রংপুর ব্যুরো
জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে গণঅধিকার, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার দাবিতে রংপুরে ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে বর্ণাঢ্য গণমিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (৪ জুলাই) বিকেলে নগরীর জুলাই চত্বর (টাউন হল) থেকে শুরু হওয়া এই গণমিছিল নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে শাপলা চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে অনুষ্ঠিত সমাবেশে অংশ নেওয়া নেতারা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ কার্যকর বাস্তবায়ন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত অনুমোদন এবং উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর করে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করার দাবি জানান।
গণমিছিল ও সমাবেশকে কেন্দ্র করে বিকেল থেকেই নগরীর জুলাই চত্বর এলাকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে গণমিছিল শুরু হয়। মিছিলটি সিটি বাজার, পায়রা চত্বর, জাহাজ কোম্পানি মোড় ও গ্র্যান্ড হোটেল মোড় প্রদক্ষিণ করে শাপলা চত্বরে এসে শেষ হয়। মিছিলে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীরা “দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা”, “জুলাইয়ের স্বীকৃতি দে, নইলে গদি ছাইড়া দে”, “অবিলম্বে গণভোট বাস্তবায়ন কর”, “জুলাই সনদ নিয়ে টালবাহানা চলবে না”, “গণভোট নিয়ে টালবাহানা চলবে না”, “আবু সাইদ, মুগ্ধ, শেষ হয়নি যুদ্ধ”, “শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না”—এসব স্লোগানে পুরো এলাকা মুখরিত করে তোলেন।
মিছিল শেষে শাপলা চত্বরে অনুষ্ঠিত সংক্ষিপ্ত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল। তিনি বলেন, জুলাই উপাখ্যানের শহীদদের স্বপ্ন ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজও পূরণ হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার জুলাই সনদ ও গণভোটের চেতনাকে যথাযথভাবে ধারণ করতে পারেনি। জনগণের প্রত্যাশা ছিল, গণভোটে বিজয়ী ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রতিফলন ঘটিয়ে সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন দিকনির্দেশনা দেবে, কিন্তু বাস্তবে সেই উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
মাহবুবুর রহমান বেলাল বলেন, “জুলাই উপাখ্যানের শহীদদের যে স্বপ্ন, সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ আজও আমরা দেখতে পাচ্ছি না। আশা ছিল, বর্তমান সরকার জুলাই সনদ অনুযায়ী দেশ পরিচালনার কার্যকর উদ্যোগ নেবে এবং গণভোটে বিজয়ী ‘হ্যাঁ’ ভোটের আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। কিন্তু তারা সেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, দেশে কার্যত একদলীয় শাসনের প্রবণতা তৈরি হয়েছে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেও দলীয়করণের অভিযোগ উঠছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে, গণতান্ত্রিক পরিবেশ সংকুচিত হয়েছে এবং বৈষম্য আরও প্রকট হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমরা তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন চাই, উত্তরাঞ্চলের মানুষের বৈষম্য দূর করতে ন্যায্য ও কার্যকর বাজেট চাই, চাই সুষম উন্নয়ন। জনগণের দুর্ভোগ লাঘব, প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন এবং জুলাই শহীদদের স্বপ্ন পূরণের দাবিতেই এই গণমিছিলের আয়োজন করা হয়েছে। এই কর্মসূচি শুধু প্রতীকী নয়, বরং আগামী দিনের বৃহত্তর আন্দোলনের বার্তা বহন করছে।”
সমাবেশে সভাপতির বক্তব্য দেন রংপুর মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির এটিএম আজম খান। মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি কে এম আনোয়ারুল হক কাজলের সঞ্চালনায় তিনি বলেন, জনগণের গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ কার্যকর প্রয়োগ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। তিনি বলেন, “চাঁদাবাজিমুক্ত, সুশাসনভিত্তিক ও ন্যায়নিষ্ঠ বাংলাদেশ গড়তে হলে জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। জনগণের ভোটে নির্ধারিত অভিমতকে সম্মান জানিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যকর করতে হবে।”
এটিএম আজম খান মাদকবিরোধী অভিযানে সরকারের অবস্থানকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, মাদকবিরোধী অভিযানে রাজনৈতিক প্রভাব বা তদবিরের সুযোগ থাকলে তা পুরো অভিযানের সাফল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। তাই প্রশাসনের কাছে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি যেন মাদকসংশ্লিষ্ট অপরাধীদের পক্ষে সুপারিশ বা তদবির না করেন, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন কুড়িগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম, রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও রংপুর মহানগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি রায়হান সিরাজী, রংপুর জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা এনামুল হক, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এমসিপি) রংপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক আল মামুন, এলডিপির জেলা সভাপতি শামসুদ্দিন রাজা, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস রংপুর মহানগর শাখার সভাপতি মাওলানা ইব্রাহিম খলিল, আমার বাংলাদেশ পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও রংপুর মহানগর সেক্রেটারি মাহবুবার রহমান মাহবুব এবং বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় ব্যবসায় শিক্ষা সম্পাদক নুরুল হুদা। বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন, গণভোটের রায় কার্যকর, রাজনৈতিক সংস্কার, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি দমন, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন বৈষম্য দূর করার ওপর জোর দেন।
তাঁরা বলেন, জুলাই বিপ্লব শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনাই নয়; এটি ছিল মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার ও প্রতিনিধিত্বশীল রাষ্ট্র কাঠামোর দাবিতে একটি ঐতিহাসিক গণআন্দোলন। সেই আন্দোলনের চেতনাকে সামনে রেখে রাষ্ট্র পরিচালনায় গণমানুষের মতামতের প্রতিফলন ঘটানো, নির্বাচনী ও প্রশাসনিক সংস্কার বাস্তবায়ন এবং আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণ এখন জরুরি হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো উত্তরাঞ্চলকেন্দ্রিক বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ছাড়া এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দূর হবে না বলেও বক্তারা মন্তব্য করেন।
সমাবেশে উপস্থিত নেতারা আরও বলেন, রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের মানুষ বহুদিন ধরে অবকাঠামো, শিল্পায়ন, নদীভাঙন, কর্মসংস্থান ও কৃষি সহায়তার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার। ফলে এই অঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা—জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় উত্তরাঞ্চলকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবসম্মত বাজেট বরাদ্দ, কর্মসংস্থানমুখী প্রকল্প গ্রহণ এবং নদী ও পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। তাঁদের মতে, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন ও গণভোটের রায়ের প্রতিফলন ঘটাতে হলে কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; প্রয়োজন দৃশ্যমান প্রশাসনিক, আইনগত ও নীতিগত পদক্ষেপ।
সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন মহানগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আল আমিন হাসান, মিডিয়া ও প্রচারবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট কাওছার আলী, মহানগর কর্মপরিষদ সদস্য শাহজাহান সিরাজ, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এমসিপি) রংপুর জেলার যুগ্ম সদস্যসচিব ও ভারপ্রাপ্ত দপ্তর সম্পাদক মহসিন আলী বকশী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস রংপুর মহানগর শাখার সেক্রেটারি মাওলানা মুফতি নেয়ামত উল্লাহ, জেলা শাখার সমাজকল্যাণ সম্পাদক হাফেজ মোহাম্মদ মমিনুর রহমানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা।
জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এই গণমিছিল ও সমাবেশে অংশগ্রহণকারী নেতারা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, জুলাই সনদ, গণভোটের রায় এবং আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণের দাবিকে সামনে রেখে আগামী দিনগুলোতে আরও বৃহত্তর রাজনৈতিক কর্মসূচি দেওয়া হবে। তাঁদের ভাষায়, জুলাইয়ের চেতনা কেবল স্মরণে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; তা রাষ্ট্রের নীতি, শাসনব্যবস্থা ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬