
আলী কদর পলাশ
প্রিয় পাঠক,
স্টেডিয়ামে সেদিন প্রায় আশি হাজার মানুষ। সবার চোখ মাঠে। কেউ অপেক্ষা করছে একটি গোলের, কেউ একটি জয়ের। কিন্তু মাঠের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা কিশোরটির দিকে কেউ তাকায় না।
তার গায়ে কোনো বিখ্যাত জার্সি নেই। পিঠে কোনো নাম নেই। বিশ্বকাপের ট্রফি ছোঁয়ার স্বপ্নও সে দেখে না। তার হাতে থাকে শুধু একটি ফুটবল। অথচ বিশ্বকাপের সবচেয়ে কাছের মানুষদের একজন সে। কারণ পৃথিবীর সেরা ফুটবলারদের ঠিক কয়েক হাত দূর থেকেই সে খেলা দেখে।
খেলা শুরু হতেই সে যেন অদৃশ্য হয়ে যায়। বল মাঠের বাইরে গেলেই ছুটে গিয়ে তুলে দেয়। আবার নিজের জায়গায় ফিরে আসে। পুরো ম্যাচে হয়তো একবারও ক্যামেরা তার মুখ দেখায় না। তবু খেলাটা যেন তার হাত ধরেই আবার শুরু হয়।
হঠাৎ একসময় বলটি গড়িয়ে আসে তার পায়ের কাছে। কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছেন তার শৈশবের নায়ক। হয়তো মেসি, হয়তো রোনালদো, হয়তো নেইমার, হয়তো এমবাপ্পে, হয়তো অন্য কোনো তারকা। মুহূর্তটি জীবনে একবারই আসে। চাইলে সে অটোগ্রাফ চাইতে পারত। একটি ছবি তুলতে পারত। বন্ধুদের দেখানোর মতো একটি স্মৃতি সংগ্রহ করতে পারত।
কিন্তু সে কিছুই করে না।
দুই হাতে বলটি বাড়িয়ে দেয়। কারণ তাকে শেখানো হয়েছে—বিশ্বকাপে নিজের আবেগের চেয়ে খেলাটাই বড়। কয়েক সেকেন্ডের দেরিও যেন খেলার ছন্দ নষ্ট না করে।
খেলা শেষ হয়। গ্যালারি ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যায়। বিজয়ীরা উল্লাসে মেতে ওঠে, পরাজিতরা মাথা নিচু করে মাঠ ছাড়ে। সাংবাদিকরা ছুটে যান গোলদাতা, অধিনায়ক কিংবা কোচের কাছে। আর মাঠের চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বল কুড়ানো ছেলেমেয়েরা নীরবে একে একে বলগুলো গুছিয়ে রাখতে শুরু করে।
তাদের কেউ সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় না। টেলিভিশনের আলোও তাদের খোঁজে না। অথচ তাদের দ্রুততা, শৃঙ্খলা আর নিষ্ঠার ওপরও নির্ভর করে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল আসরের ছন্দ।
বহু বছর কেটে যাবে। হয়তো একদিন নিজের ছেলে বা নাতিকে নিয়ে বসে বিশ্বকাপের পুরোনো ম্যাচ দেখবে সেই কিশোর।
হঠাৎ টেলিভিশনের পর্দার এক কোণে নিজের ছোট্ট ছায়াটিকে দেখে সে মৃদু হেসে বলবে—
"ওই যে মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটা... ওটা আমি।"
সন্তানটি হয়তো অবাক হয়ে বাবার মুখের দিকে তাকাবে। তার চোখে তখন বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় নায়ক মেসি বা রোনালদো নন—তার নিজের বাবা।
বিশ্বকাপের সব গল্প ট্রফি জেতার নয়। কিছু গল্প এমন মানুষের, যারা ইতিহাসের শিরোনামে থাকেন না কিন্তু ইতিহাসের একেবারে পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন। মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা সেই অচেনা বল কুড়ানো ছেলেটিও তাদেরই একজন। কখনো কখনো বিশ্বকাপের সবচেয়ে সুন্দর গল্পটি লেখা হয় গোলদাতার পায়ে নয়, নিঃশব্দে দায়িত্ব পালন করা এক কিশোরের হাত ধরে।
[বিদেশি পত্র পত্রিকা অবলম্বনে]
সম্পাদক ও প্রকাশক: দিলীপ কুমার আগরওয়ালা।
প্রধান সম্পাদক : আলী কদর পলাশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক গোল্ড প্যালেস, ০৩ বেইলী রোড (১০ নাটক স্মরণী) ঢাকা-১২০৭ থেকে প্রকাশিত এবং শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস, ২৮/বি টয়েনবি সার্কুলার রোড মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। যোগাযোগ করুন : মো. সাইফুল ইসলাম, ফোন: ০১৭৩৩৪৩৭৫৯৬ অথবা ০৯৬৯৬৪৩৭৫৯৬