায়তা থেকে বঞ্চিত করা হলে তা সংবিধানে স্বীকৃত ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। এদিকে রংপুর প্রেসক্লাবের সামনে অনশনরত জাহিদ ইকবাল জানিয়েছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তিনি অনশন চালিয়ে যাবেন। পাশাপাশি আইনগত পথেও এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখবেন। ঘটনাটি ইতোমধ্যে রংপুর বিভাগসহ দেশের বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও জেলা আইনজীবী সমিতি এ বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেই নজর সবার।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬