আঃ রাজ্জাক (রিয়াদ), রংপুর ব্যুরো
বিয়ে মানেই দুটি পরিবারের মিলন, নতুন জীবনের স্বপ্ন আর আনন্দ-উচ্ছ্বাসের এক অনন্য আয়োজন। সেই স্বপ্নকে ঘিরে কনের বাড়িতে চলছিল শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা। বাড়ির উঠানে টানানো হয়েছিল সামিয়ানা, রান্নার হাঁড়িতে ফুটছিল অতিথিদের জন্য নানা পদ, আত্মীয়-স্বজনের পদচারণায় মুখর ছিল পুরো বাড়ি। গায়ে হলুদের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বিয়ের ক্ষণ গুনছিল কনের পরিবার। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও বরের গাড়ি আর আসেনি। অপেক্ষা দীর্ঘ হতে হতে একসময় আসে এমন একটি খবর, যা মুহূর্তেই আনন্দের পরিবেশকে শোকে পরিণত করে। অভিযোগ ওঠে, নগদ ৫ লাখ টাকা যৌতুক এবং ঘর সাজানোর জন্য আরও ৩ লাখ টাকা না দিলে বিয়ে করতে আসবে না বরপক্ষ। এ ঘটনায় ভেঙে পড়ে কনের পরিবার। অপমান, মানসিক কষ্ট ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন কনের বাবা। ঘটনাটি রংপুরের বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জ উপজেলার দুটি পরিবারের মধ্যে ঘটেছে। এ নিয়ে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার দামোদরপুর ইউনিয়নের চক পলাশবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা শাহ আলমের মেয়ের সঙ্গে তারাগঞ্জ উপজেলার হাড়িয়ালকুঠি ইউনিয়নের সর্দারপাড়া গ্রামের আবদুল হালিম শাহের ছেলে মিলন মিয়া ওরফে নাল্টু মিয়ার বিয়ে চূড়ান্ত হয়। দুই পরিবারের সম্মতিতে দীর্ঘদিন ধরেই বিয়ের প্রস্তুতি চলছিল। রবিবার (১২ জুলাই) ছিল বিয়ের নির্ধারিত দিন।
বিয়ে উপলক্ষে কয়েকদিন ধরেই কনের বাড়িতে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছিল। আত্মীয়-স্বজনদের দাওয়াত দেওয়া হয়, বাজার-সদাই সম্পন্ন করা হয়, রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় সব আয়োজন শেষ হয়। বিয়ের মঞ্চ, অতিথিদের বসার ব্যবস্থা, খাবারের আয়োজন—সবকিছুই প্রস্তুত ছিল। কনের গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানও সম্পন্ন হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে বরপক্ষ না আসায় আনন্দঘন সেই আয়োজন নিমিষেই থমকে যায়।
#‘৫ লাখ যৌতুক, ৩ লাখ ঘর সাজানোর টাকা চাওয়া হয়'
কনের বাবা শাহ আলম অভিযোগ করে বলেন, “বিয়ের জন্য ধারদেনা করে বাজার করেছি, রান্নাবান্নার সব আয়োজন করেছি। আত্মীয়-স্বজন সবাই এসে গেছে। হঠাৎ করে খবর আসে, বিয়ে হবে না। কারণ জানতে চাইলে বলা হয়, ৫ লাখ টাকা যৌতুক দিতে হবে এবং ঘর সাজানোর জন্য আরও ৩ লাখ টাকা দিতে হবে। আমার মেয়ের গায়ে হলুদ হয়ে গেছে। এখন সমাজে আমরা কীভাবে মুখ দেখাব? আমাদের সম্মান-ইজ্জত সব শেষ করে দিয়েছে।তিনি আরও বলেন, একজন বাবার জন্য এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে? মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা এখন চরম দুশ্চিন্তায় আছি। আমি প্রশাসনের কাছে সুষ্ঠু বিচার চাই।”
### 'বর আনতে গাড়িও প্রস্তুত ছিল'
কনের ভগ্নিপতি শাহাবুল সরকার বলেন, “বিয়ের কেনাকাটা থেকে শুরু করে সবকিছু শেষ করা হয়েছিল। বর আনতে গাড়িও প্রস্তুত ছিল। আমরা আত্মীয় করার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তারা জানিয়ে দেয়, যৌতুক ছাড়া বিয়ে করতে আসবে না। এতে মেয়ের পরিবার সামাজিকভাবে অপমানিত হয়েছে। বাধ্য হয়েই আমরা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। তিনি বলেন, এই ঘটনার কারণে শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, পুরো পরিবার মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। যারা এই কাজ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
### অভিযোগ অস্বীকার বরের বাবার
অন্যদিকে, যৌতুক দাবির অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন বরের বাবা আবদুল হালিম শাহ। তিনি বলেন, “এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। আমি কখনো কোনো টাকা দাবি করিনি। ওরা নিজেরাই বাড়াবাড়ি করেছে। যদি মেয়ের পরিবার ক্ষতিপূরণ দাবি করে, আমি তা দিতে প্রস্তুত আছি। আমার ছেলে বর্তমানে বাড়িতে নেই। তবে তিনি কেন নির্ধারিত দিনে বরপক্ষ বিয়েতে উপস্থিত হয়নি, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
## প্রশাসনের দ্বারস্থ কনের পরিবার
ঘটনার পর কনের বাবা তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগ পাওয়ার পর প্রশাসন বিষয়টি তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে। তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মোনাব্বর হোসেন বলেন, “আমরা লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যেহেতু এটি একটি সামাজিক বিষয়, তাই প্রথমে সামাজিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হবে। তবে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
## আইন কী বলছে?
বাংলাদেশের যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী, বিবাহের আগে, সময়ে বা পরে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে যৌতুক দাবি করা একটি ফৌজদারি অপরাধ। আইনের ৩৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কেউ যৌতুক দাবি করলে তিনি সর্বোচ্চ ৫ বছর এবং সর্বনিম্ন ১ বছরের কারাদণ্ড, অথবা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
## সামাজিক উদ্বেগ
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, যৌতুকবিরোধী আইন কার্যকর থাকলেও সমাজের কিছু অংশে এখনও এই কুপ্রথা রয়ে গেছে। বিশেষ করে বিয়ের মতো একটি পবিত্র সম্পর্ককে অর্থের বিনিময়ে জিম্মি করে দেওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক। এ ধরনের ঘটনা শুধু একটি পরিবারের আর্থিক ক্ষতির কারণ হয় না, বরং একটি মেয়ের সামাজিক মর্যাদা, মানসিক স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ জীবনকেও গভীর সংকটে ফেলে।
তাদের মতে, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্যতা মিললে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে যৌতুকের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা অনেকটাই কমে আসবে।
বর্তমানে অভিযোগটি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এদিকে বিয়ের আসর ভেঙে যাওয়ার ঘটনায় কনের পরিবার এখনও চরম মানসিক ও সামাজিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। তাদের একটাই প্রত্যাশা—সুষ্ঠু বিচার এবং এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন আর কোনো পরিবারের জীবনে না ঘটে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬