দুই দেশের মাঝখানে

Date:

spot_img

আলী কদর পলাশ

প্রিয় পাঠক,
মন্ট্রিয়লের শীতল এক সকালে তার জন্ম। জন্মসনদে দেশের নাম কানাডা। কিন্তু ঘরের ভেতর ছিল মরক্কো। বাবা-মায়ের ভাষা, গল্প, খাবার আর স্মৃতির মধ্যে দূরের সেই দেশটিই হয়ে উঠেছিল শিশুটির প্রথম পরিচয়।

তার নাম ইয়াসিন বুনু। ফুটবলবিশ্ব তাকে চেনে ‘বোনো’ নামে।

তিন বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে কানাডা ছেড়ে মরক্কোয় চলে যান তিনি। বড় হয়েছেন কাসাব্লাঙ্কায়। সেখানেই প্রথম হাতে তুলে নিয়েছিলেন গোলরক্ষকের গ্লাভস। একসময় ইউরোপের ক্লাব ফুটবলে পৌঁছে গেলেও জাতীয় দল বেছে নেওয়ার মুহূর্তে তার সামনে ছিল দুটি পরিচয়—জন্মভূমি কানাডা এবং পূর্বপুরুষের দেশ মরক্কো।

তিনি বেছে নিয়েছিলেন মরক্কোকে।

সিদ্ধান্তটি শুধু ফুটবলের ছিল না। যেন নিজের শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার একটি নীরব অঙ্গীকার।

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে সেই অঙ্গীকারের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুহূর্ত এসেছিল স্পেনের বিপক্ষে। টাইব্রেকারে একের পর এক শটের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বুনু। তার দুটি সেভে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে মরক্কো। পরে আফ্রিকার প্রথম দেশ হিসেবে পৌঁছে যায় সেমিফাইনালে।

সেদিন সতীর্থরা তাকে কাঁধে তুলে নিয়েছিল। কিন্তু তার হাসির ভেতর যেন শুধু একটি ম্যাচ জয়ের আনন্দ ছিল না। ছিল একটি দেশের বহুদিনের অপেক্ষা। ছিল আফ্রিকার স্বপ্ন। ছিল আরব বিশ্বের গর্ব।

চার বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চ আবার তাকে দাঁড় করাল নিজের জন্মভূমির বিপক্ষে।

২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় কানাডার সামনে মরক্কো। যে শহরে তার জন্ম হয়েছিল, সেই দেশের খেলোয়াড়েরা এবার তার গোলের দিকে ছুটছিলেন। কানাডার একটি নিশ্চিত সুযোগ পা দিয়ে ঠেকিয়ে দিলেন বুনু। শেষ পর্যন্ত মরক্কো জিতল ৩-০ গোলে।

তিনি উল্লাস করলেন। কিন্তু সেই উল্লাসের ভেতরেও ছিল অদৃশ্য এক টান।

কারণ একজন মানুষ কি সত্যিই তার জন্মভূমিকে পুরোপুরি পেছনে ফেলে যেতে পারে?

বুনু কানাডাকে অস্বীকার করেননি। আবার মরক্কোকেও শুধু একটি ফুটবল দল হিসেবে দেখেননি। তার জীবনে একটি দেশ তাকে জন্ম দিয়েছে, অন্য দেশটি দিয়েছে পরিচয়। দুই দেশের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি কোনো একটিকে ছোট করেননি। শুধু হৃদয়ের ডাকটি অনুসরণ করেছেন।

বিশ্বকাপে গোলরক্ষকের কাজ গোল বাঁচানো। কিন্তু কখনো কখনো তিনি শুধু বল থামান না। তিনি একটি জাতির ভয় থামিয়ে দেন। পরাজয়ের আশঙ্কা থামিয়ে দেন। লাখো মানুষের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার মুহূর্তটিও দুই হাতে আটকে রাখেন।

বুনুও তাই করেছেন।

তার গল্প দেশ বদলে অন্য দেশের নায়ক হওয়ার গল্প নয়। এটি শিকড় খুঁজে পাওয়ার গল্প। দুটি পরিচয়কে সঙ্গে নিয়ে নিজের সত্যের পাশে দাঁড়ানোর গল্প।

গোলপোস্টের নিচে তিনি একা দাঁড়ান। অথচ তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে পুরো মরক্কো।

আর কোথাও, বহু দূরের মন্ট্রিয়লে, নীরবে জেগে থাকে তার জন্মের স্মৃতি।সূত্র: ফিফা, রয়টার্স ও দ্য গার্ডিয়ান। বুনু কানাডার মন্ট্রিয়লে মরক্কোর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং তিন বছর বয়সে মরক্কোয় চলে যান। ২০২২ বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে তিনি দুটি পেনাল্টি রক্ষা করেন; ২০২৬ বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষেও টাইব্রেকারে গুরুত্বপূর্ণ সেভ করেন এবং জন্মভূমি কানাডার বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে মরক্কোর গোল রক্ষায় ভূমিকা রাখেন।

[বিদেশি পত্র পত্রিকা অবলম্বনে]

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

বাচসাসের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে ভোট ২০ নভেম্বর

এম.আর.জে শান্ত: বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির (বাচসাস) ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের...

কমিশনার মামুনের পিতার মৃত্যুতে দোয়া মাহফিল

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর ও বংশাল থানা...

আগামী তিন বছরে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে: ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার

বাগেরহাট প্রতিনিধি আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশে এক লাখ নতুন...

খুলনায় ফুটপাত দখলমুক্ত করতে কেসিসির অভিযান, ভাঙা হলো অবৈধ দোকানপাট

খুলনা প্রতিনিধি খুলনা নগরীর ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ...